একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি গৃহস্থের ঘরে অপরিহার্য একটি পাত্র ছিল মাটির তৈরি মটকা বা মটকি। খাদ্যদ্রব্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত এই পাত্রের ব্যাপক প্রচলন ছিল সর্বত্র। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এক থেকে দুইটি মটকি থাকা ছিল স্বাভাবিক বিষয়। তবে কালের বিবর্তনে আজ সেই মটকি আর তেমন দেখা যায় না। ফলে নতুন প্রজন্মও এর ব্যবহার ও গুরুত্ব সম্পর্কে অনেকটাই অজ্ঞ হয়ে পড়ছে।
মাটির তৈরি এই বৃহৎ আকৃতির পাত্র দেখতে অনেকটা কলসের মতো। সাধারণত চাল, ডাল, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন শস্য সংরক্ষণে এটি ব্যবহৃত হতো। মটকিতে রাখা খাদ্যশস্য দীর্ঘদিন ভালো থাকত, সহজে পোকামাকড় ধরত না এবং স্বাদ ও গন্ধ অটুট থাকত। এছাড়া প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি হওয়ায় এতে কোনো ক্ষতিকারক উপাদান মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল না।
সরেজমিনে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ৬ নম্বর ভাঙ্গা খাঁ ইউনিয়নের রাধাপুর গ্রামে কুমার বাড়িতে গিয়ে ৮০ বছর বয়সী কারিগর সন্তোষ কুমারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মটকা তৈরির প্রক্রিয়া ছিল সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। প্রথমে ধানী জমি বা নদীর পাড় থেকে নরম এঁটেল দোআঁশ মাটি সংগ্রহ করা হতো। সেই মাটি ভালোভাবে মথে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হতো। এরপর ধাপে ধাপে মাটির স্তর বসিয়ে মটকার তলা তৈরি করা হয় এবং ক্রমান্বয়ে এর দেয়াল ও গলার অংশ গড়ে তোলা হয়। বড় আকৃতির কারণে চাকার ওপর নয়, হাতে তৈরি করা হতো এই মটকা। পরে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে এতে গ্রামবাংলার নান্দনিক দৃশ্য বা মাঙ্গলিক চিহ্ন অঙ্কন করা হতো।
একসময় কৃষিপণ্য সংরক্ষণে বায়ুরোধী হিসেবে মটকার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বছরে একবার ধান থেকে চাল তৈরি করে সারা বছরের জন্য সংরক্ষণে এটি ব্যবহৃত হতো। এতে শস্যে পোকামাকড়ের আক্রমণ হতো না এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যেত। নব্বইয়ের দশকেও গ্রামাঞ্চলের গৃহস্থ বাড়িতে বড় বড় মটকা ও গোলা দেখা যেত।
তবে বর্তমানে কৃষি উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বসতবাড়ির কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে মটকার ব্যবহার কমে গেছে। এখন গ্রামেও ইটের তৈরি বাড়িঘর বেড়েছে এবং খাদ্যশস্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে টিন বা প্লাস্টিকের ড্রাম। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই মাটির পাত্রের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ১৩ নম্বর দিঘলী ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক রাশেদ উদ্দিন আহমেদ (মামুন) বলেন, “একসময় দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে খাদ্যশস্য সংরক্ষণে মাটির মটকার ব্যাপক প্রচলন ছিল। আমাদের বাড়িতেও বহু মটকা ব্যবহৃত হতো। আমার মায়ের ব্যবহৃত একটি মটকার বয়স প্রায় ৫০ বছরের বেশি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন এসব ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে।”
সময়ের পরিবর্তনে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটলেও হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ সংস্কৃতির এই মূল্যবান ঐতিহ্য। পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া সত্ত্বেও মাটির মটকা আজ শুধুই অতীতের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।