পাথর খেকোদের অবিরাম তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে সিলেটের শাহ আরেফিন টিলা।মামলা ও অভিযানেও থামছে না ধ্বংসযজ্ঞ।
চেকপোস্ট পার হয়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে লুটের পাথর প্রায় ৫০০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই টিলায় এখন আর প্রকৃতির কোনো চিহ্ন নেই, শুধু দেখা মিলবে ক্ষতবিক্ষত ভূমি। তবুও থেমে নেই লুটপাট। ধ্বংসস্তূপের বুকেই বসানো হয়েছে অবৈধ ‘বোমা মেশিন’ চলছে কোদাল-বেলচার খোঁচা। মাটি উলটে-পালটে প্রতিদিন লুট করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পাথর। এতে রক্ষা পাচ্ছে না টিলার শেষ অংশটুকুও।
এদিকে, পাথর লুটের ঘটনায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো ও কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ। এর আগে গত ১০ নভেম্বর জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম শাহ আরেফিন টিলা পরিদর্শনে গিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ দেখে বিস্মিত হন। পরবর্তীতে পাথর লুট ঠেকাতে শাহ আরফিন টিলা ও পাড়ুয়া বাজারের প্রবেশ মুখে লোহার বেষ্টনী বসানো হয়। তবে সেটিও কোনো কাজে আসেনি। বিকল্প পথ ব্যবহার করে পাথর পাচার অব্যাহত রেখেছে দুর্বৃত্তরা।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, টিলার বুকজুড়ে গর্ত আর গর্ত। বসানো হয়েছে অবৈধ ‘বোমা মেশিন’ (পাথর ভাঙার কল), কোথাও কোদাল-বেলচা দিয়ে মাটি খুঁড়ে তোলা হচ্ছে পাথর। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই কয়েকশ শ্রমিক একযোগে পাথর উত্তোলনে ব্যস্ত। উত্তোলিত এসব পাথর হাইব্রিড ট্র্যাক্টর ও ট্রলিতে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোম্পানীগঞ্জ ও ভোলাগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন স্টোন ক্রাশার মিলে। প্রশাসনের নজর এড়াতে মূল সড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে না। শাহ আরেফিন টিলা থেকে পাথর বোঝাই ট্যাক্টর ও ট্রলি ফসলি জমির মাঝ দিয়ে ও বিভিন্ন ফাঁড়ি রাস্তা ব্যবহার করে ভোলাগঞ্জ এলাকায় প্রবেশ করছে। সেখানে ক্রাশার মেশিনে পাথর ভেঙে ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। সিলেট থেকে কোম্পানীগঞ্জ পর্যন্ত একাধিক পুলিশ চেকপোস্ট থাকলেও এসব পাথরবাহী যান নির্বিঘ্নেই গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে।
ভোলাগঞ্জ এলাকার পাথর ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ভারত থেকে কোনো পাথর আমদানি হচ্ছে না। তবুও এলাকার সবকটি স্টোন ক্রাশার মিল পুরোদমে চালু রয়েছে। সরেজমিনে ভোলাগঞ্জে অবস্থান করে দেখা গেছে, শাহ আরেফিন টিলা থেকে প্রতিদিন ট্রলি ট্রলি পাথর ঢুকছে এসব ক্রাশার মিলে। নারী-পুরুষ শ্রমিকরা এসব পাথর ভাঙছেন।
এদিকে পাথর লুটের ঘটনায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) মো. আনোয়ারুল হাবীব ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৪০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এর আগে ৩০ ডিসেম্বর কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে আটক করে। ওইদিনই এসআই মো. কামরুল আলম বাদী হয়ে ৪৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
পাথর লুট প্রসঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, পাথর লুট ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুক্রবার অভিযানে ৪০টি মেশিন ভাঙা হয়েছে। এর আগেও শাহ আরেফিন টিলায় একাধিক অভিযান চালানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার কাজী আখতার উল আলম বলেন, শাহ আরেফিন টিলা থেকে যেন কোনোভাবেই পাথর লুট না হয়, সে জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চলছে। গত কয়েক মাসে তিনটি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩২ জনকে। পাশাপাশি ৫৬টি বোমা মেশিন ও দুটি ট্যাক্টর ধ্বংস করা হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও পুরোপুরি পাথর লুট বন্ধ করা যাচ্ছে না। স্থানীয়দের সহযোগিতা ছাড়া এই লুট ঠেকানো কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পাথর লুট ঠেকাতে ভবিষ্যতে নতুন কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কিছু জানাননি।