ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে এখন এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম—সর্বত্রই এক সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে এই অপসংস্কৃতি। স্থানীয় এক শ্রেণির প্রভাবশালী মহল ও ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রকদের’ ছত্রছায়ায় এসব কিশোর হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে ছিনতাই, ধর্ষণ ও খুনের মতো নৃশংস অপরাধ এখন তাদের নিত্য নৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়েছে।
যদিও প্রশাসনের দাবি, জেলায় সুনির্দিষ্ট কোনো ‘গ্যাং কালচার’ নেই, তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রশাসনের এই দাবি ও বাস্তবতার বৈপরীত্যে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে ঝিনাইদহে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে একের পর এক লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাণ যাচ্ছে শিক্ষার্থী ও যুবকদের।
২০১৯ সালের এপ্রিলে শৈলকুপায় কেরাম খেলা ও প্রেমঘটিত তুচ্ছ বিরোধের জেরে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র জুয়েল শেখকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে সাদেকপুর বিলে কুপিয়ে হত্যা করে কিশোর গ্যাং সদস্য রাতুল ও সাগর। একই বছরের নভেম্বরে কালিকাপুরে অভ্যন্তরীণ বিবাদের জেরে নৃশংস ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় এসএসসি পরীক্ষার্থী সাইদুজ্জামান সিফাত।
২০২০ সালের মার্চে কালীগঞ্জের বলরামপুরে ছিনতাইয়ের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে নবম শ্রেণির ছাত্র নাঈমকে কুপিয়ে হত্যা করে তারই তথাকথিত বন্ধু জহুরুল। একই বছরের জুলাই মাসে কাঞ্চননগর এলাকায় স্কুলছাত্র লিখনকে অপহরণ করে পাশবিক নির্যাতন চালায় ‘অন্তর-শিহাব’ গ্যাং। তারা নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে মুক্তিপণ দাবি করে পুরো জেলায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।
২০২২ সালের মার্চে মান্দারবাড়িয়া গ্রামে ওয়াজ মাহফিলে সামান্য ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে হুসাইন নামে এক যুবককে প্রকাশ্য দিবালোকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে ১০-১৫ জন কিশোর গ্যাং সদস্য। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ মে ব্যাপারীপাড়ায় আম খাওয়ার সময় সামান্য তর্কে জীবন নামে এক যুবককে বুকের দুই পাশে ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয়।
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির প্রমাণ মেলে নারী ও শিশুদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতনে। ২০১৯ সালের ১২ আগস্ট খাজুরা গ্রামে সপ্তম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে অপহরণ করে আমবাগানে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল পুরো জেলা। ২০২৪ সালের মার্চে তারাবির নামাজে যাওয়ার পথে ধূমপানের প্রতিবাদ করায় রাফসান নামে এক স্কুলছাত্রকে হাতুড়িপেটা করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এই ভয়াবহতা আরও বেড়েছে।
চলতি বছরের ২৬ মার্চ মহেশপুরে প্রেমিককে আটকে রেখে এক তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং সর্বশেষ ৭ এপ্রিল কালিকাপুরে এক নারীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণের পৈশাচিক ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছে শাওন, মাহি ও সজীব নামের তিন বখাটে। এছাড়া ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শৈলকুপায় ২ হাজার ৪০ পিস ইয়াবাসহ কিশোর অপরাধী অন্তর মন্ডলের গ্রেফতার হওয়া প্রমাণ করে এরা মাদক সাম্রাজ্যের কতটা গভীরে।
অভিযোগ রয়েছে, এলাকায় নিজেদের আধিপত্য সুসংহত রাখতে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী এক শ্রেণির নেপথ্য কুশীলব এসব কিশোরকে ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করছে। বিনিময়ে তাদের দেওয়া হচ্ছে মাদক ও উশৃঙ্খল জীবনের রসদ। এছাড়া ‘টিকটক’ ও ‘লাইকি’র মতো অ্যাপে ‘হিরোইজম’ দেখানোর নেশা কিশোরদের অপরাধের পথে ঠেলে দিচ্ছে। পর্যাপ্ত খেলার মাঠের অভাব এবং স্মার্টফোনে লাগামহীন আসক্তি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
স্থানীয়রা জানান, ইয়াবা সরবরাহ, মাদক সেবন, ইভটিজিং থেকে শুরু করে ছিনতাই ও খুনের মতো এমন কোনো অপরাধ নেই যা এই গ্যাংয়ের সদস্যরা করছে না। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এরা যেকোনো মানুষের ওপর হায়েনার মতো চড়াও হয়। শুধু সাধারণ মানুষই নয়, এদের বেপরোয়া আচরণ ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এলাকার সম্মানিত ব্যক্তি ও বয়োজ্যেষ্ঠরা পর্যন্ত লাঞ্ছনা ও অপমানের শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়মতো এদের দমানো না গেলে এরা ভবিষ্যতে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, "কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মূলত ১৮ বছরের কম বয়সী হলেও তাদের প্রধানরা ‘ডন’ স্টাইলে এলাকায় মাস্তানি করে।
ঝিনাইদহ র্যাব-৬, সিপিসি-২ এর কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার মোঃ ইমামীম মুবীন সরকার সুমন সংবাদ সারাবেলা কে জানান, কিশোর গ্যাংয়ের সুনির্দিষ্ট তালিকা না থাকলেও অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে টহল জোরদার এবং নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এ প্রসঙ্গে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন, "তালিকাভুক্ত কিশোর গ্যাংয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে সন্দেহভাজনদের তল্লাশি চালানো হয়। অনেক সময় ১৮ বছরের কম বয়সীরা আকস্মিকভাবে তর্কের জেরে খুনের ঘটনা ঘটায়। আমরা দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত করি, ফলে গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার সুযোগ কম থাকে।"
তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন গ্যাং কালচার না থাকলে একের পর এক সংঘবদ্ধ অপরাধ ঘটছে কীভাবে? তাদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযানে এই ‘সামাজিক ক্যানসার’ নির্মূল সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পর্দার আড়ালের প্রশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় আনা এবং পারিবারিক পর্যায়ে কঠোর নজরদারি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
