ঝিনাইদহের বিভিন্ন গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় মাদ্রাসার শিক্ষক পরিচয়ে ঘুরে ঘুরে অনুদান সংগ্রহ করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে আলী হাসান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে পরিচালিত এই অর্থ উত্তোলনের পেছনে রয়েছে অলিখিত চুক্তি, আত্মীয়তার সমঝোতা এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি, এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।
সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে দারুল হিকমাহ্ মডেল মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দান, সদকা ও মাদ্রাসার ব্যয়ের কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহ করতেন। তার কথায় বিশ্বাস করে বহু ধর্মপ্রাণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছিলেন। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে তিনি আদৌ ওই মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক নন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাদ্রাসার নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ সংগ্রহ করা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আলী হাসানের এবং মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ মাওলানা মুফতি মনিরুজ্জামানের মধ্যে মাসিক মাত্র চার হাজার টাকার অলিখিত চুক্তি ছিল। এই ভিত্তিতেই তিনি গ্রামে-গঞ্জে অনুদান তুলতেন। সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ নিজের কাছে রেখে সামান্য অংশ মাদ্রাসায় দিতেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, মাদ্রাসার পরিচালক এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি পরস্পরের নিকট আত্মীয়। ফলে পুরো ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত আর্থিক প্রতারণা কিনা, তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক গুঞ্জন ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক দাতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আল্লাহর নামে দান করেছি। এখন জানতে পারছি, সেই টাকা মাদ্রাসায় না গিয়ে ব্যক্তির পকেটে গেছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রতারণা।”
সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, মাদ্রাসায় বর্তমানে মাত্র ২২ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। তারা সবাই হাফেজী বিভাগে পড়াশোনা করছে এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থী মাসিক দুই হাজার টাকা ও এক বস্তা চাল নিয়মিত প্রদান করে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই মাদ্রাসায় উল্লেখযোগ্য অর্থ ও খাদ্য সহায়তা আসে। এই অবস্থায় বাইরে থেকে বিপুল অঙ্কের অনুদান সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল। তাদের অভিযোগ, প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব গোপন রেখে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে পরিকল্পিতভাবে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ মাওঃ মুফতি মনিরুজ্জামান বলেন, “তিনি আমাদের মাদ্রাসার নাজেরানা বিভাগের ক্বারী। তিনি মাদ্রাসার জন্য কিছু সহযোগিতা করতেন। মাসিক একটি নির্দিষ্ট টাকা দিতেন। একপর্যায়ে তিনি আরও জানান, ২২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ জন এতিম কিন্তু এতিমদের বিষয়ে তথ্য চাইলে তিনি সাংবাদিকদের ওপর ক্ষিপ্ত হন এবং তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি শিক্ষক না হয়েও মাদ্রাসার পরিচয়ে টাকা তোলার অনুমতি কীভাবে পেলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হোসনেআরা বলেন, “কেউ যদি ভুয়া পরিচয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলন করে থাকে, সেটি প্রতারণার শামিল। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এলাকাবাসীর মতে, ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এ ধরনের চুক্তিভিত্তিক অর্থ উত্তোলন শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। তারা অবিলম্বে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংগৃহীত অর্থের হিসাব প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।