গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার (১১ জুলাই) বিকেলে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে চার দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য এই সমাবেশের আয়োজন করে।
জামায়াতের আমির বলেন, আমাদেরকে বিভিন্নভাবে গণভোট বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অনেক কথা বলা হচ্ছে। পরিষ্কার কথা- আমরা জাতির সাথে বেইমানি করতে পারবো না। জাতিকে আমরা কথা দিয়েছি- লাড়াই আমরা করে যাবো, গণভোট বাস্তবায়নে বাধ্য করবো ইনশাআল্লাহ। এর থেকে এক চুল পরিমাণ আমরা সরবো না। এই আবু সাঈদের রক্তে ভেজা রংপুরে আরেকবার এই অঙ্গীকার ব্যস্ত ব্যক্ত করে গেলাম।
শফিকুর রহমান বলেন, যে বৈষম্য দূর করে বাংলাদেশের পচা রাজনীতিকে বিদায় জানিয়ে নতুন বাংলাদেশ করার জন্য আমাদের সন্তানেরা লড়াই করেছিল। সেই নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্যই সংস্কারের উদ্দেশ্যে গণভোট হয়েছে। বাংলাদেশের একটা জায়গায় শুধু দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন ভোট দেবেন দুটো। একটি আমার দলকে আরেকটি গণভোটে হ্যাঁ। তিনি প্রথমটা রক্ষা করেছেন। দ্বিতীয়টা তিনি রক্ষা করেন নাই।
তিনি বলেন, তিস্তা নিয়ে বর্তমান সরকারি দল নির্বাচনের আগে জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাও- এই আন্দোলন করেছে। কিন্তু তিস্তা নিয়ে এই বাজেটে ১০ টাকারও কোনো অ্যালোকেশন নেই। আমরা কথার ফুলঝুরি শুনতে চাই না। আমরা বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চাই। এই সরকার যদি ব্যর্থ হয়, আগামীতে আপনাদের সহযোগিতা দোয়া ভালোবাসা সমর্থন ভোটে নির্বাচিত হয়ে ১১ দল সরকার গঠন করে সেই দাবি বাস্তবায়ন করবে ইনশাআল্লাহ।

সীমান্তে উত্তেজনার বিষয়ে জামায়াতের আমির বলেন, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সীমান্ত। সীমান্তে সুড়সুড়ি দিচ্ছে প্রতিবেশী ভারত। সরকার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। আমরা প্রতিবাদ করছি, জনগণ প্রতিবাদ করছে। শুধু প্রতিবাদ করছে না, প্রতিরোধ করার জন্য বিজিবির সৈনিকদের সাথে সমানতালে জনগণ লড়াই করে যাচ্ছে। আমরা এই সংগ্রামী বীরদেরকে অভিনন্দন জানাই। সরকারের মুখ থেকে এই ব্যাপারে এখন পর্যন্ত একটা শব্দও আসে নাই। কার ভয়ে কাকে খুশি করার জন্য, কোন দেশের শাসক আপনারা ঠিক। বাংলাদেশের জনগণের নাড়ির পালস বুঝার চেষ্টা করুন। জনগণের অভিপ্রায় আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে মেহেরবানি করে অবস্থান নেবেন না। নিলে কী হয়- সম্প্রতি ইতিহাস থেকে সবারই সবক গ্রহণ করা উচিত। অতএব সাফ কথা- তিস্তার ব্যাপারে কোনো ধানাই পানাই বুঝি না। তিস্তা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে হবে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব ব্ক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের অর্জন শুন্য বলে মন্তব্য করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, কিছুদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে গিয়েছিলেন। আমরা বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সংসদে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। এরপরে হয়তো কিছু বলা উচিত না। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি_চীন সফরের অর্জন কোথায়? চীন সফরের অর্জন হচ্ছে শুন্য। চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আমরা কোন কমিটমেন্ট পাই নাই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্সন নিয়ে কোন কমিটমেন্ট পাই নাই।
বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, দেশে যদি জাতীয় ঐক্য না থাকে, তারেক রহমান পৃথিবীর কোন দেশ থেকে কোন ধরণের সাহায্য পাবে না। অলরেডি আইএমএফ তাদের (সরকারকে) বলে দিয়েছে আর কোন ঋণ দিবে না। পৃথিবীর কোন দেশই তাদেরকে সহযোগিতা করবে না। গণঅভ্যুত্থান ও সংস্কারের সাথে প্রতারণা করলে কেউই সহযোগিতা করবে না।
তিনি আরও বলেন, রংপুর থেকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ গণঅভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের সিপাহ সালাহ ছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম নির্বাচনের পরে বিএনপি গণভোটের সাথে প্রতারণা করেছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরে সকলের দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল এবং এসেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অস্বীকার করেছিল। তার ফলাফল কি হয়েছিল_বিএনপিকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলে রাজপথে নির্যাতিত হতে হয়েছিল।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, যেই গণঅভ্যুত্থান, গণভোট, সংস্কার ও জুলাই সনদের কারণে বিএনপি আজ ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। এখন সেই গণভোটের সাথেই প্রতারণা করেছে। বিএনপি ৩১ দফার সাথে প্রতারণা করেছে। বিএনপি জুলাই সনদের সাথে প্রতারণা করেছে। বিএনপি গণতন্ত্রের সাথে প্রতারণা করেছে।
