বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের দুই কিলোমিটার রাস্তা এখন ১০ গ্রামের মানুষের দূর্ভোগে পরিনত হয়েছে। সড়কটি দেখে বোঝার উপায় নেই এটি কোন রাস্তা নাকি উচু নিচু মাটির টিলা। রাস্তাটি মেরামতের কাজ পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে গ্রামবাসীর।
সারাদেশে যখন গ্রামীণ সড়কে উন্নয়নের ছোঁয়া, কাঁচা সড়ক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, তখন উজিরপুর উপজেলার শিবপুর গ্রামের এই সড়কটি দেখে বোঝার উপায় নেই, উন্নয়নে কতটা বঞ্ছিত এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা।
প্রায় ২ কিলোমিটারের পুরো রাস্তা জুড়ে জায়গায় জায়গায় মাটি ফেলে স্তুপ করে রাখা হয়েছে সড়কটি। কোনপ্রকার যানবাহন চলাচল করা তো দূরের কথা গ্রামের মানুষেরা ঠিকমতো হাটতে পারছেন না রাস্তা দিয়ে।
জানা যায়, উজিরপুরের উপজেলার বেড়িবাঁধকে টেকসই নির্মান করতে পরিচালন বাজেটের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাতলা ইউনিয়নের ১৮৫০ মিটার রাস্তা মেরামতের পরিকল্পনা অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি টাকা প্রকল্পের বরাদ্দ দেয় সরকার। আর এই কাজের দায়িত্ব পায় নুনা ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কাজ পাওয়ার পর থেকে তারা যেন ঘুমিয়ে আছে, কোনো সাড়াশব্দ নেই; প্রকল্পেরও কোনো অগ্রগতি নেই। কিন্তু কাজের মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে হলেও সরেজমিনে রাস্তার চিত্র খুবই খারাপ। রাস্তাটির দিকে তাকালে মনে হবে মাটির স্তুপের উঁচু উঁচু ছোট পাহাড়।
এই রাস্তাটি যে ১০ টি গ্রামের মানুষের চলাচলের একটি মাত্র রাস্তা চোখে দেখলে তা বোঝা কোন উপায় নেই।
এমনিতে মাটির রাস্তা তার উপর আবার উঁচু উঁচু মাটির স্তুপ যেন গ্রামের মানুষের জীবনযাপনে এক বড় বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে।
চলাচলের পথটি খানাখন্দ হওয়ায় গ্রামের ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধরা পায়ে হেটে মসজিদে মক্তবে নামাজ ও আরবী পরতে যেতে খুবই কষ্ট হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাটি যেন কাঁদামাটির দখলে চলে যায়। মাটির এই রাস্তাটিতে বর্ষা মৌসুমে ভোগান্তি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটু পরিমাণ কাঁদা মাড়িয়ে চলতে হয় মানুষকে।
কাঁদামাটির রাস্তায় হাটতে গিয়ে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ও বয়স্কদের পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমর ও হাঁটুতে আঘাত পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে অহরহ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক বছর আগে মাটি ফেলে বাঁধটি সংস্কারের কাজ শুরু হয়। দশটি গ্রামের মানুষের চলাচলের একটি মাত্র রাস্তা উন্নয়নের খবরে স্বস্তি ফিরেছিল গ্রামবাসীদের মাঝে। কিন্তু কাজ শুরুর পর রাস্তার উপর মাটি ফেলে রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
মাটির স্তুপের কারনে এখন আগের থেকেও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে রাস্তাটি কিন্তু দেখার কেউ নেই। স্থানীয়দের এখন যেন ঘর থেকে বের হওয়াই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে।
পার্শ্ববর্তী এক বাড়িতে যাওয়ার পথে কাঁদামাটিতে পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমরে প্রচন্ড আঘাত পেয়ে এখন প্রায় অচল হয়ে পড়ে থেকে কথাগুলো খুব দুঃখ প্রকাশ করে বলছিলেন স্থানীয় ৭০ বছর বয়সী সালেহা বেগম।
তিনি বলেন আমাদের এখানে কোন গাড়ি চলাচল করতে পারেনা। দুই-তিন কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে আমাদের পায়ের উপরই ভরসা করতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ শহিদুজ্জামান বলেন, এই রাস্তাটি দিয়ে সাতলা,পয়সারহাট,বাগদা ঘোনাপাড়া পর্যন্ত মানুষ চালাচল করে। মাঝখান দিয়ে এই দুই কিলোমিটার রাস্তায় এখন চলাচলের অনুপযোগী। আমরা ঠিকমতো মসজিদে যেতে পারিনা। বাচ্চারা সকালে আরবী পড়তে মসজিদ আসতে পারেনা।
লুৎফর বাহাদুর নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, রাস্তাটির বিভিন্ন জায়গায় মাটি দিয়ে উচু নিচু করে রাখায় আমাদের চলাচলে খুব কষ্ট হয়। অসুস্থ রোগী নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে হেটে যেতে হয় কোন গাড়ি এখানে চলাচল করতে পারেনা। ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে যেতেও খুব সমস্যা হয়।
দক্ষিণ শিবপুর বায়তুর মামুর জামে মসজিদের ইমাম সাব্বির আল হোসাইন বলেন, আমাদের এই অপদার রাস্তাটি কয়েকটি গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করে। মাটি ফেলে রাস্তাটি এমন অবস্থা করে রাখছে যে ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের চলাচল করতে খুব কষ্ট হয়। মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে শিক্ষার্থীরা কাদায় পিছলা খেয়ে জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়। আর বর্ষার মৌসুমে হাঁটু পর্যন্ত কাঁদায় মসজিদে কেউ নামাজ পড়তে আসতে চায়না।
এ বিষয়ে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, বন্যায় পানি ডুকার আশংকায় বাঁধটি উঁচু করার একটি প্রকল্প গত বছর হাতে নেয়া হয়। কাজ চলাকালীন সময় ঘূর্নিঝড় রেমাল ও বন্যা হয়। কিন্তু পরবর্তী শুষ্ক মৌসুমে কাজটি আবার শুরু করা হয়।
বর্তমানে রাস্তাটির চারশো মিটার জায়গার মাটি ড্রেসিং সম্পন্ন হয়েছে। ইতিমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। বাকি অংশের কাজগুলো চলতি মাসে অর্থাৎ ঈদের পূর্বেই সম্পন্ন করবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।