× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

বন্যায় বিপর্যস্ত আট জেলা, ২৯ জনের প্রাণহানি

ডেস্ক রিপোর্ট।

১১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৩ এএম

ছবি: সংগৃহীত।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের চার জেলা, সিলেট বিভাগের দুই জেলা ও উত্তরাঞ্চলের দুই জেলা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে একজন এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে তিন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের চকরিয়ায় বানের পানিতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুধু কক্সবাজারেই সাত দিনে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে ২৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। কক্সবাজারের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা

ঢাকা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সব নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। গত পাঁচ দিন ধরে পানিবন্দি রয়েছে চট্টগ্রামের অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে। হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, মুহুরী, ফেনী ও সেলোনিয়া নদীর পানি সমতলে হ্রাস পেয়েছে।

ফেনী ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি হতে পারে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও প্লাবিত হতে পারে। উজানে বৃষ্টি কমে আসায় সাঙ্গু নদীর বান্দরবান পয়েন্টে গতকাল শুক্রবার ৪৭ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে গতকাল বিপত্সীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। মাতামুহুরী নদী লামা পয়েন্টে ১০৭ সেমি কমে বিপত্সীমার ৪৭ সেমি ওপরে এবং চিরিংগা পয়েন্টে ১৭ সেমি কমে বিপত্সীমার ৩২ সেমি ওপর দিয়ে বইছিল। কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, দেশের অভ্যন্তরে টানা ও উজানের ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতে দেশে নদ-নদীর পানি বেড়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে কিছুটা উন্নতির আশা থাকলেও সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি হতে পারে। মনু নদী মৌলভীবাজারে ২৫ সেমি বেড়ে বিপত্সীমার ৮০ সেমি ওপরে গতকাল বিপত্সীমার ৩৫ সেমি ওপরে বইছিল। কুশিয়ারা নদীর মারকুলি পয়েন্টে ৭ সেমি বেড়ে বিপত্সীমার ১৮ সেমি ওপরে এবং ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ২১ সেমি বেড়ে বিপত্সীমার ১০ সেমি ওপর দিয়ে বইছিল। সংস্থাটি  জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলীয় রংপুর বিভাগের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতলে বেড়েছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার তিস্তা নদীর পানি সমতলে বেড়ে কিছু স্থানে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছিল। নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও বন্যা পরিস্থিতি হতে পারে।

আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় ও লঘুচাপের প্রভাবে আরো কয়েক দিন মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। কোনো কোনো জায়গায় ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।

চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় সেনা মোতায়েন

বৃহত্তর চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, ও রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন স্থানে পানিবন্দি রয়েছেন কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ। চট্টগ্রাম জেলায় বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের জরুরি অনুরোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন বন্যাদুর্গত বিভিন্ন উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। আইএসপিআর জানায়, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালী—এই চারটি উপজেলা ব্যাপকভাবে প্লাবিত হয়েছে। ফলে এসব এলাকার প্রায় চার লাখ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন কর্তৃক দুর্গত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। মৌসুমি ভারি বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলায়ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য উপজেলাগুলোয় ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সেনা সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই অঞ্চলগুলোয় আটকে পড়া মানুষের জন্য নিরলসভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ কার্যক্রম দ্রুত ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ২৪ পদাতিক ডিভিশন এরই মধ্যে বন্যাদুর্গত এলাকায় তিনটি ক্যাম্প স্থাপন করেছে। দুর্গত এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনীর এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে পাহাড়ধসের ঝুঁকি। পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো থেকে ২২১টি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছেন সেনা সদস্যরা। এদিকে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আজ শনিবারের এইচএসসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল  বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মো. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরীর সই করা জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বাঁশখালীতে ঢলে তিন শিশুর প্রাণহানি

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে পৃথকভাবে দুই শিশু এবং বিকেল সাড়ে ৪টায় সরল ইউনিয়নে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো—বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ইলশা গ্রামের মেহের আলীর বাড়ির প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ আশিক (৭) ও একই ইউনিয়নের রত্নপুরের মোহাম্মদ মিরাজ (৩) এবং সরল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম জালিয়াঘাটা এলাকার আব্দুল করিমের মেয়ে তাহিন নুর (১২)। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোতে বাড়ির উঠানে থাকা দুই শিশু ভেসে যায়।  বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পানির স্রোতে তলিয়ে যায় তাহিন নুর। পরে পরিবার, স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সার্ভিস তাদের লাশ উদ্ধার করে। বাঁশখালী থানার ওসি মো. রবিউল হক গণমাধ্যমকে বলেন, পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর খবর পেয়েছি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ওই শিশুদের দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।

