মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সংরক্ষণসহ নানা অনিয়মের দায়ে ‘ডাইনিং ডিলাইট’সহ তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে এ অভিযানের সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝেড়েছেন ডাইনিং ডিলাইট রেস্টুরেন্টের মালিক ফজলে আবিদ খান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি সাংবাদিকদের ‘দালাল’ ও ‘হলুদ সাংবাদিক’ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন কটূক্তি করায় বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, গত ১১ মার্চ সকালে কুলাউড়া পৌর শহরে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবিদ হোসেন। অভিযানে সহযোগিতা করেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য অফিসার (অ.দা.) মো. শাকিব হোসাইন, উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নুপুর চন্দ্র ধরসহ র্যাব ও পুলিশের একটি দল।
অভিযানে ডাইনিং ডিলাইট রেস্টুরেন্টে কাচ্চিতে রঙ ব্যবহার, সিংকে গোশত ধোয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ বান সংরক্ষণ, পোড়া তেল ব্যবহার, বাসি খাবার ফ্রিজে রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার একসঙ্গে সংরক্ষণ, রেস্টুরেন্ট লাইসেন্স না থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত এবং কর্মীদের নির্ধারিত পোশাক না থাকার মতো একাধিক অনিয়ম ধরা পড়ে। এসব অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়াও আরও দুটি প্রতিষ্ঠানকে ৭০ হাজার টাকাসহ মোট ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযান শেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জেলা কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের ইমেইলে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। এতে অভিযানে ধরা পড়া অনিয়ম ও জরিমানার বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয় এবং অভিযানের বেশি কয়েকটি ছবিও পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদ প্রকাশের পর ডাইনিং ডিলাইটের মালিক ফজলে আবিদ খান প্রবাস থেকে ফেসবুক লাইভে এসে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে ‘দালাল’ ও ‘ভুয়া’ বলে আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন কটূক্তি করেন।
বাসি খাবার ও রঙ ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি লাইভে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, এসব প্রমাণ করতে পারলে জরিমানার তিন গুণ টাকা দেবেন। অথচ সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অভিযানে এসব অনিয়ম হাতেনাতে ধরা পড়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. শাকিব হোসাইন বলেন, অভিযানের সময় উল্লিখিত অনিয়মগুলো প্রমাণিত হওয়ায় এবং রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের কাছে জরিমানা করার সকল প্রমাণ রয়েছে।
এদিকে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের ‘দালাল’ ও ‘হলুদ সাংবাদিক’ বলায় স্থানীয় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। কুলাউড়া প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুশীল সেনগুপ্ত বলেন, পেশাদার সাংবাদিকরা সবসময় তথ্য যাচাই করেই সংবাদ পরিবেশন করেন। সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে করা সংবাদকে ‘দালালি’ বলা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এমন অশালীন আচরণ কাম্য নয়।
বর্তমান সভাপতি এম শাকিল রশীদ চৌধুরী বলেন, অভিযানে অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেট জরিমানা করেছেন। এখানে সাংবাদিকদের দোষ কোথায়? নিজের অপরাধ ঢাকতে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। সাধারণ সম্পাদক খালেদ পারভেজ বখস বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরাসরি অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। সেই বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে সাংবাদিকদের কোনো দোষ নেই।
প্রেসক্লাব কুলাউড়ার সভাপতি আজিজুল ইসলাম বলেন, অপরাধ করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে অযাচিত বক্তব্য ও হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার উচিত ছিলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইনের আশ্রয় নেওয়া। সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আবু সাইদ ফুয়াদ বলেন, প্রেস বিজ্ঞপ্তির তথ্যের বাইরে কোনো শব্দ বা মন্তব্য সংবাদে ব্যবহার করা হয়নি। অনিয়ম করার পরও সাংবাদিকদের ‘হলুদ’ বা ‘দালাল’ বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
টিম জার্নালিস্টের উপদেষ্টা মোক্তাদির হোসেন বলেন, সরকারি অভিযানের সুস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের প্রতি যে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন সচেতন ব্যবসায়ীর উচিত ছিলো প্রতিষ্ঠানের ত্রুটি সংশোধন করা।
উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মছব্বির আলী বলেন, সাংবাদিকরা কোনো সংবাদে ব্যক্তিগত মতামত লেখেন না। কোনো ঘটনা যেমন ঘটে, ঠিক তেমনভাবেই তা উপস্থাপন করা হয়। ১১ মার্চের ঘটনাও অধিদপ্তরের প্রেস বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতেই প্রকাশিত হয়েছে। তাই এমন মন্তব্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। সাধারণ সম্পাদক নাজমুল বারী সোহেল বলেন, আমরা সবসময় প্রমাণ ও তথ্যের ভিত্তিতেই সংবাদ প্রকাশ করি। এরপরও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।
কুলাউড়া সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাজমুল ইসলাম বলেন, ওই রেস্টুরেন্টের মালিক আগেও এমন আচরণ করেছেন। এবারও তিনি একই কাজ করেছেন। অবিলম্বে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। সাধারণ সম্পাদক সাইদুল হাসান সিপন বলেন, এ ধরনের বক্তব্য সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। দ্রুত বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা না চাইলে সাংবাদিক সমাজ কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।
এ বিষয়ে জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর দীপংকর ব্রহ্মচারী বলেন, খাবারে রঙ ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে ক্যান্সারসহ নানা রোগের ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া অপরিষ্কার পরিবেশে খাবার সংরক্ষণ করলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা ডায়রিয়া ও টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, মোবাইল কোর্ট স্বাধীনভাবে কাজ করে। কেউ অসন্তুষ্ট হলে আইনি প্রক্রিয়ায় আপিল করতে পারে, প্রয়োজনে হাইকোর্টেও যেতে পারে। ফেসবুকে অপপ্রচার চালিয়ে কোনো লাভ নেই। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
