তামাকের চাষে অভ্যস্ত চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠে এবার এক ভিন্ন দৃশ্য। সবুজ পাতার ফাঁকে টকটকে লাল ফলের সমারোহ স্ট্রবেরি। আর সেই লাল বিপ্লবের নায়ক মিনিবাজার এলাকার কৃষক মোহাম্মদ কাইছার (৪২)। তামাকের একচেটিয়া চাষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি দেখাচ্ছেন বিকল্প কৃষির সম্ভাবনা, দেখাচ্ছেন লাভের নতুন হিসাব।
বাড়ির অদূরে মাতামুহুরী নদীর চরে ২৫ শতক জমিতে গড়ে তোলা তাঁর স্ট্রবেরি খেত এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে প্রতিবছর জমির প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ তামাকে ভরে যায়, সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে ফেস্টিভ্যাল জাতের স্ট্রবেরি চাষ সত্যিই ব্যতিক্রম।
চলতি মৌসুমে রাজশাহীর একটি নার্সারি থেকে ৩ হাজার উন্নত জাতের ফেস্টিভ্যাল স্ট্রবেরির চারা সংগ্রহ করেন কাইছার। ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর রোপণ করা সেই চারা অল্প সময়ের মধ্যেই সাদা ফুলে ছেয়ে যায়। আর ২৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হয় ফল সংগ্রহ।
মাঠ প্রস্তুত, চারা ক্রয়, সার, গোবর ও পরিচর্যাসহ মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু খরচের অঙ্ক ইতোমধ্যে অনেকটাই পেরিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তিনি সাড়ে ৪ লাখ টাকার স্ট্রবেরি বিক্রি করেছেন। শীতের আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আরও অন্তত ১ থেকে দেড় লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন।
বর্তমানে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কেজি স্ট্রবেরি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব ফল চকরিয়া ও কক্সবাজার শহরের সুপার শপ, ফলের দোকান ও পাইকারদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে।
কৃষক কাইছার জানান, ২০০৭ সালে প্রথম স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেন। কিন্তু সে সময় স্থানীয় বাজারে ফলটির পরিচিতি না থাকায় এবং ক্রেতা সংকটের কারণে দুই বছর পর চাষ বন্ধ করতে বাধ্য হন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালে আবার নতুনভাবে শুরু করেন। এবারের মৌসুমে নতুন জাতের ফেস্টিভ্যাল স্ট্রবেরি এনে চাষে নামেন। তিনি বলেন, স্ট্রবেরি মূলত শীতকালীন বিদেশি ফল। প্রথমে পাওয়ার টিলার দিয়ে মাটি ঝরঝরে করতে হয়। এরপর মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে হয়, যাতে আগাছা কম হয় ও ফল পরিষ্কার থাকে। নিয়মিত সেচ ও পরিচর্যা করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।
মাতামুহুরী নদীর উজান থেকে বর্ষায় নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চরে পলি পড়ে জমিকে উর্বর করে তোলে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই পলিমাটিই ভালো ফলনের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থার প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছেন কাইছার। ক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়, জাল দিয়ে ঘেরা মাঠে মালচিং পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে স্ট্রবেরি। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে লাল ফল। কোথাও পাকতে শুরু করেছে, কোথাও সদ্য লাল হয়েছে। কাইছার নিজে শ্রমিকদের সঙ্গে ক্ষেতে নেমে পরিচর্যা করছেন, ফল সংগ্রহ করছেন।
উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কাইছারের খেতে ফলন ভালো হওয়ায় অন্য কৃষকেরাও আগ্রহী হচ্ছেন। তামাকের বিকল্প হিসেবে স্ট্রবেরি লাভজনক ফসল হতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক তাঁর ক্ষেত পরিদর্শন করেছেন এবং পরামর্শ নিচ্ছেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাক চাষে যেমন স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি বাজার নির্ভরতার কারণে লাভ-লোকসানও অনিশ্চিত। সেখানে স্ট্রবেরির মতো উচ্চমূল্যের ফল চাষ কৃষকের আয় বাড়াতে পারে।
কৃষক কাইছারের চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। তিনি বলেন, এবার যদি আবহাওয়া ভালো থাকে, তাহলে খরচ বাদ দিয়েও উল্লেখযোগ্য লাভ হবে। ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করতে চাই।
তামাকের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মাঠে তাই এবার লাল ফলের সুবাস। চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নে কৃষক কাইছারের এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি বিকল্প কৃষির এক সাহসী বার্তা, যা বদলে দিতে পারে পুরো এলাকার কৃষির মানচিত্র।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