কক্সবাজারে সাত দিনে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে প্রাণহানি ২৫, রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

কক্সবাজার থেকে বিশেষ প্রতিনিধি জানান, টানা ভারি বর্ষণে কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সাত দিনে মারা গেছে ২৫ জন। এর মধ্যে পাহাড়ধসে ১৯ জন এবং পানিতে ডুবে প্রাণ হারায় ছয় শিশু। লাখো মানুষ পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে। টানা ভারি বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলার জনজীবন। চার দিনের টানা ভারি বৃষ্টিতে কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, ঈদগাঁও ও মাতামুহুরী এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে। বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়ার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। এদিকে বর্ষণজনিত পানিতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের চট্টগ্রাম কালুরঘাট সেতুসংলগ্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় তিন দিন ধরে কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগও বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের রামু উপজেলার কিছু এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলে দুই-তিন ধরে বিঘ্ন ঘটছে। টানা পাঁচ দিন পর গতকাল টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে নৌযান চলাচল শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে ইউএনএইচসিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, গত ৪ জুলাই রাত থেকে ৯ জুলাই দুপুর পর্যন্ত ১৫ জন রোহিঙ্গা নিহত, ১৮ জন আহত এবং ২৬ হাজার ১১৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় চার হাজার ৩০৭ জন সাময়িকভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

চকরিয়ায় শিশুর মৃত্যু, দুই বোন জীবিত উদ্ধার

মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা উজানের ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বৃষ্টিপাত সামান্য কমলেও উজানের ঢলের পানি প্রবল বেগে ভাটির দিকে চলমান থাকায় উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক স্থানে বাড়ির চাল পর্যন্ত ডুবে থাকায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে লাখো মানুষ। উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের রসুলাবাদ গ্রামের আবদুল মালেক গতকাল সকাল ৮টার দিকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পরিবারের সদস্য নিয়ে একটি নৌকায় রওনা দেন। কিন্তু ঝোড়ো বাতাসের কবলে পড়ে নৌকাটি ডুবে তিন কন্যাশিশুসহ বেশ কয়েকজন পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে এক মেয়ে নিখোঁজ হয়। দুই কন্যাশিশুকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে নেওয়া হয় হাসপাতালে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা পর নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে। মারা যাওয়া শিশুর নাম হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২)। সে রসুলাবাদ গ্রামের আবদুল মালেকের মেয়ে। উদ্ধারের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে দুই শিশুকন্যা জেরিন মনি (৮) ও শাওরিন মনি (৬)। ভুক্তভোগী আবদুল মালেক জানান, তাঁদের বাড়িঘরসহ পুরো রসুলাবাদ গ্রাম ১০ থেকে ১২ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বাড়ির চাল পর্যন্ত ডুবে গেছে। এই অবস্থায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য স্ত্রী ও তিন কন্যাশিশুকে নিয়ে নৌকায় রওনা দেন তাঁরা। কিন্তু তাঁদের বহনকারী নৌকাটি তীব্র ঝোড়ো বাতাসের কবলে পড়ে হারবাং ছড়া সেতুর অদূরে ডুবে গেলে তিন কন্যাশিশু ও স্ত্রী তলিয়ে যায়। এ সময় স্ত্রী সাঁতরিয়ে এবং ও দুই মেয়েকে কোনোমতে উদ্ধার করা গেলেও বড় মেয়ে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা নিখোঁজ হয়। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিখোঁজ মেয়ের মরদেহ প্রায় ছয় ঘণ্টা পর উদ্ধার করে।

ফটিকছড়িতে ভাঙন তীব্র

ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় হালদা ও ধুরুং নদীর বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ও সম্পদ হারানোর চরম দুশ্চিন্তায় দিনাতিপাত করছে। অনেক পরিবার এরই মধ্যে তাদের গবাদি পশু ও আসবাব নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করছে।

বাঘাইছড়িতে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, সাজেক ছাড়ল সব পর্যটক

