× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

প্রান্তিক বাঘাইছড়ির নতুন ভোটার; কী তাদের প্রত্যাশা?

মো. আরিফুল ইসলাম, বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি

০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:০১ পিএম

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলা। উত্তরে ভারত সীমান্ত, পূর্বে মিজোরাম রাজ্য, দক্ষিণ-পূর্বে কাপ্তাই লেকের বিস্তীর্ণ জলরাশি আর পশ্চিমে দীঘিনালার সবুজ পাহাড়। এই উপজেলা কেবল এর ভৌগোলিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকার এক জটিল আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিচ্ছবি। 


স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের সহাবস্থান, ভূমি বিরোধ, যোগাযোগ ও অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে সুযোগের অভাব এসবই এখানকার জনজীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী।


এই প্রেক্ষাপটে, উপজেলার মোট ভোটারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো যুব সমাজ। যারা প্রথমবার অথবা দ্বিতীয়বারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চলেছে। এদের সংখ্যা কত, তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও, অনুমান করা যায় যে মোট ভোটারের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশই তরুণ। এই যুব সমাজই আগামীর বাঘাইছড়িকে নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু তাদের আগ্রহ ও প্রত্যাশা কী? তারা কি কেবল গতানুগতিক ধারায় ভোট দেবে, নাকি নিজেদের স্বপ্ন পূরণের জন্য পরিবর্তনের প্রতীক্ষায় রয়েছে?


এই বিশেষ ফিচার রিপোর্টে বাঘাইছড়ির দুর্গম সাজেক, কাচালং নদী তীরবর্তী মারিশ্যা, আমতলী এবং উপজেলা সদর এলাকা ঘুরে দেখা হয়েছে যুব ভোটারদের মনস্তত্ত্ব, আকাঙ্ক্ষা এবং তাদের ভোট ভাবনা। তাদের স্বপ্ন, হতাশা, এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুর একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরাই এই রিপোর্টের লক্ষ্য।


মাঠপর্যায়ের চিত্র ও যুব মনস্তত্ত্ব:-


বাঘাইছড়ি উপজেলার যুব ভোটারদের একটি বড় অংশই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বাঙালি তরুণ-তরুণীদের সমন্বয়ে গঠিত এই ভোটার তালিকা। জাতিগত পরিচয়ের বাইরে তাদের একটি অভিন্ন পরিচয় হলো তারা সবাই আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির যুগে বেড়ে ওঠা এক নতুন প্রজন্ম, যাদের জীবনবোধ, চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন।


উচ্চশিক্ষা ও হতাশার প্রতিচ্ছবি:-


মারিশ্যা এলাকার শিক্ষিত তরুণ ইসফাত হাসান (২১), যিনি বাঘাইছড়ি ডিগ্রি কলেজ এ ইন্টার সম্পন্ন করেছে। 

তার বক্তব্য - আমরা যারা কলেজ শেষ করলাম, তাদের প্রথম দাবি হলো কর্মসংস্থান। সাজেকের মতো পর্যটন কেন্দ্র থেকেও স্থানীয় যুবকদের কাজের সুযোগ সীমিত। ভোটের সময় প্রার্থীরা রাস্তাঘাটের উন্নয়নের কথা বলেন, কিন্তু আমাদের পেটের খবর কেউ রাখে না। আমার ভোট সেই প্রার্থীর জন্য, যিনি এখানে একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেবেন, যাতে আমরা শুধু চাকুরির পেছনে না ছুটে স্বাবলম্বী হতে পারি।



 উন্নয়নের গতি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন:- 


বঙ্গলতলী ইউনিয়ন এর শিক্ষিত তরুণ মিশন চাকমা (২০), যিনি বাঘাইছড়ি ডিগ্রি কলেজ এ দ্বাদশ শ্রেণীতে অধ্যায়নরত। তার কাছে অবকাঠামো ও নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, দেখুন- সাজেক যাওয়ার রাস্তাটা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের ভেতরের রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব খারাপ। বিশেষ করে বর্ষাকালে অধিকাংশ এলাকার মানুষজন উপজেলা সদরে সহজে পৌঁছাতে পারে না। এর চেয়েও বড় কথা হলো, নিরাপত্তা। মাঝেমধ্যে পাহাড়ে যে সংঘাত বা উত্তেজনার খবর আসে, তাতে আমাদের সবার মনে একটা ভয় থাকে। আমরা চাই এমন একজন জনপ্রতিনিধি, যিনি শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সকল জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে পারবেন। আমার ভোট শান্তির পক্ষে।


 আকাঙ্ক্ষার বিশ্লেষণ: যুব ভোট ব্যাংক কোন পথে?


