× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

তেত্রিশ একর বিশাল উদ্যানে হরিণ বিচরণের জন্য বরাদ্দ মাত্র এক একর !

জায়গা স্বল্পতার কারনে হরিণ বিক্রির সিদ্ধান্ত রাসিক কর্তৃপক্ষের!

রাজশাহী ব্যুরো :

১৯ মে ২০২৬, ১৮:৪০ পিএম

ছবি: সংবাদ সারাবেলা।

হরিণ বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) পরিচালিত কেন্দ্রীয় উদ্যান ও বোটানিক্যাল গার্ডেন কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, বর্তমানে উদ্যানের নির্দিষ্ট জায়গাটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হরিণ রয়েছে। বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি হরিণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গার প্রয়োজন হলেও সেই মান বজায় রাখতে পারছেনা বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। ফলে অতিরিক্ত হরিণগুলোকে নির্ধারিত মূল্য ও শর্তসাপেক্ষে হস্তান্তর বা বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে রাসিক কর্তৃপক্ষ। যার প্রতিটির বিক্রয়মূল্য দরা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।

উদ্যানের পুরো আয়তন ও রাসিকের সক্ষতা বিবেচনায় রেখে নগরীর সচেতন মহল হরিণ বিক্রির বিষয়টি মেনে নিতে পারছেননা। মন্তব্য করতে গিয়ে তাঁরা বলেন, ১৯৮৫ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ চিড়িয়াখানার পরিচিতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা রাজশাহী জেলার সর্বোচ্চ আকর্ষণীয় এই বিনোদন কেন্দ্রটি একসময় ছিল দর্শনার্থীদের প্রাণের বিনোদন কেন্দ্র। রাজশাহী শহরের বাসিন্দারাই শুধু নন; জেলা ও বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলের দর্শনার্থীরা আসতেন চিড়িয়াখানাটি একনজর দেখার জন্য। পশু-পাখি আর অন্যান্য জীব-জন্তুতে একসময় প্রায় পরিপূর্ণ ছিল এই চিড়িয়াখানাটি। কালের বিবর্তনে সেটির নামের পরিবর্তন ঘটে হয়েছে ‘কেন্দ্রীয় উদ্যান ও বোটানিক্যাল গার্ডেন’। ঠিক তেমনি ভাবে দিনদিন পশু পাখি আর জীবজন্তু গাণিতিক হারে কমে পাওয়া আথ সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারণে দর্শনার্থীদের কাছে সেটির জৌলুসও আজ প্রায় শূণ্যে কোটায়। বন-বৈচিত্র আর প্রকৃতির নজরকারা সৌন্দর্যে পশু-পাখি দেখার সুযোগ আর নেই আগের মতো। কালের বিবর্তন আর অব্যবস্থাপনার কারণে অনেককিছু আজ বিলুপ্ত হলেও; দেখারমতো ছিল শুধু মায়াবী হরিণ বিচরণের সেই অভয়ারণ্যটি। আজ সুনির্দিষ্ট একটি কারণে ১২৯ টির মতো বিশাল একটি হরিণের বহর হ্রাস পেয়ে নেমে আসতে পারে প্রায় অর্ধেকে বলে জানায় সূত্র।

জানতে চাইলে রাসিকের ভেটেরিনারি সার্জন ড. ফরহাদ উদ্দিন বলেন, বর্তমানে উদ্যানে প্রায় ৪০ হাজার বর্গফুট জায়গায় হরিণের জন্য সেড রয়েছে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে সর্বোচ্চ ৮০-৮৫টি হরিণ রাখা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে ১২৯টি হরিণ থাকার জন্য নির্ধারিত জায়গাটি অপর্যাপ্ত হবার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই বাড়তি হরিণগুলো নির্ধারিত ৫০ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দেশের যেসকল চিড়িয়াখানা বা সমজাতীয় স্থানে অতিরিক্ত হরিণ থাকে সেখানেও অতিরিক্ত হরিণগুলো বন বিভাগের নিয়ম ও শর্ত মেনে যথাযথ নিয়মেই বিক্রি করা হয়। এটা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তিনি আরো বলেন, রাসিকের প্রকৌশল বিভাগ নতুন করে একটি ডিজাইন তৈরি করছে। বেশকয়েকটি বড় বড় খাঁচা তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট পশু পাখি রাখার জন্য। ৩৩ বিঘা আয়তনের বিশাল এই উদ্যানে হরিণের আবাসস্থলটির আয়তন আরো একটু বড় করে হরিণ বিক্রির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ত্রিশ একর না, নভোথিয়েটারের জন্য তিন একর জমি বাদ দিলে এখন চিড়িয়াখানার (বোটানিক্যাল গার্ডেন ও উদ্যান) জন্য বরাদ্দ আছে ৩০ একর জমি। পুরো চিড়িয়াখানাটির আয়তন স্কয়ার না, এটা একটু লম্বা প্রকৃতির হবার কারনে হরিণের আবাসস্থলের জন্য অতিরিক্ত জায়গা দেয়াটা একটু কঠিণ, তবে ত্রিশ-চল্লিশ ফিটের মতো জায়গা হরিণের জন্য বাড়ানো হতে পারে ! তিনি আরো বলেন, বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, হরিণ কেনার জন্য ক্রেতার অবশ্যই সুনির্দিষ্ট লাইসেন্স থাকতে হবে।লালন-পালন: শর্ত অনুযায়ী, হরিণগুলোকে কোনোভাবেই জবাই বা খাওয়া যাবে না। এগুলো কেবল ব্যক্তিগত খামার, রিসোর্ট বা উন্মুক্ত স্থানে লালন-পালনের উদ্দেশ্যেই কেনা যাবে।

