ছবি: সংবাদ সারাবেলা।
চলতি মাসের ৫ জানুয়ারি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মৌলভী চা বাগানের বাংলো টিলার ঢালে গলা কাটা এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকা একটি লাশ পাওয়া যায়। স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে মৌলভীবাজার সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে লাশ উদ্ধার করে পরবর্তীতে লাশের ময়না তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে এবং মৃত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টার পর জানতে পারে ওই ব্যক্তির নাম জাকির হোসেন (৫০)।
লোহমর্ষক ওই ঘটনায় পরবর্তীতে জাকির হোসেনের স্ত্রী আনজিলা বেগম বাদী হয়ে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ( মামলা নং-৬, তারিখ-৬ জানুয়ারি, ২০২৬)। হত্যাকাÐের শিকার জাকির হোসেন সুনামগঞ্জ জেলা সদরের ইব্রাহীমপুর গ্রামের মৃত মকবুল হোসেন এর ছেলে। পেশায় দিনমজুর জাকির হোসেন থাকতেন মৌলভীবাজার শহরের বনবীথি এলাকার সাইফুর রহমান স্টেডিয়াম সংলগ্ন লিয়াকত আলীর কলোনীতে।
ঘটনার পরপরই মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সদর থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে এসআই উৎপল সাহা, এসআই জয়ন্ত সরকার, এসআই হিরণ বিশ্বাস,এএসআই রানা মিয়া, এএসাই সাইদুর রহমান সহ পুলিশের বিশেষ টিম গঠন করে দ্রæত তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত দিনমজুর জাকির হোসেন এর পরিবারের দেওয়া তথ্য ও পুলিশের গোপন সোর্স এবং তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় প্রাথমিকভাবে হত্যাকাÐের সাথে জড়িত আকাশ এবং স্বাধীন নামে দুই যুবককে শনাক্ত করা হয়। শনাক্তের পর তাদের ধরতে মৌলভীবাজার থেকে রওয়ানা হয় পুলিশের একটি তদন্ত দল। পরবর্তীতে ৭ জানুয়ারি ভোরে তাদেরকে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ছুফুয়া বাবুর্চি বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হয় মৌলভীবাজারে। এর পর ৮ জানুয়ারি সকালে গ্রেফতারকৃত দুইজনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে ফের অভিযান চালায় পুলিশ। ঘটনাস্থল এবং তার আশেপাশে তল্লাশী করে ঘটনাস্থল থেকে ৩০০ মিটার দুরে গ্রেফতারকৃত দুইজনের দেখানো মতে হত্যাকাÐে ব্যবহৃত রক্তমাখা দা এবং আসামি স্বাধীনের রক্তমাখা হুডি জব্দ করা হয়।
পুলিশ জানায়, দিনমজুর জাকির বিভিন্ন বিল্ডিংয়ে ইট, বালু ও মাটি তোলাসহ দিনমজুরের কাজ করতেন। অপরদিকে আসামি স্বাধীন গাড়ির বালু ও ইট তোলার কাজ করতেন এবং হেলপার হিসেবে কাজ করতেন। কাজের সূত্র ধরে প্রায় এক বছর আগে জাকিরের সাথে স্বাধীনের পরিচয় হয়। জাকির প্রায়ই চা–বাগানে গিয়ে বাংলা মদ খেতেন। বন্ধুত্বের কারণে স্বাধীন জাকিরকে সময় দিতেন এবং তার সঙ্গে চলাফেরা করতেন।
পরিচয়ের প্রায় তিন মাস পর একদিন রাতে জাকির বাংলা মদ পান করে দেওরাছড়া চা বাগানে স্বাধীনকে নিয়ে যান। সেখানে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে জাকির স্বাধীনের শরীরে হাত দেন এবং শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেন। প্রথমে স্বাধীন রাজি না হলেও পরে জাকির তাকে রাজি করান। এর প্রায় এক মাস পর তারা আবার দেওরাছড়া চা বাগানে গিয়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়। পরবর্তীতে দেওরাছড়া ও মৌলভী চা বাগানে তারা একাধিকবার সমকামিতায় লিপ্ত হন।
ওই সম্পর্কের সূত্রে জাকির ও স্বাধীনের মধ্যে এক ধরনের আর্থিক লেনদেনও শুরু হয়। জাকির তার আয় করা টাকা বিকাশে রাখতেন এবং প্রায়ই স্বাধীনকে ২শ থেকে ৫শ টাকা দিতেন। স্বাধীনের ধারণা ছিল জাকিরের বিকাশে ২০– থেকে ৩০ হাজার টাকা থাকে। এক পর্যায়ে স্বাধীন জাকিরের বিকাশ অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড জেনে নেয়।
