ছবি: সংবাদ সারাবেলা।
গণিত বিষয়ে সর্বোচ্চ গবেষণা ডিগ্রি Doctor of Philosophy (PhD) অর্জন করে গৌরবময় সাফল্যের ইতিহাস রচনা করেছেন মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার কৃতি সন্তান ড. ইমরান হোসেন।তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট আর্লিংটন (ইউটিএ) থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, নিরলস অধ্যবসায় ও গভীর গবেষণার ফলস্বরূপ তিনি এই সম্মানজনক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর এই অর্জনে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক ও শুভানুধ্যায়ীদের মাঝে আনন্দ ও গর্বের আবহ বিরাজ করছে।
ড. ইমরান হোসেনের জন্ম বড়লেখা উপজেলার উঁচু-নিচু টিলা ও পাহাড়বেষ্টিত তারাদরম গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও কৌতূহলী। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলাই ছিল তাঁর প্রধান আনন্দ, পাশাপাশি বাড়ির পুকুরে সাঁতার কাটতেও তিনি ভীষণ আগ্রহী ছিলেন। শৈশবকাল থেকেই তাঁর মাঝে ধর্মীয় আদর্শ ও নৈতিকতার দৃঢ় উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
ছাত্র হিসেবে ড. ইমরান হোসেন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। মেধার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল নম্রতা, ভদ্রতা, বিনয় ও শান্ত স্বভাবের অনন্য সমন্বয়, যা তাঁকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় দাদা হারিছ আলীর দান করা জমিতে গড়ে ওঠা গ্রামের প্রথম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের অফিস ছিল তাঁর নিজের বাড়ির একাংশে, বাঁশ ও কাঠের বেঞ্চে বসেই চলত পাঠদান। বৃষ্টির দিনে ক্লাস হতো বাড়ির ভেতরে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় সরকারি ভবন না থাকায় খোলা আকাশের নিচেই পড়াশোনা করে এগিয়ে যেতে হয়েছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। সংগ্রামমুখর সেই সময়ই গড়ে দেয় তাঁর জীবনের শক্ত ভিত।
বাবা ইসলাম উদ্দিন ও মা সাহিদা বেগমের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু তারাদরম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর মুড়াউল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে তিনি বড়লেখা সরকারি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য সিলেটের মুরারি চাঁদ কলেজের গণিত বিভাগে ভর্তি হয়ে একই প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শৈশবকাল থেকেই গণিতের জটিল সমস্যা সমাধানে তাঁর আগ্রহ ও দক্ষতা শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক—প্রতিটি স্তরেই তিনি অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তাঁর লক্ষ্য ছিল জ্ঞানার্জন ও গবেষণার মাধ্যমে সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করা।
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে আমেরিকা পাড়ি দেয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন।কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় ২০১৯ তিনি আমেরিকায় সম্পূর্ণ স্কলারশিপ পেয়ে টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স অধ্যয়নের জন্য সুযোগ পেয়ে যাত্রা শুরু করেন। সেখানে সফলভাবে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর ২০২২ সালে তিনি পিএইচডি করার জন্য পুনরায় স্কলারশিপের আবেদন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট আর্লিংটন (ইউটিএ)- থেকে পিএইচডি অধ্যয়নের জন্যও ফুল স্কলারশিপ অর্জন করতে সক্ষম হন এবং ২০২৫ সালের মে মাসে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি সফলভাবে সম্পন্ন করেন।
এই পিএইচডি গবেষণার সময় তাঁকে নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা সংকটের মধ্যেও দীর্ঘ সময় গবেষণাগারে কাজ, তথ্য বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্র অধ্যয়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যান। কঠিন সেই পথচলা দৃঢ় প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে নিয়ে যায় তাঁকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে।
পরিবারের এই কঠিন সময়গুলোর কথা তুলে ধরতে গিয়ে ড. ইমরান হোসেনের ছোট ভাই কামরান নাজীর বলেন—ড. ইমরান হোসেনের ছোট ভাই কামরান নাজীর বলেন, “আমার ভাই অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ। বাবার ইন্তেকালের পর থেকেই তিনি আমাদের পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। সংসারের চাপ, মায়ের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা—সবকিছুর মধ্যেও তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। প্রতিটি প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অবিচলভাবে এগিয়ে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, ২০২০ সাল থেকে আমি হঠাৎ একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি। সে সময় আমার ভাই আমাকে সুস্থ করে তুলতে দেশে ও দেশের বাইরে (ভারত) টানা প্রায় পাঁচ বছর চিকিৎসা চালিয়ে যান। চিকিৎসা, মানসিক শক্তি ও সর্বক্ষণ পাশে থাকার মাধ্যমে তিনি আমাকে নতুন জীবন উপহার দিয়েছেন। আল্লাহর রহমত ও আমার বড় ভাইয়ের নিরলস প্রচেষ্টায় আজ আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।
কামরান আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, “এতগুলো ধাক্কা, পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক চাপের মধ্যেও আমার বড় ভাই নিজের স্বপ্ন থেকে একচুলও সরে যাননি। আজ তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন—এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, আমাদের পুরো পরিবারের বিজয়। এই অর্জনের জন্য আমরা আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শোকরিয়া আদায় করছি।”
ড. ইমরান হোসেনের গবেষণাকর্ম গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সমসাময়িক শাখায় নতুন জ্ঞান সংযোজন করেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের মতে, তাঁর গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগযোগ্য হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও অর্থনীতিসহ গণিতভিত্তিক নানা ক্ষেত্রে এটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ড. ইমরান হোসেন বলেন, “এই অর্জন একান্তই আমার একার নয়। আমার বাবা-মা, শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভানুধ্যায়ীদের দোয়া, ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণাই আমাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। তাঁদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।”
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে গণিত গবেষণা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে নতুন প্রজন্মকে গবেষণামুখী করে তুলতে চান। তাঁর বিশ্বাস, সঠিক দিকনির্দেশনা ও নিরলস পরিশ্রম থাকলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণিত ও বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
ড. ইমরান হোসেনের এই সাফল্য শুধু তাঁর পরিবারের জন্য নয়, বরং সমাজ ও দেশের শিক্ষাঙ্গনের জন্যও এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর অর্জন প্রমাণ করে—পরিশ্রম, ধৈর্য ও স্বপ্ন থাকলে যেকোনো লক্ষ্যই অর্জন করা সম্ভব। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর এই সফলতা নিঃসন্দেহে এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
