× প্রচ্ছদ জাতীয় সারাদেশ রাজনীতি বিশ্ব খেলা আজকের বিশেষ বাণিজ্য বিনোদন ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

রাসায়নিক থাকা ওই ডিপোর ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল

শাহনাজ পারভীন এলিস

০৭ জুন ২০২২, ১৭:২৯ পিএম । আপডেটঃ ০৭ জুন ২০২২, ১৭:৪৭ পিএম

‘শনিবার রাত ৯টার দিকে হঠাৎই বিস্ফোরণের শব্দ। মুহূর্তে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগে। এরপর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে পানি ছিটানো শুরু করেন।’ ঘটনার দিন বিস্ফোরণের সময়কার ভয়ংকর এমন অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিলেন সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে কাজ করা কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ফারুক হোসেন (২৫)।  ফারুক আরও জানায়, কনটেইনার খালাস করতে গত শুক্রবার ডিপোতে কাভার্ড ভ্যান নিয়ে ঢুকেছিলেন তিনি। কিন্তু ওই দিন গাড়ি থেকে মালামাল খালাস করতে পারেননি। পরদিন কাজ শেষ হতে দেরি হওয়ায় ডিপো থেকে ফারুক বের হতে না পারায় দুর্ঘটনার মুখে পড়েও অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি। 

দুর্ঘটনাস্থল থেকে ফারুক বেঁচে ফিরতে পারলেও, বাঁচতে পারেননি ডিপোর শিফট ইনচার্জ শাহাদাত উল্যা মজুমদার (২৯)। ঘটনার রাতে নির্ধারিত সময়ে দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন শাহাদাত। হঠাৎ বিস্ফোরণের বিকট শব্দ আর আগুন লাগার কথা শুনে ডিপোতে গিয়ে ভিডিও কলে আগুন ঘটনাটি প্রথমে স্ত্রীকে দেখান। একপর্যায়ে ওই দৃশ্য বাবাকে দেখানোর সময় তার পশে থাকা অপর এক কনটেইনার বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার। পরে শাহাদাতের ছোট ভাই সীতাকুণ্ডে গিয়ে তার মরদেহ গ্রহণ করেন। গতকাল রোববার রাতেই তার মরদেহ ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। 

নিহতের পরিবার জানিয়েছে, শাহাদাত আড়াই মাস বয়সী এক কন্যাসন্তানের জনক। ফেনী সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাসের পর তিন বছর ওমানে ছিলেন তিনি। দেশে ফিরে সীতাকুণ্ডের ওই কনটেইনার ডিপোতে শিফট ইনচার্জের চাকরি নেন শাহাদাত। 

প্রফেসর ড. সাইদুর রহমান মাশরেকী 

আঘাত প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ- সিআইপিআরবি’র বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. সাইদুর রহমান মাশরেকী বললেন, শাহাদাতের এই মার্মান্তিত মৃত্যুই প্রমাণ করে ওই ডিপোতে কোন দুর্ঘটনা, কনটেইনার বিস্ফোরণ বা অগ্নি দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটলে সেখানে কর্মরত শ্রমিক ও দায়িত্বরতরা কীভাবে তা মোকাবিলা করবেন তাতে তারা প্রশিক্ষিত ছিলেন না। তিনি বলেন, ডিপো কর্তৃপক্ষ অব্যবস্থাপনা নাকি দায়িত্বরতদের অবহেলার কারণে ওই অগ্নিকাণ্ড তা তদন্ত করা জরুরি। দুর্ঘটনাস্থলে অগ্নি নির্বাপন রোধে কী ধরনের ব্যবস্থা ছিলো খতিয়ে দেখতে হবে। এছাড়া ডিপোতে দায়িত্বে থাকা কর্মীদের এসব ব্যাপারে কোন ধারণা বা প্রশিক্ষণ ছিলো কিনা সে বিষয়েও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এদিকে ওই কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ এমন বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধান এবং সুষ্ঠু তদন্তে পৃথক কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেছেন, ওই ডিপোতে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রাসায়নিক থাকার কারণে সেখানে এতো বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে তারা ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সিআইপিআরবি’র বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. সাইদুর রহমান মাশরেকী বলেন, আগুন লাগলেই সেটা নেভানোর জন্য প্রথমেই সবার মাথায় আসে পানির কথা। কিন্তু পানি দিয়েই যে সব আগুন নেভানো সম্ভব হয় না, অর্থাৎ সব ধরনের আগুন নেভাতে যে পানিতে সবসময় সমাধান আসে না- সেই ধারণা অনেকেরই নেই। ওই কনটেইনার ডিপোতে হাইড্রোজনের পার অক্সাইড এর আগুন নেভাতে পানি ব্যবহার নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন দসকল বাহিনীর কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা; যা কাজে আসেনি। 

