চারদিকে ঈদের প্রস্তুতি, নতুন পোশাকের ঝলক আর আনন্দের ব্যস্ততা। কিন্তু দ্বীপ জেলা ভোলার মনপুরা উপজেলার এক কোণে ঈদ মানেই যেন বাড়তি এক কষ্টের নাম। চার কন্যা ও এক মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে জীবনের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করছেন অসহায় মা পারুল বেগম। যেখানে তিনবেলা খাবার জোটানোই দুষ্কর, সেখানে নতুন জামা কিংবা ঈদের গরুর মাংস যেন অলীক স্বপ্ন।
মনপুরা উপজেলার উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা পারুল বেগমের জীবনের গল্প দারিদ্র্য আর বেদনায় মোড়ানো। প্রায় ১৯ বছর ধরে তিনি লালন-পালন করছেন তার মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলে রাকিবকে। জন্মের পর প্রথম তিন বছর স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ অজানা এক রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারায় শিশুটি। সেই থেকে শুরু হয় মায়ের কঠিন সংগ্রাম।
পারুল বেগম বলেন, “আমার চার মেয়ে আর এক প্রতিবন্ধী ছেলে। সামনে ঈদ, কিন্তু ওদের নতুন জামা কিনে দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। অনেক সময় তিনবেলা ভাতও জোটে না। আজ বেগুন দিয়ে ভাত খাইছি, তেল দেওয়ারও টাকা নাই।” সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার বৃদ্ধ স্বামী। কয়েকদিন আগে কাজের সন্ধানে ঢাকায় গেলেও নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা নেই। ফলে পাঁচ সন্তানের দায়িত্ব একাই বহন করছেন পারুল।
স্থানীয় বাসিন্দা সালাউদ্দিন, দুলাল ও মো. ফরিদ জানান, “পারুল বেগম অত্যন্ত দরিদ্র। চার মেয়ে আর এক প্রতিবন্ধী ছেলে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটায়। ঈদ সামনে, কিন্তু কেনাকাটার সামর্থ্য নেই। কেউ যদি কিছু সহায়তা করত, তাহলে অন্তত ঈদের দিনটা একটু ভালো কাটত।” তারা আরও জানান, পারুলের মেয়েরা অনেক সময় মানুষের বাসায় কাজ করে বা আশপাশে ছোটখাটো কাজ খুঁজে সংসারে সহায়তা করে। কিন্তু তাতে পরিবারের মৌলিক চাহিদাও পূরণ হয় না।
৬০ বছরের জীবনে দারিদ্র্য যেন পিছু ছাড়েনি পারুল বেগমের। ভাঙাচোরা একটি ঘরে বসবাস করলেও সন্তানদের মুখের হাসিই তাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়। তার স্বপ্ন—একদিন হয়তো তার প্রতিবন্ধী ছেলেও কিছুটা সুস্থ হয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াবে।
এ বিষয়ে ভোলা জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রজত শুভ্র সরকার বলেন, “পরিবারটি যদি আমাদের কাছে আবেদন করে, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা ও অন্যান্য সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”
দ্বীপ জেলা ভোলায় পারুল বেগমের মতো অসংখ্য পরিবার আজও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ যদি একটু এগিয়ে আসেন, তাহলে হয়তো এই পরিবারগুলোর জীবনেও ফিরতে পারে ঈদের আনন্দ। কারণ—প্রতিবন্ধী মানুষও মানুষ। তাদেরও আছে বাঁচার অধিকার, স্বপ্ন দেখার অধিকার, সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপনের অধিকার।