ছবি: সংগৃহীত।
রাজবাড়ী জেলার পাংশা অঞ্চলে গ্রামীণ আধিপত্য বিস্তার ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জামিন বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর দফায় দফায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জেরে গত ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে ৪৯ জনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখসহ আরও প্রায় ৩০০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে পাংশা আদর্শ অধিক্ষেত্রে (থানায়) একটি লিখিত অভিযোগ বা নালিশ দায়ের করেন নিহত জামিন বিশ্বাসের পুত্র রিপন বিশ্বাস।
অপর দিকে, একই সংঘাতের সূত্র ধরে প্রতিপক্ষ কোন্দলের অংশ হিসেবে ইউনিয়নের নাবড়াদাহ গ্রামের মৃত শাহাদাত মন্ডলের পুত্র হাকিম মন্ডল বাদী হয়ে আকিদুল বিশ্বাসকে প্রধান অভিযুক্ত করে ৯৮ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জন অজ্ঞাতনামাকে অভিযুক্ত করে একটি পাল্টা হত্যাচেষ্টা নালিশ ঠুকে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, এই পাল্টা নালিশের প্রধান অভিযুক্ত আকিদুল বিশ্বাস বর্তমানে পাট্টা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে দুই পক্ষের এমন আকস্মিক ও বিশাল পাল্টাপাল্টি আইনি পদক্ষেপের কারণে আরক্ষক বাহিনীর (পুলিশের) হাত থেকে বাঁচার তীব্র আতঙ্কে বর্তমানে সম্পূর্ণ পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে কসবামাজাইল ইউনিয়নের দড়ি বাংলাট, বড় বাংলাট ও পারকোল গ্রাম এবং পাট্টা ইউনিয়নের ঢেপামাঝাইল গ্রাম।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কসবামাজাইল ইউনিয়নের বাসিন্দা হাকিম এবং সাত্তারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পৈত্রিক জমিজমা নিয়ে তীব্র বিরোধ চলে আসছিল। একপর্যায়ে পাট্টা ইউনিয়নের বাসিন্দা (পরবর্তীতে নিহত) জামিন বিশ্বাস এই দ্বন্দ্বে সরাসরি সাত্তারের পক্ষ অবলম্বন করলে বিষয়টি ব্যক্তিগত সীমানা পেরিয়ে দুই গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ জমির বিরোধ একপর্যায়ে গ্রামীণ আধিপত্য বিস্তারের এক হিংস্র ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জুন সংঘটিত এক ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রতিপক্ষের অতর্কিত হামলায় গুরুতর জখম হন জামিন বিশ্বাস। ওই দিন রাতেই ঢাকার একটি নিরাময় কেন্দ্রে (হাসপাতালে) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর এই মৃত্যুর খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ওই রাতেই দড়ি বাংলাট, বড় বাংলাট ও পারকোল গ্রামের প্রতিপক্ষ দলের বিভিন্ন বসতবাড়িতে ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের তাণ্ডব চালানো হয়।
অপরদিকে, পাল্টা নালিশের বিবরণী থেকে জানা গেছে, মূল হত্যাকাণ্ডের আগের দিন অর্থাৎ গত ২০ জুন শনিবার শিকদারপাড়া এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আকিদুল বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে হাকিম মন্ডলের ওপর লাঠিসোটা নিয়ে আকস্মিক হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছিল।
এলাকার বর্তমান থমথমে পরিস্থিতি বর্ণনা করে দড়ি বাংলাট ও পারকোল গ্রামের রোজিনা বেগম, আকলিমা খাতুন ও সেলিনা পারভীনসহ একাধিক নারী কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, ‘২১ জুন রাতে আমাদের পুরো এলাকায় লাঠিসোটা ও অস্ত্র নিয়ে বর্বরোচিত হামলা, ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় পাট্টা ইউনিয়নের শত শত লোক। আমরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। পুলিশের গ্রেপ্তার এবং প্রতিপক্ষের পুনরায় হামলার ভয়ে অনেক পরিবার ইতিমধ্যেই নিজেদের সহায়-সম্বল, অবলা গবাদিপশু ও ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য অঞ্চলে পালিয়ে গেছে।’
নিজের পিতাকে হারানোর শোকে কাতর প্রধান নালিশের বাদী রিপন বিশ্বাস বলেন, ‘আমার নিরপরাধ বাবাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠু বিচার চেয়ে লিখিত এজাহার জমা দিয়েছি। আমি দ্রুত মূল অপরাধীদের গ্রেপ্তার দেখতে চাই এবং যারা আমার বাবাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে, আদালতের মাধ্যমে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি তথা ফাঁসি দাবি করছি।’
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাংশা অঞ্চলের প্রধান আরক্ষক কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মঈনুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘উপজেলার পাট্টা ও কসবামাজাইল দুই ইউনিয়নের অবাধ্য বাসিন্দাদের মধ্যে মূলত জমি সংক্রান্ত বিরোধে এই বড় ধরনের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাটি ঘটেছে। এই সংঘাতের জেরে জামিন বিশ্বাস নামের একজন সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত আরক্ষক দল মোতায়েন করা হয়েছে। এই সংঘাত ও ভাঙচুরকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত মোট দুটি ভিন্ন লিখিত নালিশ নথিভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে দুই পক্ষ মিলিয়ে মোট সাত শতাধিক গ্রামীণ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।’
তিনি আরও যোগ করে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ইতিমধ্যেই অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য সকল নামধারী ও অজ্ঞাতনামা অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে আমাদের বিশেষ চিরুনি অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