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অব্যবস্থাপনা না দায়িত্বরতদের অবহেলা তদন্ত করুন

অগ্নি নির্বাপনে কী ধরনের ব্যবস্থা ছিল ওই ডিপোতে খতিয়ে দেখা জরুরি

দায়িত্বে থাকা কর্মীদের প্রশিক্ষণ ছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে

দুর্ঘটনার রোধে নিরাপত্তা নির্দেশনা মানা বাধ্যতামূলক করা উচিত 

বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, সীতাকুণ্ডের ওই কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে এপর্যন্ত ৯ জন দমকল কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে আগুন নেভাতে প্রথমে যোগ দেন সীতাকুণ্ড ও কুমিরা ফায়ার স্টেশনের দমকল কর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শী বেঁচে যাওয়া দমকলকর্মীরা জানান, ‘আগুন প্রায় নিভিয়ে ফেলেছিলেন তারা। কিন্তু ঠিক ৪০ মিনিটের মাথায় ঘটে একের পর এক বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকেও শব্দ শোনা গেছে, কম্পন অনুভূত হয়েছে। আর সেই বিস্ফোরণে ডিপোতে থাকা মালবাহী কন্টেইনারগুলো দুমড়ে মুচড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। পরপর বেশ কয়েকটি কনটেইনার বিস্ফোরণ হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১২ জন চিকিৎসাধীন। আর দু’জনকে নেয়া হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। বিস্ফোরণে নিহত, নিখোঁজ এবং গুরুতর আহত সবাই সীতাকুণ্ড এবং কুমিরা ফায়ার স্টেশনের কর্মী।

ড. ফজলুর রহমান

সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ- সিআইপিআরবি’র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমান বলেছেন, ভয়াবহ কেমিক্যাল বিস্ফোরণের কারণে যেহেতু সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে যেহেতু এমন অগ্নিকাণ্ড এবং তা নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে এপর্যন্ত ৯ জন দমকল কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। তাতেই প্রমাণিত হয় এ ধরনের কেমিক্যাল বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আমাদের দমকল বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে।

তিনি আরও জানান, হাইড্রোজনের পার অক্সাইড একটি রাসায়নিক যৌগ যার সংকেত ঐ২ঙ২। বিশুদ্ধ অবস্থায় এটা বর্ণহীন তরল। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডকে বর্ণনা করেন অক্সিডাইজিং এজেন্ট হিসেবে। সাধারণভাবে একে বলা যায় ব্লিচিং এজেন্ট। তাই সরাসরি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ব্যবহার খুবই বিপজ্জনক। নিরাপত্তাজনিত কারণে সবসময় এর জলীয় দ্রবণ পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। এটি নিজে দাহ্য পদার্থ না হলেও আগুন বা দাহ্য পদার্থের আশেপাশে রাখলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে বাধ্য।

অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমান আরও বলেন, কোন দুর্ঘটনা ঘটনার পর তা নিয়ে কিছুদিন হৈ চৈ চলতে থাকে, কিছুদিন সচেতনতাও বাড়ানো হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয় না। বর্তমানে আমাদের দেশের অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই; কিন্তু যুগোপযোগী যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার ব্যাপারে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক: আবদুল মজিদ

প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । 01894-944220 । sangbadsarabela26@gmail.com

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2022 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.