ওদিকে স্বাধীনের আরেক বন্ধু ছিল মৌলভী চা বাগানের বাসিন্দা আকাশ রবি দাশ। স্বাধীন জাকিরের সঙ্গে আকাশের পরিচয় করিয়ে দেয় এবং তারা তিনজন বিভিন্ন সময় একসঙ্গে আড্ডা দিত। স্বাধীনের সঙ্গে জাকিরের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি স্বাধীন আকাশকে জানায়। আকাশের টিকটক করার জন্য মোবাইল কেনার টাকা দরকার ছিল এবং স্বাধীনের কাছেও টাকা-পয়সা ছিল না। এ অবস্থায় আকাশ ও স্বাধীন পরিকল্পনা করে জাকিরকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল, জাকিরকে মেরে তার কাছ থেকে পাওয়া নগদ টাকা ও বিকাশের টাকা নিয়ে তারা কুমিল্লা চলে যাবে। উল্লেখ্য, এর আগে স্বাধীন কুমিল্লায় কাজ করে এসেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীন জাকিরকে জানায় যে তারা শারীরিক সম্পর্কে আকাশকে যুক্ত করতে চায়। জাকির এতে রাজি হয়। ঘটনার আগের দিন ফোনে কথা বলে তারা তিনজন বাগানে মিলিত হওয়ার সময় ঠিক করে নেয়। নির্ধারিত দিন ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭টার দিকে জাকির গিয়াসনগর বাজারে আসে। আকাশ ও স্বাধীন তাকে রিসিভ করে। বাজারে তারা তিনজন একসঙ্গে চা খায়। পরে আকাশ কিছু সময়ের জন্য বাড়ি যায়। এদিকে জাকির ও স্বাধীন বাগানে গিয়ে বাংলা মদ কিনে পান করে এবং পরে গিয়াসনগর বাজারে এসে আকাশের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
প্রায় আধঘণ্টা পর আকাশ তার বাড়ি থেকে একটি দা জ্যাকেটের নিচে লুকিয়ে এনে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরপর আকাশ, জাকির ও স্বাধীন গিয়াসনগর হয়ে বাংলা টিলা হয়ে রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
সেখানে জাকির কিছু কনডম কিনে নেয় এবং নিজে প্যান্ট খুলে আকাশ ও স্বাধীনকে কনডম দেয়। এ সময় আকাশ ও স্বাধীন সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে জাকির বিরক্ত হয়ে তর্ক শুরু করলে আকাশ জ্যাকেটের ভেতর লুকানো দা বের করে। তখন স্বাধীন দা দিয়ে জাকিরের পায়ে আঘাত করে। জাকির পায়ে হাত দিলে স্বাধীন হাতে আঘাত করে। পরে আকাশ দা নিয়ে জাকিরের মাথায় একাধিক আঘাত করলে জাকির মাটিতে পড়ে যায়। এরপর আকাশ ও স্বাধীন পালাক্রমে দা দিয়ে জাকিরের গলায় আঘাত করে, ফলে জাকির নিথর হয়ে যায়। এরপর আকাশ দা বাগানেই ফেলে দেয় এবং স্বাধীনের রক্তমাখা জ্যাকেট বাগানের নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। জাকিরের পকেট থেকে ১শত ৫০ টাকা নগদ ও একটি বাটন মোবাইল ফোন নিয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে হেঁটে বিসিক শিল্পনগরীর কাছে যায়। সেখান থেকে সিএনজি করে তারা মৌলভীবাজার চৌমুহনায় পৌঁছে। তখন রাত ১২টা ২০ মিনিট। পরবর্তীতে শহরের চৌমুহনায় কাপড়ের দোকান বন্ধ থাকায় তারা বাজার টার্নিংয়ে যায়। জাকিরের বিকাশে থাকা ২হাজার ৫শত টাকা তালুকদার বিপণী থেকে ৪শ টাকা দিয়ে একটি হুডি কেনে এবং বাকি ২ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করে। এরপর বাজার টার্নিংয়ের কিসমত হোটেলে খেয়ে দুজন সিএনজি করে যার যার বাড়িতে চলে যায়। পরদিন ৪ জানুয়ারি সকাল ৯টার দিকে তারা ফের গিয়াসনগর বাজারে এসে শ্রীমঙ্গল যায় এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে দুজন কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
দিনমজুর জাকির হত্যাকাÐের ঘটনায় গ্রেফতার দুই আসামীর মধ্যে আকাশ রবি দাশ (২০) মৌলভীবাজার সদর উপজেলা গিয়াসনগর উপজেলার মৌলভী চাবাগানের চা শ্রমিক লক্ষীনারায়ন রবিদাস এর ছেলে ও অপর আসামী
স্বাধীন আহমেদ (২০) একই উপজেলার নিতেশ^র এলাকার সেলিম মিয়া‘র ছেলে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নোবেল চাকমা বলেন, পুলিশ ঘটনার পর ফোনের কথোপকতনের সূত্র ধরে ব্যাপক তদন্তের মাধ্যমে ২ আসামী শনাক্ত করে পরবর্তীতে দ্রæত সময়ের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের আদালতে তোলা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
