শীতের নরম রোদ যখন পাহাড়ের কোলে আলতো করে ছুঁয়ে যায়, তখন মাটিরাঙ্গা উপজেলার হর্টিকালচার সেন্টারের আঙিনা যেন জেগে ওঠে এক অলৌকিক সৌন্দর্যে। কুয়াশার আড়াল ভেদ করে আলো ছড়িয়ে পড়তেই প্রথমে ঝিলমিল করে ওঠে পাতার ডগা, তারপর ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে রঙের এক অপরূপ মেলা।
বিদেশি জাতের অসাধারণ ফুল গ্লাডিওলাস সারি সারি গাছে দাঁড়িয়ে আছে যেন পাহাড়ের বুকে কেউ রঙিন তুলির আঁচড় বুলিয়ে দিয়েছে। লাল রঙে ধরা পড়ে সূর্যাস্তের শেষ আভা, হলুদে সকালের প্রথম আলোর সোনালি হাসি, বেগুনিতে গভীর রাতের আকাশের এক টুকরো নেমে এসেছে মাটিতে। আর সাদা রঙ যেন তুষারের নরম ছোঁয়া শান্ত ও নিষ্পাপ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গোলাপি, কমলা ও দ্বি-রঙা নানা ছায়া। মোট পনেরো রকমের রঙ নীরবে উৎসব করে চলেছে এই পাহাড়ি আঙিনায়। হালকা মিষ্টি সুবাস ভেসে বেড়ায় বাতাসে। পাহাড়ের শীতল স্পর্শ মিশে যায় ফুলের সৌরভে। দূরের ঝর্ণার কলকল ধ্বনি আর পাখির কিচিরমিচিরের সঙ্গে মিলেমিশে এক নীরব উৎসবের সুর তোলে প্রকৃতি। গ্লাডিওলাসের লম্বা ডাঁটা তরবারির মতো সোজা দাঁড়িয়ে পাহাড়ি ঢালে এনে দিয়েছে এক অনন্য গাম্ভীর্য। প্রতিটি পাপড়ি ধীরে ধীরে খুলে যেন বলে ওঠে প্রকৃতি কত নিঃশব্দে, কত গভীরভাবে রঙ ছড়াতে জানে।
খাগড়াছড়ির পাহাড়ঘেরা সবুজ জনপদ মাটিরাঙ্গা। আর এই জনপদের সৌন্দর্যকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারে ফুটে থাকা হরেক রঙের গ্লাডিওলাস । শীতের হিমেল হাওয়ায় দোল খাওয়া এই ফুলগুলো এখন পর্যটক ও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হর্টিকালচার সেন্টারের চলাচল রাস্তার পাশজুড়ে সারিবদ্ধভাবে ফুটে আছে গ্লাডিওলাস । লাল, সাদা, হলুদ, গোলাপি ও বেগুনি রঙের এই ফুলগুলো যেন মাটির বুকে এক টুকরো রংধনু। দীর্ঘ ডাঁটার ওপর নিপুণভাবে সাজানো প্রতিটি ফুলই জানান দিচ্ছে শীতের স্নিগ্ধতা। প্রতিদিন স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা ফুলের সঙ্গে সেলফিতে মেতে উঠছেন।
উপজেলা হর্টিকালচার সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, গ্লাডিওলাসের এসব ফুল যশোর থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। মোট ১ হাজার ২০০টি বাল্ব (কন্দ) আনা হয়, প্রতিটির মূল্য ছিল ২০ টাকা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত বারি গ্লাডিওলাস -১, ২ ও ৩ জাতের এসব ফুল নভেম্বরের শুরুতে রোপণ করা হয়। শীতকালীন এই ফুলগুলো এখন পূর্ণ যৌবনে পৌঁছে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে।
গ্লাডিওলাস ফুলের আদি নিবাস দক্ষিণ আফ্রিকা। দীর্ঘ দন্ডে সারিবদ্ধ পাপড়ির গঠন ও উজ্জ্বল রঙের কারণে বিশ্বজুড়ে এই ফুলের কদর আলাদা। মাটিরাঙ্গার পাহাড়ি আবহাওয়া ও অনুকূল শীতকালীন পরিবেশে ফুলগুলো বেশ ভালোভাবেই বেড়ে উঠেছে, যা পার্বত্য এলাকায় বাণিজ্যিক ফুল চাষের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।
