একসময় ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকা লক্ষ্মীপুরের পিয়ারাপুর এলাকা এখন পরিচিত সবুজে ঘেরা এক প্রাণবন্ত উদ্যানে। যেখানে বাতাসে ভাসে ফুলের সুবাস, চোখ জুড়ায় হরেক প্রজাতির গাছের সমাহার। সেই এলাকাতেই দুই ভাই—মোরশেদ ও আনোয়ার হোসেন—তাদের নিরলস পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন একটি সফল বৃক্ষরাজ্য, যার নাম ‘আনোয়ার নার্সারি’।
মাত্র ৮ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যোগ আজ দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ টাকারও বেশি মূলধনে। ছোট পরিসরের একটি বাগান থেকে শুরু হয়ে বর্তমানে নার্সারির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ছয়টি। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ১২ জন শ্রমিকের।
নার্সারিতে নিয়মিত কাজ করেন ৮ জন শ্রমিক। পাশাপাশি ৪ জন শ্রমিক ভ্যানে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরে গাছ বিক্রি করেন। নার্সারির শ্রমিক মো. রফিক বলেন,
“আগে এই এলাকায় ধোঁয়ার কারণে টিকে থাকা কঠিন ছিল। এখন আমরা সারাদিন গাছের সঙ্গেই থাকি। এখান থেকে পাওয়া মজুরিতে আমাদের সংসার ভালোভাবেই চলছে।”
ভ্যান চালক শ্রমিক কামাল হোসেন জানান,
“১০ টাকার চারা থেকে শুরু করে দামি চারাও আমরা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিই। এখন মানুষ গাছ লাগাতে অনেক বেশি আগ্রহী।”
‘আনোয়ার নার্সারি’ এখন কেবল গাছ বিক্রির কেন্দ্র নয়, বরং এটি এক ধরনের সবুজ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বাগান দেখতে আসা ক্রেতা আরিফুল ইসলাম বলেন,
“অনলাইনে গাছ কিনে অনেক সময় প্রতারিত হয়েছি। এখানে এসে নিজের চোখে দেখে, পছন্দ করে সাশ্রয়ী দামে চারা নিতে পারছি। পরিবেশটাও দারুণ।”
পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সুমি আক্তার বলেন,
“বাচ্চাদের গাছ চেনানোর জন্য নিয়ে এসেছি। একসময় এখানে ব্রিক ফিল্ডের ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসত, আর এখন ছবি তুলছি। নিম, আম আর কিছু ঔষধি চারা কিনেছি।”
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সরকারি সহায়তা ছাড়াই, কেবল দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর পরিশ্রমকে পুঁজি করে সফল হয়েছেন এই দুই ভাই। উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন বলেন,
“আমাদের লক্ষ্য হলো—মানুষ যেন অনলাইনে প্রতারিত না হয়ে সরাসরি দেখে সুস্থ ও মানসম্মত চারা সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি আমরা সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও নিয়মিত সাজসজ্জার কাজ করে থাকি।”
বর্তমানে নার্সারিতে ১০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা মূল্যের বিরল সব চারা পাওয়া যায়। নিম, বিভিন্ন জাতের আম, নারিকেল, সুপারি ছাড়াও রয়েছে দুর্লভ ঔষধি ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। ইটভাটার ছাই সরিয়ে সবুজ বিপ্লব গড়ে তোলা এই উদ্যোগ এখন পুরো লক্ষ্মীপুর জেলার জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।