বাঘাইছড়ির যুব ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা মূলত চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি, অবকাঠামো ও ডিজিটাল সংযোগ, এবং পরিবেশ সুরক্ষা।


বাঘাইছড়ির অর্থনীতি মূলত কৃষি এবং ধীরে ধীরে পর্যটন নির্ভর হয়ে উঠছে। তবে কৃষিপণ্য পরিবহণ ও সংরক্ষণের সুবিধা অপ্রতুল। যুবকরা মনে করেন, শুধু সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। দরকার গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং ছোট-মাঝারি শিল্পের (SME) জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। 

প্রার্থীরা প্রায়শই কর্মসংস্থান নিয়ে বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও, স্থানীয় যুবকরা এখন বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা শুনতে চান। তারা বিশ্বাস করেন, এলাকার জনপ্রতিনিধি শুধু বাজেট বরাদ্দ নয়, বরং স্থানীয় সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারেন।


সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার প্রত্যাশা:-


পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম সংবেদনশীল এলাকা হওয়ায়, এখানকার যুবকদের মনে শান্তি ও সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত প্রবল। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর তরুণরা একসাথে স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেন, কিন্তু রাজনৈতিক বা ভূমি সংক্রান্ত সংঘাতের এবং চাঁদাবাজির কারণে তাদের দৈনন্দিন জীবনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। তাদের অধিকাংশই চায়, এমন একজন নেতা, যিনি জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার স্বার্থ দেখবেন এবং রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করবেন। তাদের মতে, "উন্নয়ন হবে তখনই, যখন পাহাড়ে শান্তি থাকবে।"


 'স্মার্ট বাঘাইছড়ি'র স্বপ্ন:-


সাজেক ভ্যালি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পেলেও বাঘাইছড়ির ভেতরের অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ, উন্নত সড়ক ও ইন্টারনেট সংযোগের অভাব রয়েছে। এই নতুন প্রজন্মের কাছে তথ্যপ্রযুক্তি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং শিক্ষা, ব্যবসা ও বিশ্বব্যাপী জ্ঞান অর্জনের দরজা। তারা মনে করে, প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করা গেলে, স্থানীয় তরুণ উদ্যোক্তারা অনলাইনে তাদের কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প এবং পর্যটন সেবা বিক্রি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারবে।



নারী ভোটারদের কণ্ঠস্বর:


যুব নারী ভোটারদের মধ্যে বিশেষ করে নিরাপত্তার পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন এবং স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে গভীর আগ্রহ রয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যের সুবিধা অপ্রতুল। 


বৈশাখী চাকমা (২১), যিনি মাচালং এর একজন স্থানীয় বাসিন্দা। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার সহজে পাওয়া যায় না। নারীদের জন্য বিশেষ কোনো স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেই চলে। পুরুষ প্রার্থীরা বড় প্রকল্পের কথা বললেও, নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ তেমন কথা বলেন না। আমার ভোট নারীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয় এমন প্রার্থীকে।


পরিবেশ সচেতনতা:

বাঘাইছড়ি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার। তবে নির্বিচারে গাছ কাটা, ঝুম চাষের কারণে বনের ক্ষতি এবং কাপ্তাই লেকের দূষণ এই এলাকার অন্যতম সমস্যা। পরিবেশ সচেতন যুব সমাজ মনে করে, জনপ্রতিনিধিকে অবশ্যই পরিবেশ রক্ষায় কঠোর হতে হবে। তারা চায়, স্থানীয় বনজ সম্পদ রক্ষা এবং ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব জীবিকা তৈরি হোক।


যুবশক্তির প্রতীক্ষা:

বাঘাইছড়ি উপজেলার যুব ভোটাররা বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তারা গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে এসে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করতে চাইছে। তাদের প্রত্যাশা কোনো বিচ্ছিন্ন দাবি নয়, বরং একটি টেকসই, শান্তিপূর্ণ এবং উন্নত বাঘাইছড়ি গড়ার সম্মিলিত স্বপ্ন।


এই যুব সমাজ আর আগের মতো শুধু আঞ্চলিক বা জাতিগত পরিচয়ে আবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। তারা উন্নয়ন, শান্তি, প্রযুক্তি এবং সম-অংশগ্রহণ চায়। তাদের ভোটদানের সিদ্ধান্ত এবার আবেগ বা প্রথাগত আনুগত্যের ভিত্তিতে না হয়ে, বরং প্রার্থীর যোগ্যতা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানের প্রতি তার আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করবে।


রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বুঝতে হবে, বাঘাইছড়ির যুব ভোট ব্যাংক একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। এই শক্তিকে উপেক্ষা করা হলে তা নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। যে প্রার্থী বা দল এই তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নকে ধারণ করতে পারবে, তাদের প্রত্যাশা পূরণে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে পারবে, বাঘাইছড়ির নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া তাদের জন্যই সহজ হবে। 


কাচালংয়ের তীরে নতুন প্রজন্মের এই অভিযাত্রা বাঘাইছড়ির রাজনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এমনটাই আশা করা যায়। তাদের একটি মাত্র প্রতীক্ষা- তাদের ভোট যেন তাদের স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি হয়।


Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.