হর্টিকালচার সেন্টারের কর্মীদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নয়; বরং স্থানীয় কৃষকদের ফুল চাষে অগ্রহী করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য। পাহাড়ের মাটি ও জলবায়ু যে শুধু ফল ও সবজির জন্য নয়, শীতকালীন ফুল চাষেও সমান উপযোগী— গ্লাডিওলাসের এই রঙিন উপস্থিতি তারই প্রমাণ।
গ্লাডিওলাস মূলত ‘কাট ফ্লাওয়ার’ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। গাছ থেকে কাটার পরও দীর্ঘ সময় ফুলদানি বা সাজসজ্জায় সতেজ থাকে এই ফুল। বিয়ে, উৎসব ও জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন আয়োজনে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
দর্শনার্থীদের অনুভূতিও রঙিন এই অভিজ্ঞতার সাক্ষ্য দেয়।
নাজমুল হাসান বলেন, “পাহাড়ে এসে সাধারণত সবুজ আর নীল আকাশই দেখি। কিন্তু এখানে এসে মনে হলো, শীত যেন রঙের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে। গ্লাডিওলাস ফুলগুলো সত্যিই চোখ জুড়িয়ে দেয়।”
চৌধুরী পাড়ার বাসিন্দা নাজমুল হোসেন বলেন, “শিশুদের নিয়ে বেড়াতে এসে এমন মনোমুগ্ধকর ফুলের বাগান পাওয়া আমাদের জন্য বাড়তি আনন্দ। বাচ্চারাও রঙিন ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ নিয়ে ছবি তুলছে।”
পর্যটক জামাল হোসেন বলেন, “পাহাড়ের স্বাভাবিক প্রকৃতির সঙ্গে এই ফুলের বাগান এমনভাবে মিলেমিশে গেছে যে আলাদা করে চোখে পড়ে এক অনন্য সৌন্দর্য। শীতের এই নীরব সময়টাকে গ্লাডিওলাস ফুল আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্লাডিওলাস একটি উচ্চমূল্যের ফসল। ধানের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি লাভ হওয়ায় পাহাড়ি কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে এই ফুল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টার থেকে মানসম্মত বীজ বা কন্দ সংগ্রহ করে সহজেই স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মাটিরাঙ্গা উপজেলা হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, পাহাড়ঘেরা মাটিরাঙ্গার মাটি ও আবহাওয়া যেন প্রকৃতির আশীর্বাদ গ্লাডিওলাস চাষের জন্য একেবারেই উপযোগী। তিনি বলেন, “মাটিরাঙ্গার মাটি ও জলবায়ুর সঙ্গে ফুলের এক অদ্ভুত সখ্যতা রয়েছে। এখানকার আবহাওয়া ফুল চাষে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। প্রদর্শনী ব্লকের মাধ্যমে আমরা কৃষকদের এই সৌন্দর্যমন্ডিত ও লাভজনক ফুল চাষে উৎসাহিত করছি, যাতে শীতের বাগান হয়ে ওঠে আরও রঙিন ও সম্ভাবনাময়।”
শীতের এই মিঠে রোদে মাটিরাঙ্গা হর্টিকালচার সেন্টারের গ্লাডিওলাস বাগান যেন প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এই রঙিন মুহূর্ত উপভোগ করতে মাটিরাঙ্গার এই পুষ্পরাজ্যে একবার ঘুরে আসাই যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
