ছবি: সংগৃহিত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু ঘটনা থাকে, যেগুলো কেবল আন্দোলনের অংশ নয়, সেগুলো হয়ে ওঠে আত্মত্যাগ, বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতীক। তেমনই এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ২৫ জুলাই। বিএনপি তখন বিরোধী দলে। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে উত্তাল রাজপথ। ঢাকার দিক থেকে শুরু হয় ঐতিহাসিক রোডমার্চ।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভালুকায় আসবেন-এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাজার হাজার নেতাকর্মীর মধ্যে নেমে আসে উৎসবের আমেজ। মিছিল, স্লোগান, মানুষের ঢল, সবকিছুর মাঝেই হঠাৎ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন এক তরুণ নেতা। তিনি মাহবুবুল আলম সিদ্দিকী, যিনি দুলু নামেই পরিচিত।
সেদিন রাস্তায় নেমে মিছিলে অংশ নেওয়া দুলুকে এক নজর দেখতেই ভিড় করেন গণমাধ্যমকর্মী ও দলের নেতাকর্মীরা। কারণ দুলুর পিঠে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল-মা খালেদা জিয়া বিএনপি।
কিন্তু এ লেখা কোনো কালি বা রঙে নয়। কোনো ব্যানার বা প্ল্যাকার্ডেও নয়। নিজের পিঠে আগুনে লোহা গরম করে, এক অক্ষর এক অক্ষর করে পুড়িয়ে লেখা হয়েছিল এই বাক্য। শরীরের যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে তিনি ধারণ করেছিলেন রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা।
খালেদা জিয়া ভালুকা সরকারি কলেজ মাঠে পৌঁছানোর পর দুলুকে মঞ্চে হাজির করা হয়। আগুনে পোড়া অক্ষর, ফোসকা পড়া পিঠ-সবকিছু দেখে শিহরিত হয়ে ওঠেন দেশনেত্রী। আবেগে নীরব হয়ে যান তিনি। উপস্থিত হাজারো মানুষ প্রত্যক্ষ করেন এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক মুহূর্ত।
দীর্ঘ ২৬ বছর পর আজ সেই ছবিটি শুধুই স্মৃতি। কিন্তু স্মৃতির ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি জীবনসংগ্রামের গল্প।
মাহবুবুল আলম সিদ্দিকী (দুলু) জন্মগ্রহণ করেন ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালে। তাঁর পিতা প্রয়াত শামছুল হুদা দীর্ঘ ৪২ বছর শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। সর্বশেষ ২০০৬ সালে গফরগাঁও চরমছলন্দ মুসলিম হাই স্কুল থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নেন। মাতার নাম প্রয়াত ফাতেমা খাতুন। পারিবারিক নিবাস ভালুকা পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের ভান্ডাব গ্রামে।
পিতার কর্মস্থলের কারণে দুলুর শৈশব ও শিক্ষাজীবন কেটেছে গফরগাঁওয়ে। গফরগাঁও ইসলামিয়া সরকারি স্কুল থেকে ১৯৮৮ সালে এসএসসি এবং গফরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে ১৯৯২–৯৩ শিক্ষাবর্ষে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। কলেজ জীবনে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রদল কলেজ শাখার প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং জিএস নির্বাচনেও অংশ নেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদল করার কারণে অনেকের মতো তিনিও বাধার মুখে পড়েন। সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পরীক্ষা দিতে পারেননি। পরে ১৯৯৭ সালে ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। রাজনৈতিক জীবনে তাকে খেতে হয়েছে আটটি মামলা, যেতে হয়েছে জেলে, সহ্য করতে হয়েছে নানা নির্যাতন।
মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর নিজ এলাকায় ফিরে নতুন করে রাজনৈতিক পথচলা শুরু করেন। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও দল থেকে কোনো সুযোগ নেননি বলে দাবি করেন তিনি। চাঁদাবাজি বা সুবিধাভোগী রাজনীতির বাইরে থাকার কথাও জানান।
২০০৪ সালের পৌর নির্বাচন থেকে টানা চারবার, অর্থাৎ প্রায় ২০ বছর ভালুকা পৌরসভার ০১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দুলু। ১/১১-এর কঠিন সময়ে তিনি ভালুকা পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বও পালন করেন।
২০১৩ সালের ২৬ মে বিএনপি ডাকা হরতালের দিনে তাঁর জীবনে নেমে আসে ব্যক্তিগত শোক। হজ পালনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তাঁর পিতা। তবুও রাজনীতি ছাড়েননি তিনি।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, দুলু কমিশনারের আচার-আচরণ ছিল সাধারণ মানুষের মতোই সহজ ও মানবিক। কাউন্সিলর নির্বাচনে বাবার সম্পদ বিক্রি করেও নির্বাচন করেছেন, কিন্তু দল থেকে কখনো সুবিধা নেননি-এমন দাবিও করেন তিনি।
মাহবুবুল আলম সিদ্দিকী দুলুর ভাষায়, আমি ব্যক্তি নই। আমার প্রতীক ধানের শীষ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানই আমার পরিচয়।
রাজনীতির ইতিহাসে হয়তো অনেক স্লোগান লেখা হয়েছে ব্যানারে, অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে মঞ্চে। কিন্তু নিজের শরীরকে রাজনীতির ভাষায় রূপ দেওয়ার ঘটনা খুব কমই দেখা যায়। রোডমার্চ ১৯৯৯–এর সেই আগুনে লেখা আজও বিএনপির রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী, সাহসী ও আবেগঘন অধ্যায় হয়ে আছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