হরিণ বিক্রির বিষয়টি অনেকটাই যৌতিকতা বিবর্জিত বলে মনে করছেন সচেতন ও পশু প্রেমিরা। তাঁরা বলেছেন, বিশাল আয়তনের এই উদ্যানে হরিণ রাখার জন্য জায়গা ও ব্যবস্থাপনার সংকটকে ঢাল করে হরিণের সংখ্যা কমানো অনেকটাই বেমানান।

জানতে চাইলে 'সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)'–এর রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি আহমদ সফি উদ্দিন বলেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন বা চিড়িয়াখানা মানেই হতে হবে প্রাণ-প্রকৃতির ছোয়াই আচ্ছাদিত। সেখানে থাকবে পশু পাখি সহ জীববৈচিত্রের ব্যাপক উপস্থিতি। প্রাণ-প্রকৃতি আর পশু পাখি দেখলে শিশু কিশোরদের মনজগত উর্বর হয়, তারা আনন্দ পায়। শিশুদের মনবৃত্তি পজিটিভ হয়। পশু পাখি আর প্রকৃতি নির্ভর বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হলে শিশু মনোবিজ্ঞানী, প্রাণিবিদ্যা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদসহ সশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে এইসকল সিদ্ধান্ত নিতে হয়। শুধু প্রকৌশলীদের দিয়ে অবকাঠামোগত পরিবর্তন আর নতুন নামকরনে কখনোই পরিপূর্ণ সফলতা আসবেনা। এইসকল স্থানে রিসোর্ট, নভোথিয়েটার, পাহাড় কেটে কংক্রিটের সিড়ি ও ক্যান্টিসহ অন্যান্য স্থাপনা তৈরি করাটা কাম্য না হলেও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে কংক্রিটের তৈরি স্থাপনার সংখ্যা। এই বিষয়গুলো পরিবেশ অপরাধের একটি অংশও বটে। পাহাড়টি আজ প্রায় ধ্বংসের পথে। চিড়িয়াখানা-বোটানিক্যাল গার্ডেন কিংবা উদ্যান নাম হলেও পশু-পাখি আর প্রকৃতির উপস্থিতি এখানে অপর্যাপ্ত। শিশু কিশোররা আজ মোবাইলসহ একাধিক ডিভাইসে আক্রান্ত। হরিণসহ অন্যান্য পশু পাখির দর্শনে তাদের মানসিক বিকাশ ঘটার পাশাপাশি মনজগতটা শান্ত প্রকৃতিতে পরিণত হয়। এভাবে দিন দিন পশুপাখি হ্রাস পেতে থাকলে একসময় এই চিড়িয়াখানাটি হারাবে তার পূর্বের জৌলুস। যদিওবা ইতোমধ্যেই সেটা হারিয়েছে। তিঁনি আরো বলেন, শুনেছি কর্তৃপক্ষ আবারো নাম পরিবর্তন করে এটাকে 'বার্ড পার্ক’ নামকরণ করবেন। যেখানে হরিণ লালন পালন সঠিকভাবে করাটা কঠিণ হয়ে যাচ্ছে, সেখানে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে 'বার্ড পার্ক’ গড়ে তোলার বিষয়টি অনেকবেশি চ্যালেঞ্জিং হবে। এছাড়াও বারবার নাম পরিবর্তন আর ক্যাটাগরি পরিবর্তনের জন্য একের পর এক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যে অর্থের অপচয় করেছে কর্তৃপক্ষ সেটাও কাম্য নয়।

গাণিতিক হিসেবানুযায়ী ১ একর সমান ৪৩,৫৬০ বর্গফুট। সেহিসেবে ৪০ হাজার বর্গফুট হলো শূণ্য দশমিক ৯২ একরের সমান। অর্থ্যাৎ পুরো চিড়িয়াখানা কাম উদ্যানের পরিসর বা পরিধির হিসেবানুযায়ী মাত্র তিনশতাংশ (তিনশ ভাগের একভাগ মাত্র) জায়গা বরাদ্দ ছিল মায়াবী, লাজুক আর দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ প্রিয় পশু হরিণগুলোর জন্য। সেই একভাগে বিচরণ করে ১২৯ টি হরিণ। বন বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি হরিণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা প্রয়োজন। সেই নিয়মে উক্ত এক একরের মতো জায়গায় স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করতে পারে সর্বোচ্চ ৮০ থেকে ৮৫ টি হরিণ। বন বিভাগের হরিণ ব্যবস্থাপনার নিয়মানুযায়ী উক্ত স্থানে ৪৪-৪৫ টির মতো হরিণ বেশি আছে। প্রতিটি হরিণের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৪৭০ বর্গফুুট জায়গা। সেহিসেবে অতিরিক্ত হরিণগুলোর স্বাভাবিক বিচরণ ও থাকার জন্য প্রয়োজন ২১ হাজার ১৫০ বর্গফুট জায়গা। এই অতিরিক্ত স্থানের ব্যবস্থা করতে পারলেই হরিণগুলো আর অন্যত্র বিক্রি করে তাদের স্বাভাবিক জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিতে হতোনা বলেও মন্তব্য সচেতন ও পশু প্রেমিদের। ২০২৩ সালে ২৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহী নভোথিয়েটার নির্মাণ করা হলেও প্রকৃতির উপহার হরিণের জন্য যৎসামান্য জায়গা কর্তৃপক্ষ ম্যানেদ করতে পারছেননা, এটা বেশ কষ্টদায়ক একটি বিষয় বলেও মন্তব্য অনেকের।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.