রাঙামাটি সংবাদদাতা জানান, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এখনো ৩০টি গ্রামে দেড় হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। এ ছাড়া সাজেকে আটকা পড়া বাকি ৪০০ পর্যটক সেনা সহায়তায় নিজ গন্তব্যে ফিরে গেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় অতিবর্ষণের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজার ৫২৪ জন আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, জেলায় ১২৫টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের এখনো নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসতে প্রশাসন থেকে বারবার মাইকিং করে বলা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তিন বেলা খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। রাঙামাটির পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে তিন দিন আটকে থাকার পর বাকি ৪০০ পর্যটককে ফিরিয়ে আনল সেনাবাহিনী। গতকাল সকালে সেনাবাহিনীর স্কটে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা দেয় পর্যটকবাহী জিপ ও মোটরসাইকেল।  কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সাজেকের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন জানান, তিন দিন পর শুক্রবার সকালে সেনাবাহিনীর সহায়তায় বাকি ৪০০ পর্যটক সাজেক ছেড়েছে। পতিমধ্যে কিছু হালকা পাহাড়ধসে গাড়ি চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও কোনো সমস্যা ছাড়াই তারা খাগড়াছড়ি ফিরেছে।

দীঘিনালায় পানিবন্দি হাজারো মানুষ

খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা প্রতিনিধি জানান, দীঘিনালা উপজেলার ছোট মেরুং ইউনিয়নে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। সড়কে পানি থাকায় রাঙামাটির লংগদু উপজেলার সঙ্গে টানা তিন দিন সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলার মহালছড়ি উপজেলার ২৪ মাইলের একটি পাহাড়ে এক অজ্ঞাত নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহ নিয়ে আসে। প্রাথমিকভাবে মরদেহটি একজন মারমা নারীর হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও এখন পর্যন্ত তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহের পরিচয় শনাক্ত এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম চলছে।

বান্দরবানে সাত উপজেলার নিম্নাঞ্চলে প্লাবন

বান্দরবান থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় বান্দরবানের বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো পানির নিচে। জেলার সাত উপজেলার নিম্নাঞ্চলের অসংখ্য বসতঘর প্লাবিত হয়েছে, পানিবন্দি জীবন কাটাচ্ছে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ। অন্যদিকে পাহাড়ধস ও সড়ক প্লাবিত হওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কেরানীহাট ও রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ঘুরে দেখা যায়, কেরানীহাটের সত্যপীর মাজার ও বাজালিয়া এলাকায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে বান্দরবানের প্রধান সড়ক। একইভাবে কাপ্তাইয়ের বাঙ্গালখালিয়া, মতিপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের কারণে রাঙামাটির সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বান্দরবান-চট্টগ্রাম, বান্দরবান-কক্সবাজার ও বান্দরবান-রাঙামাটি সড়কের একাধিক অংশ পানিতে ডুবে থাকায় দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহন দীর্ঘ সারিতে আটকা পড়ে আছে। এদিকে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও সদর উপজেলার বিভিন্ন সড়কে ধসে পড়া মাটি সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দিনরাত কাজ করছেন। বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও পাড়াপ্রধানদের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

সিলেট অঞ্চলে পানি বাড়ছে, নিহত ১

সিলেট থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ভারি বৃষ্টিপাত ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে নদ-নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করেছে। এতে অন্তত ৬০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় নদীর পানি বাড়ছে। মৌলভীবাজার জেলায় বন্যায় আশরাফ আলী ওরফে আশই মিয়া (৭০) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। নিহত আশরাফ আলী মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ৬ নম্বর টেংরা ইউনিয়নের আকুয়া গ্রামের বাসিন্দা। বাড়ির পাশে অসাবধানতাবশত বন্যার পানির স্রোতে তিনি তলিয়ে গিয়ে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাতে রাজনগরের আকুয়ায় মনু নদীর বাঁধের বড় অংশ আকস্মিক ভেঙে যায়। তীব্র স্রোতে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে যায় বেশ কয়েকটি গ্রাম। ওই সময় রাতে বন্যার পানিতে নিখোঁজ হন বৃদ্ধ আশরাফ আলী। গতকাল  সকাল ৯টার দিকে স্থানীয়রা রিং বাঁধের পাশে বৃদ্ধের লাশ ভাসতে দেখে নিহতের স্বজনদের খবর দেয়। পরে নিহতের ছেলে ও স্থানীয় বাসিন্দারা লাশটি উদ্ধার করেন। মৌলভীবাজারের রাজনগরে মনু নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর, হরিপাশা এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের প্রায় ৩৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

হবিগঞ্জে বাঁধ ভেঙে বন্যা

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে খোয়াই নদী। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এতে একে একে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলার ১১টি পয়েন্টের সব কটিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশির ভাগ পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিলেটের নদ-নদীর পানি বিপত্সীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। সিলেটে বন্যার বড় কারণ মেঘালয়ে অধিক বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢল। আগামী অন্তত তিন দিন মেঘালয়ে ভারি বৃষ্টিপাত হবে। সুতরাং সিলেট জেলায় বন্যার শঙ্কা রয়েছে। আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করছি।’


Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.