ছবি: সংবাদ সারাবেলা।
ছোট ফেনী নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চারটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মানুষের শতশত ঘরবাড়ি, ফসলি জমিসহ বিস্তৃর্ণ জনপদ। তীল তীল করে গড়ে তোলা মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ।
ভুক্তভোগীরা বলেন, নদীভাঙনের কারণে চর দরবেশ ও চর চান্দিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকার শত শত একর ফসলি জমি, ঘরবাড়ি ও বিভিন্নস্থাপনা ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আরও অনেক জমি ও ঘর বাড়ি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। তারা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ অন্তত ৪০০ মিটার এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ এবং ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর বাঁকা অংশ সোজা করার দাবি জানান। তা না হলে পুরো চর চান্দিয়া ইউনিয়ন ও চর দরবেশ ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
ইতালি মাকের্ট এলাকার বাসিন্দা সাহেদা খাতুন বলেন, আমার স্বামী নেই। একটি মেয়ে নিয়ে এই ভিটাতেই কোনোমতে দিন কাটাচ্ছি। যদি এই বাড়িটাও নদীতে চলে যায়, তাহলে কোথায় যাব, কোথায় থাকব? মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে হারিয়ে যেতে বসেছে। ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
পশ্চিম চর দরবেশ গ্রামের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, হঠাৎ করে ভাঙনের শিকার হয়ে তিনি আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তাকে অনেক দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। কিন্তু এখানে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাই মাত্র দুমাসের মধ্যে কয়েকশ মানুষ গৃহহারা হয়েছেন। চোখের সামনে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা কিছুই করতে পারছেন না। তাঁদের দেখার যেন কেউ নেই।
উত্তর চর সাহাভিকারী গ্রামের বাসিন্দা আমান উল্যাহ বলেন, গ্রামের পশ্চিম পাশ দিয়ে ছোট ফেনী নদী চলে গেছে। বন্যার পর থেকে নদীতে প্রবল স্রোত বইছে। প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে। জোয়ার ভাটার সময় বাড়ি ও জমির পাড় ভেঙে নদীতে আছড়ে পড়ছে। গত ১০বছর আগে তাঁর বাড়ি নদীগর্ভে চলে যায়। এখন অন্যের জমিতে থাকেন। এ গ্রামেও ভাঙন হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত গ্রামের চার ভাগের দুই ভাগ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে যেভাবে ভাঙন চলছে, তাতে কোনো ব্যবস্থা না নিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বহু ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কাজীরহাট এলাকার বাসিন্দা ছকিনা বেগম বলেন, চোখের সামনে বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাঁদের আহজারিতে ভারি হয়ে উঠছে আশপাশের আকাশ-বাতাস। কিভাবে কি করবেন কোন কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। সহায়-সম্বল হারিয়ে কোথায় গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করবেন তা নিয়ে সবার চোখে মুখে শুধু চিন্তার ছাপ।
উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, তাঁর ইউনিয়নের কয়েকশ পরিবারের সবাই এখন নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত। তাঁর ৪০-৫০জন নিকট আত্মীয় গত দুই-তিন সপ্তাহে নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। তাঁরা সব হারিয়ে এখন অন্যের বাড়ি,সড়কের পাশে ও বস্তিতে বসবাস করেন। এমন বহু পরিবার এখন সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। এত মানুষ সব হারানোর পরও ভাঙনরোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাঁরা এলাকাবাসীর উদ্যোগে বালুভর্তি বস্তা ও বাঁশ-গাছ কেটে নদীতে বাঁধ দিয়ে নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুইতে তা ঠিকছে না। দ্রুত স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে তাঁরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদেরকে জানিয়ে তাঁদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
প্রসঙ্গত; ২০২৪সালে আগষ্টের ভয়াবহ বন্যায় নোয়াখালীর মুছাপুর রেগুলেটর নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পর থেকে ছোট ফেনী নদীর কোম্পানীগঞ্জ ও সোনাগাজীর অংশে দুই তীরে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে ভাঙনে ফসলি জমি, ফলের বাগান, রাস্তা-ঘাট ও কয়েকশ বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনের কারণে হুমকিতে রয়েছে আরও চারটি আশ্রয়কেন্দ্র ও আশপাশের হাজারো পরিবার। নদীভাঙন ঠেকাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিস্তৃর্ণ জনপদসহ আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন গ্রামবাসী। নোয়াখালী ও ফেনীর সীমান্তবর্তী মুছাপুর এলাকায় রেগুলেটর না থাকায় সমুদ্রের জোয়ারের পানি নির্বিঘ্নে প্রবেশ করায় ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চর চান্দিয়া, চর দরবেশ, বগাদানা ও চর মজলিশপুর ইউনিয়নের ছোট ফেনী নদীর তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে নদী ভাঙনের কারনে বেশ কয়েকটি রাস্তা ও ছোট ছোট কালভার্ট ও সেতুও ভেঙে নদীতে চলে গেছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম চর দরবেশ, কাজীরহাট স্লুইসগেট, আশ্রয়কেন্দ্র, আউরারখিল,দাসপাড়া, কাটাখিলা, কুঠিরহাট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা এতই বেশি যে রাতে-দিনে সমান তালে বাড়িঘর ও ফসলি জমিসহ বিভিন্নস্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভাঙনরোধে প্রশাসন এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এখন ভাঙন গ্রামগুলোর ঘনবসতির দিকে যাচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
