× প্রচ্ছদ জাতীয় সারাদেশ রাজনীতি বিশ্ব খেলা আজকের বিশেষ বাণিজ্য বিনোদন ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

অপ্রতুল শৌচাগার

দুশ্চিন্তায় নগরবাসী,বাড়ছে কিডনিজনিত রোগ

সুমন সরদার

২১ মার্চ ২০২২, ২০:৫০ পিএম

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীতে আকাশচুম্বী ভবন বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে জনসংখ্যা তেমনি বাড়ছে নাগরিক সমস্যা। প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যার এই রাজধানীতে বসবাসরত ও বহিরাগত মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রতিদিন চলাচল করে। চলাচলরত এ সকল মানুষের সামনে বায়ুদূষণ আর যানজটের মতো বিশাল সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে গণশৌচাগারের অপ্রতুলতা।

যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছোতে না পারায় শৌচাগার সমস্যা আরো প্রকট হয়ে দাড়িয়েছে অর্ধকোটি পথচারীর সামনে। বিশাল সংখ্যার পথচারীদের চাহিদার তুলনায় রাজধানীতে পাবলিক টয়লেট বা গণশৌচাগারের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। আর যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কিছুসংখ্যক শৌচাগারের পরিবেশ মোটামোটি ভালো থাকলেও বাকী গুলোর অবস্থা খুবই অত্যন্ত নগণ্য।

ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরে গণশৌচাগার খুঁজে পেতেও বেগ পেতে হয় জনসাধারণের। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ভোগান্তির শেষ নেই। বেশি সময় ধরে ‘প্রাকৃতিক ডাক’ আটকে রেখে কিডনিজনিত রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে রাজধানীবাসী। এ কারনে কর্মজীবী ও বিশেষ কাজে রাস্তায় চলাচলকারী নারীরা বিভিন্ন রকম রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন নারী ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে বা ধরে রাখলে মূত্রথলিতে ব্যথা ও কষ্ট অনুভব হতে পারে এবং ঘন ঘন প্রদাহ বা ইনফেকশন হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ পায়খানা ধরে রাখলে তাৎক্ষণিক কষ্ট ছাড়াও ‘এনাল ফিশার’ রোগ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মূত্রনালী বা থলিতে প্রদাহ ও এনাল ফিশারের প্রকোপ বেড়েছে।

গাইনি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম সংবাদ সারাবেলাকে বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার নারী কর্ম ব্যস্ততার কারনে ঘর থেকে বের হয়ে থাকেন। চলার পথে তাদের কাছে শৌচাগার সমস্যা অন্যতম হয়ে দাড়িয়েছে।  দীর্ঘ সময় ধরে প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে না পেরে নানান রকম স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে তারা। এর ফলে সবচেয়ে বেশি হয়, ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন বা ইউটিআই, যাকে বলা হয় মূত্রনালির সংক্রমণ। এটা হয়ই বেশিক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখলে ব্লাডারে যে জীবাণু জন্মায় তা থেকে। এটা পরবর্তীতে অন্য সমস্যা তৈরি করে। যেমন বারবার যদি কারো ইউটিআই হয়, তাহলে তা নারীর প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, প্রস্রাবে ইউরিয়া এবং অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো টক্সিন জাতীয় পদার্থ থাকে। ফলে বেশিক্ষণ চেপে রাখার ফলে বিষাক্ত পদার্থ কিডনিতে পৌঁছে কিডনিতে স্টোন বা পাথর তৈরি করতে পারে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে ইদানীং এ রোগে আক্রান্ত হবার হার বাড়ছে।এছাড়া প্রস্রাব চেপে রাখার কারণে ব্লাডার ফুলে যেতে পারে। সেই সঙ্গে কারো যদি আগে থেকে কিডনিতে কোন সমস্যা থাকে এবং সে নিয়মিত প্রস্রাব চেপে রাখে তাহলে ক্রমে তার কিডনি কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করবে। কেবলমাত্র টয়লেট চেপে রাখার কারণে শ্বাসকষ্ট এবং ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণও হতে পারে বলে জানান তিনি।

শহরে শৌচাগারের সংকট গুরুতর বলে মন্তব্য করে স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বের হোসেন জানান , নগরের বেশির ভাগ মানুষ কাজের জন্য দীর্ঘ সময় বাইরে থাকেন। ৮০ শতাংশ মানুষ হেঁটে চলাচল করে। অথচ শহরের হাঁটার পথে গণশৌচাগার নেই বললেই চলে। শহরের আয়তন ও জনসংখ্যা অনুযায়ী কমপক্ষে ১ হাজার আধুনিক গণশৌচাগার দরকার বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে ১০৯.২৫১ বর্গ কি.মি.আয়তনের ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৭০ টি গণশৌচাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১০ টি শৌচাগার পরিচালনা করছে ওয়াটার এইড। ৫ টি পরিচালনার দায়িত্বে আছেন নির্ধারিত এলাকার মার্কেট সমিতি। ৬টি পরিচালিত হচ্ছে ইজারাদারদের মাধ্যমে। লিজ চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ৪ টি শৌচাগার। বিভাগীয় আদায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে ৪ টি। ১৬ টি শৌচাগার পরিচালনার দায়িত্বে আছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। বন্ধ হয়ে গেছে ৬ টি। পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে ৪ টি। সংস্কারাধীন আছে ৬ টি। নির্মানাধীন অবস্থায় আছে ৬ টি গণশৌচাগার।

ভূমিজ’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ফারহানা রশিদ সংবাদ সারাবেলাকে বলেন, নাগরিক জীবনে গণশৌচাগার সমস্যা দূর করা ও স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। প্রতি ৫ মিনিট দূরত্বে একটি করে শৌচাগার থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। শৌচাগার সংয়কটে নারীরা সব থেকে বেশি ভুক্তভোগী জানিয়ে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ২৫ শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। উত্তর সিটিতে ১১ টি ও দক্ষিণ সিটি এলাকা ঢাকা মেডিকেল কলেজে একটি শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এ সমস্যা দূর করতে নুতন নুতন শৌচাগার নির্মাণই নয় বিভিন্ন মার্কেট, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, স্কুল- কলেজের টয়লেট গুলাকে সর্বসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবহার উপযোগী করার তাগিদ দেন তিনি। সিটি কর্পোরেশন ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি গণশৌচাগার গুলোতে নারী ব্যবহারকারী বাড়ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, শৌচাগার গুলোতে টেকসই ব্যবস্থাপণা, ব্যবহারকারীদের আরো বেশি সচেতনতা ও সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীল ভূমিকা নাগরিক জীবনে এ সমস্যা দূর করতে কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

ঢাকা শহরে যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে খোদ রাজধানীতে কয়েক হাজার শৌচাগারের প্রয়োজন রয়েছে। এখন নগরীতে মাদকসেবী, রিকশা, ভ্যানচালক, পথচারী, শিশু-কিশোর, টোকাই ও পাগল জাতীয় লোকজন প্রকাশ্যে রাস্তার কিনারে মলমূত্র ত্যাগ করে থাকে। যা উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় না। রাজধানীতে সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে কিছু শৌচাগার রয়েছে যার পরিবেশ ভালো নয়। শৌচাগারের অভাবে নগরবাসী যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ করায় বিভিন্ন রকম রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্য খাতে দেশে অবিশ্বাস্য অগ্রগতি হলেও রাজধানীতে জনসংখ্যার তুলনায় বাড়েনি পাবলিক টয়লেট। এর ফলে পথচারীদের সঙ্গে অস্বস্তিতে পড়ছেন সারাদিন রাস্তায় থাকা  ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। জরুরী প্রয়োজন মেটাতে যেতে হয় রাস্তার আশপাশের ভবনগুলোতে। এদিকে যানজট ও সড়কে নিরাপত্তা নিরসনে রাজধানীতে প্রায় ৫ হাজার ট্রাফিক পুলিশ সদস্য নিয়োজিত আছেন। তবে তাদের নিজস্ব কোনো টয়লেট বা শৌচাগার সুবিধা নেই। ডিউটিস্থলের আশপাশে অস্বস্তি নিয়েই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয় তাদের। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চান ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় দুই শতাধিক ট্রাফিক পুলিশের বক্স রয়েছে। আর সব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার ট্রাফিক পুলিশের সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তাদের নিজস্ব কোনো শৌচাগার সুবিধা নেই।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাবলিক রিলেশন্স ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান হিসেবে উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ফারুক হোসেন সংবাদ সারাবেলাকে জানান, অমানবিক পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। বেশি সমস্যায় ভোগছে ট্রাফিক পুলিশের নারী সদস্যরা। আমাদের যেহেতু নিজস্ব সম্পত্তি নেই তাই এ সমস্যা সমাধানে সিটি কর্পোরেশনের সাথে বারবার আলোচনা করছি। তবে ট্রাফিক পুলিশের এই শৌচাগার সমস্যা কবে দূর হবে তার সঠিক সময় জানা নেই বলে জানান তিনি। 

ওয়াটারএইডের গবেষণায় বলছে, ঢাকার সড়কপথে প্রতিদিন চলাচল করা ৫০ লাখ মানুষের জন্য পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা অপ্রতুল। যে কয়টা আছে সেগুলোর অধিকাংশই ব্যবহার অনুপযোগী। এই পরিস্থিতির উন্নতির জন্য ওয়াটারএইড বাংলাদেশ প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘মেকিং দ্য পাবলিক টয়লেট ওয়ার্ক’ থিমে পদক্ষেপ নেয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তারা এ পর্যন্ত ৩৫ টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের একমাত্র সোস্যাল ইমপ্যাক্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে ‘ভূমিজ’ পাবলিক টয়লেটগুলো নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে।

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৬.২২ বর্গ কিলোমিটারের এই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৬০ টি গণশৌচাগার রয়েছে। এরই মধ্যে আরো ৫৫ টি গণশৌচাগার নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। আরো ৫ টির কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ১৬ টি গণশৌচাগার নির্মাণ করেছে ওয়াটার এইড বাংলাদেশ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভূমিজ নির্মাণ করেছে ৫ টি গণশৌচাগার।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান নাসের খান সংবাদ সারাবেলাকে বলেন, নাগরিক জীবনে অনেক সমস্যার মধ্যে শৌচাগার সমস্যা প্রকট আকার ধারন করেছে। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে গণশৌচাগার নির্মাণ করা হলেও তা যতসামান্য। উন্নত ও আধুনিক নাগরিক সুবিধা পাওয়ার বিপরীতে পথচারীও কর্মজীবীদের কাছে শৌচাগার সমস্যা নিয়ে নগরবাসী উদ্বিগ্ন। নারীরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপেক্ষিত হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রতি কিলোমিটারে একটি করে শৌচাগার থাকা প্রয়োজন এই শহরে। যাতে মানুষ আধাকিলোমিটার চলার পরই টয়লেট সুবিধা পায় এ সমস্যা সমাধানে সিটিকর্পোরেশনের প্রতি বিশেষ পরামর্শ আমাদের। বিভিন্ন মার্কেট, শপিংমল,স্কুল- কলেজ  ও বাসস্ট্যান্ডে শৌচাগার থাকা বাধ্যতামূলক করা ও তার সঠিক পরিচর্যায় সিটিকর্পোরেশন দায়িত্ব নিলে এ সমস্যা সমাধানের পথ বের করা সহজ হবে বলে মনে করি আমি।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক: আবদুল মজিদ

প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । 01894-944220 । sangbadsarabela26@gmail.com

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2022 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.