নাহিদ আরও বলেন, সারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ নেই। বাংলাদেশে গ্রামেগঞ্জে আবার মানুষ হারিকেন জ্বালাতে বাধ্য হয়েছে। এই সরকার বিগত সময়েও হারিকেন দিয়েছে, এবারো বাংলাদেশের মানুষের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। কর্মসংস্থান দিতে পারছে না।
জাতীয় বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বাজেটে কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা রাখা হয়নি। ব্যাংকগুলো কিভাবে ঠিক হবে, দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা কিভাবে ফেরত আসবে, কোনো ধরণের সুপরিকল্পনা এই সরকারের নেই। ফলে আমরা বলব আপনি (তারেক রহমান) এভাবে দেশ চালাতে পারবেন না। দেশ চালাতে অলরেডি ব্যর্থ হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্কার দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ বলেন, যদি দেশ পরিচালনা সঠিকভাবে করতে হয় তাহলে আপনাকে (প্রধানমন্ত্রীকে) অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। অবিলম্বে অর্থনৈতিক সংস্কার করতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। সীমান্তে পুশইন ও সীমান্ত হত্যা প্রতিরোধ করতে হবে। যদি সীমান্ত হত্যা, পুশইন প্রতিরোধ করতে না পারেন তাহলে নিজেদের দল থেকে জাতীয়তাবাদী শব্দটি কেটে ফেলে দেন। জাতীয়তাবাদের নামে ব্যবসা করবেন, নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক দেখাবেন। অথচ সীমান্ত হত্যা, পুশইন রোধ করতে পারবেন না, তাহলে দেশের জনগণ আপনাদেরকে ক্ষমতায় থাকার ম্যান্ডেন্ট দিবে না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ডিসেম্বরে কেউ একজন দেশে আসার পরিকল্পনা করছে। আমরা ফাঁসির দঁড়ি রেডি করে অপেক্ষা করছি। আপনি (শেখ হাসিনা) ডিসেম্বরে আসুন আর যখনই আসুন ফাঁসির দঁড়িতে ঝুলতেই হবে। বাংলাদেশ থেকে যে পালিয়ে যায়, সে আর বাংলাদেশে কখনো ফিরে আসে না। পাকিস্তানিরাও এর থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নিয়েছিল। ইংরেজরাও এর থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নিয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ সরকার এত অসম্মানজনকভাবে কাপুরুষোচিত ভাবে এই দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ভারতের কোলে আশ্রয় নিয়েছে। তিনি আর এই দেশে আসার সৎ সাহস কখনো রাখবে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা আসবে কি আসবে না, এটা দিল্লীর সাথে ঢাকাকে নির্ধারণ করতে হবে। এই সরকার থেকে দিল্লীকে ম্যাসেজ দিতে হবে। শেখ হাসিনা দিল্লীতে বসে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ফ্যাসিস্ট মিডিয়ার দোসররা সেই সকল তথ্য প্রচার করছে। বাংলাদেশের জনগণ এটা মেনে নেবে না।
এ সময় সংস্কার, গণভোট, জুলাই সনদসহ ১১ দলীয় ঐক্যের দাবি বাস্তবায়নে অচিরেই নতুন করে আন্দোলনের ডাক আসবে বলে জানান তিনি। সেই আন্দোলনে সফল হবার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্য শেষ করেন।
এর আগে বক্তব্যের শুরুতে সমাবেশের সভাপতি ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, রংপুর বিভাগ বাংলাদেশে দীর্ঘসময় ধরে আঞ্চলিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। আমরা আশা করেছিলাম, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এবারের নির্বাচনে যেই সরকার গঠিত হয়েছে তাদের প্রথম বাজেটে রংপুর বিভাগের প্রতি সুদৃষ্টি সুনজর দেয়া হবে। কিন্তু আমরা দেখলাম এবারের বাজেটেও রংপুর বিভাগের সাথে বাজেট বৈষম্য করা হয়েছে। রংপুর বিভাগের বেশির ভাগ আসন বিরোধী দলের হওয়ার কারণে পরিকল্পিতভাবে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রংপুরে কোন বড় উন্নয়ন প্রজেক্ট রাখা হয়নি। বরাদ্দ সব যাচ্ছে বগুড়ার শিবগঞ্জে। গোপালগঞ্জ প্রতিস্থাপিত হয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জে। কিন্তু যারা প্রকৃত বৈষম্যের শিকার, সেই রংপুরবাসী কোন বরাদ্দ পাচ্ছে না। সরকারি দলের এমপিরা যেই বরাদ্দ পায়, বিরোধী দলের এমপিরা সেই বরাদ্দের তিনভাগের একভাগও পাচ্ছে না।
রংপুর বিভাগীয় এ সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলী আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আল্লামা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন বক্তব্য রাখেন।
এছাড়াও সমাবেশের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রব্বানী, রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রায়হান সিরাজী, রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এটিএম আজম খান, সেক্রেটারি কে এম আনোয়ারুল হক কাজল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) রংপুর জেলা আহ্বায়ক আল মামুন, মহানগরের সদস্য সচিব আব্দুল মালেকসহ ১১ দলীয় ঐক্যের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।