× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

স্মৃতি হারিয়ে নির্বাক সাংবাদিক তুষার, সীমান্তের ওপারে কি পৌঁছাবে এই আর্তনাদ

নওগাঁ প্রতিনিধি

০৮ মার্চ ২০২৬, ১৩:১৪ পিএম

সত্যের সন্ধানে যার কলম ছিল সদা জাগ্রত, যার প্রতিটি প্রতিবেদন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক একটি প্রতিবাদ—সেই সাহসী ও সৎ সাংবাদিক মির্জা তুষার আহমেদ আজ নির্বাক, নিথর। তিনি শুধু একজন ধারালো কলম সৈনিকই ছিলেন না, টেলিভিশনের পর্দায় তার বলিষ্ঠ উপস্থিতি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক একটি সোচ্চার কণ্ঠস্বর। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন মানবিক মানুষ; তার করা মানবিক প্রতিবেদনের ফলে অসংখ্য অসহায় মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছে, পেয়েছে খাবার ও সুচিকিৎসা। কিন্তু অন্যকে আলোর পথ দেখানো সেই মানুষটিই আজ হারিয়ে গেছেন এক গভীর অন্ধকারে।

নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার মজিবর রহমানের ছোট ছেলে মির্জা তুষার আহমেদ। এক ভাই ও এক বোনের সংসারে তুষার ছিলেন বাবা-মায়ের নয়নের মণি। গত ১৩ই ডিসেম্বর, শনিবার সন্ধ্যার সেই অভিশপ্ত মুহূর্তটি তুষারের জীবনে এক নিভৃত অন্ধকার নামিয়ে আনে। তীব্র মানসিক চাপের মুখে হঠাৎ সংজ্ঞাহীন হয়ে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এরপর নওগাঁ সদর হাসপাতাল থেকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ এবং পরবর্তীতে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে টানা ২০ দিনের জীবনযুদ্ধ শেষে আজ তিনি ঘরবন্দী এক অজানা জগতে।

তুষারের এই করুণ পরিণতির মূলে রয়েছে এক গভীর মানবিক বিপর্যয়। তার বড় বোন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানিয়েছেন, তুষারের ব্যবহৃত ফোনের নোটপ্যাডে ‘প্রিয় অচেনা দেশ’ সম্বোধন করে হৃদয়ের গভীর থেকে লেখা অসংখ্য দীর্ঘশ্বাস জমা হয়ে আছে। সেখান থেকে এটি স্পষ্ট যে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের এক তরুণীর প্রতি তার একনিষ্ঠ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তাকে আজ এই খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।

নোটপ্যাডের পাতায় তুষার সেই মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন—"তোমাকে না পেলে আমি সারা জীবন একাই থেকে যাব, কখনো অন্য কাউকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করব না।" ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে তিনি আরও লিখেছেন—"আমার ভালোবাসা কতটা গভীর তা দেখতে যদি তুমি আমার জীবন চাও, তবে দ্বিতীয়বার না ভেবে আমি নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করব না।" একই সাথে তুষার তার লেখনীর মাধ্যমে বারবার একটি করুণ অনুরোধ করেছেন; তিনি চেয়েছেন তার এই ভালোবাসার কথা যেন কখনো লোকচক্ষুর সামনে না আসে এবং তার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে যেন মানুষের মাঝে কোনো আলোচনা না হয়। তুষারের কাছে তার এই প্রেম ছিল একান্তই ব্যক্তিগত এবং পবিত্র।

তুষারের বড় বোন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, "আমার ভাইয়ের এই ভালোবাসার কথাগুলো আমি কখনো মিডিয়ার সামনে আনতে চাইনি। ভাই বারবার অনুরোধ করে লিখে গেছেন যেন তার এই ব্যক্তিগত আবেগ ও প্রিয় মানুষের কথা কেউ জানতে না পারে। সে কখনো চাইনি তার প্রিয় মানুষকে নিয়ে কেউ কোনো নেতিবাচক কথা বলুক কিংবা তাকে কেউ দোষারোপ করুক। ভাইয়ের সেই শেষ ইচ্ছা আর তার ভালোবাসার মানুষের প্রতি এই অগাধ সম্মানবোধকে আমি সবসময় শ্রদ্ধা জানিয়েছি। কিন্তু আজ ভাইয়ের এই নিথর ও করুণ অবস্থা দেখে স্থির থাকতে পারলাম না; বাধ্য হয়েই আপনাদের কাছে সবটুকু তুলে ধরলাম। শুধু একটাই চাওয়া—একজন মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার যেন এভাবে অপমৃত্যু না হয়।" তুষারের পরিবার কেবল এটাই চায়—সীমান্তের ওপার থেকে সেই মানুষটি যেন মানবিকতার টানে একবার এগিয়ে আসেন, যার একটি কথা হয়তো তুষারের এই নিথর জীবনে প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে দিতে পারে।

চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, এটি সাধারণ কোনো অসুস্থতা নয়, বরং ‘ইমোশনাল ট্রমা’ থেকে সৃষ্ট স্মৃতিভ্রংশ। তুষার আজ কাউকে চিনতে পারছেন না, পারছেন না পুরোনো কোনো কথা মনে করতে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, তুষারের সুস্থ হওয়ার পথ এখন আর কেবল ওষুধের ওপর নির্ভর করছে না। তারা জানিয়েছেন, যার কারণে এই মানসিক বিপর্যয়, সেই ভারতীয় তরুণীর উপস্থিতি বা তার সাথে কথা বলাটাই হতে পারে তুষারের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার একমাত্র ‘মিরাকেল’ বা অলৌকিক পথ। এছাড়া তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব বললেই চলে।

পরিবারের অবস্থা এখন বর্ণনাতীত। তুষারের মা আজ শয্যাশায়ী, সন্তানের এই অবস্থা দেখে তার নিজের জীবনও সংকটাপন্ন। বাবা মজিবর রহমান ছেলের শিয়রে বসে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। একজন সৎ ও মানবিক সাংবাদিক হিসেবে তুষার সমাজের জন্য অনেক লড়াই করেছেন, অনেকের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন; কিন্তু নিজের হৃদয়ের এই লড়াইয়ে তিনি আজ বড় একা ও পরাজিত। একজন মেধাবী কলম সৈনিকের এই করুণ দশা দেখে পুরো সাংবাদিক সমাজ আজ স্তব্ধ। এখন কি মানবিকতার কোনো পথ খুলে যাবে? সীমান্তের ওপার থেকে কি আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত সাড়া, যা তুষারের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিকে আবার জাগিয়ে তুলবে? পরিবার ও সহকর্মীরা এখন কেবল এক অলৌকিক ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।


Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.