নারায়ণগঞ্জ শহরের যখনই প্রবেশ করুন না কেন যানজট থাকবেই। যানজট নারায়ণগঞ্জবাসীদের জন্য নিত্যদিনের সঙ্গী। যা তাদের প্রত্যাহিক জীবন নাকাল করে রেখেছে। সম্প্রতি অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এ সমস্যা চরম আকার ধারণ করেছে। এছাড়া যানজটের নেপথ্যে রয়েছে অবৈধ পার্কিং, হকার, অবৈধ যান চলাচলসহ একাধিক কারণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব সমস্যা সমাধান ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় না আসলে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিত্য এই ভোগান্তির সমাধান কোনোদিনই হবে না।
চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জ মাত্র দুই কিলোমিটারের বঙ্গবন্ধু সড়ক। যার এক প্রান্তে নারায়ণগঞ্জ শহরের শুরু আর অন্য প্রান্তে শেষ। পায়ে হেঁটে প্রায় আধ-ঘন্টার মধ্যেই পুরো শহর ঘুরা আসা গেলেও কোনো যানবাহনে সময় লাগে ঘন্টা দেড়েকের বেশি। এছাড়া সড়কের নানা ভোগান্তি তো রয়েছেই। তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট নিরসনে কাজ করছে নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশ, কমিউনিটি পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী ও জেলা পুলিশের সদস্যরাও। এতদ্বাসত্যেও নেই দৃশ্যমান ফলাফল।
অবৈধ পার্কিং
শহরে যানজটের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে যত্রতত্র অবৈধ পার্কিং। বাণ্যিজিক শহর হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের সর্বত্রই অবস্থিত বিভিন্ন বিপণীবিতান, ব্যাংক, রেস্তোরাঁ, মার্কেট, বিভিন্ন কার্যালয়। শহরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বানিজ্যিক এলাকা নিতাইগঞ্জ ও শহরের মাঝে উকিলপাড়া এলাকায় রয়েছে বেশ কিছু হোসিয়ারি কারখানা। ফলে সারাদিনই স্পটগুলোতে গাড়ি পার্ক করা থাকে এবং মালামাল লোড-আনলোড হয়।
শুধু বঙ্গবন্ধু সড়কেই নয়, শহরের অন্যান্য সড়কগুলোর পাশে অবস্থিত বহুতল ভবনগুলোর অধিকাংশেরই কোনও ধরনের পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় গাড়িগুলো রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এসব যানবাহন থাকার কথা সড়কের পাশে অবস্থিত বহুতল ভবনগুলোর কার পার্কিংয়ে। কিন্তু এসব বহুতল ভবনগুলোর গ্রাউন্ড ফ্লোরে দোকান, রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড কিংবা বাণিজ্যক কার্যালয় থাকলেও, রাখা হয়নি পার্কিংয়ের কোন জায়গা। যার প্রভাব পড়ছে নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে। এ বিষয়ে রাস্তার উপর অবৈধভাবে পার্ক করা কোন গাড়ির চালককে জিজ্ঞেস করলে তারা উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘পার্কিংয়ের জায়গা না পেলে গাড়ি রাখবো কোথায়?’
তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) সূত্রে জানা যায়, পার্কিং সমস্যা সমাধানে নাসিক কর্তৃক শহরের টানবাজার এলাকায় একটি অত্যাধুনিক পার্কিং এর প্রকল্প চলমান রয়েছে।
হকার
শহরের যানজটের আরেকটি কারণ অস্থায়ী হকারদের ফুটপাত ও সড়ক দখল। সারা বছরই শহরের প্রধান প্রধান সড়কের ফুটপাত, এমনকি মূল সড়কের একাংশ হকারদের দখলে থাকে। যার ফলে, যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ফুটপাত দখল থাকার কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কে চলাচল করে যা যানচলাচলে আরও বাধা সৃষ্টি করে।
অবৈধ স্ট্যান্ড
ছোট্ট এই শহরে রয়েছে ১৪টি অবৈধ ইজিবাইক, লেগুনা ও সিএনজি স্ট্যান্ড। যার মধ্যে রয়েছে, শহরের নিতাইগঞ্জ মোড়, মন্ডলপাড়া ব্রিজ, দুই নম্বর রেলগেট চত্ত্বর, দুই নম্বর রেলগেট, বঙ্গবন্ধু চত্ত্বর, এক নম্বর রেলগেট, কালিরবাজার, চাষাঢ়া হক প্লাজার সামনে, সমবায় মার্কেটের সামেন, খাঁজা মার্কেটের সামনে, জিয়া হল সংলগ্ন সুগন্ধা বেকারির সামনে, নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের সামনে, কলেজ রোডের মোড়ে ও লিংক রোড়ের মোড়ের স্ট্যান্ড।
অবৈধ যানবাহন
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ শহরের সর্বত্র অবৈধ যানবাহনের ছড়াছড়ি। হাজারো ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কসহ সর্বত্র বিনা বাধায় চলাচল করছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) তথ্যমতে, চলতি বছর নারায়ণগঞ্জ শহরে ১০ হাজার, সিদ্ধিরগঞ্জে ৫ হাজার এবং বন্দরে ৩ হাজার রিকশার লাইসেন্স দিয়েছে নাসিক। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, শহরে তারও দ্বিগুণ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক নিয়মিত চলাচল করছে।
ট্রেন চলাচল
কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনটি শহরের মাঝখানে অবস্থিত। ঢাকা হয়ে কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনে ট্রেন আসতে প্রত্যেকবার শহরের তিনটি রেলগেট অতিক্রম করতে হয়। প্রতিদিন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে ১৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। প্রত্যেকবার ট্রেন অতিক্রম করার সমসয় প্রত্যেক গেটে ৫ থেকে ১০ মিনিট যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। যার ফলে মূল শহরের যানজট বৃদ্ধি পায়।
আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ড
কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনের মত আন্তঃজেলা বাসস্ট্যান্ডটিও শহরের মাঝেই অবস্থিত। প্রতিদিন বন্ধন, বন্ধু, উৎসব, বিআরটিসি, মৌমিতা, হিমাচল, শীতলক্ষ্যা, গ্রীন অনাবিলসহ শতাধিক বাস শহরের মধ্য দিয়েই চলাচল করে। যা শহরে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং যানজট সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে বাসগুলো বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রী নেয়ার পর শহরের দুই নম্বর রেলগেল চত্ত্বর, চাষাঢ়া শহীদ মিনার ও লিংক রোডের মোড় আবার দাঁড়ায় এবং যাত্রী তোলে। একাধিক পয়েন্টে যাত্রী উঠা-নামা করার কারণেও শহরে যানজটের সৃষ্টি হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) মো. জাহেদ পারভেজ চৌধুরীর মতে, শহরের যানজটের নেপথ্যেই রয়েছে অবৈধ পার্কিং, অবৈধ স্ট্যান্ড, হকার ও ট্রাফিকের জনবল সংকট। তিনি বলেন, ‘শহরে পার্কিং এর ব্যবস্থা না থাকলে অবৈধ পাকিং, স্ট্যান্ড হবেই। পার্কিং এর ব্যবস্থা করা আমাদের কাজ না। আমাদের কাজ মামলা করা, করছি। অবৈধ যানবাহন প্রবেশে বাধা দিচ্ছি। শহরের প্রত্যেক মূল পয়েন্টে আমাদের সদস্যরা আছে এবং কাজ করছে। তবু অলিগলি দিয়ে যানবাহন শহরে প্রবেশ করে। আমরা আমাদের সাধ্যমত কাজ করে যাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শহরে পার্কিং ব্যবস্থা করার জন্য আমরা সিটি কর্পোরেশনের কাছে আহ্বান জানিয়েছি।’
তবে এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2025 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh