× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

রতন সরকার: উত্তরের না-বলা মানুষের কণ্ঠস্বর, যিনি আজও বেঁচে আছেন মানুষের হৃদয়ে

মো. সাইফুল ইসলাম, নীলফামারী।

১৩ জুলাই ২০২৬, ১৭:১২ পিএম

১৩ জুলাই উত্তরবঙ্গের সাংবাদিক সমাজের জন্য শুধু একটি তারিখ নয়, এটি এক গভীর শোকের দিন। এই দিনে আমাদের ছেড়ে চলে যান সময় টেলিভিশনের রংপুরের নিজস্ব প্রতিবেদক, নির্ভীক সাংবাদিক রতন সরকার। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মৃত্যুর তিন বছর পরও তাঁর শূন্যতা একইভাবে অনুভূত হয়। কারণ, কিছু মানুষ চলে গেলেও তাঁদের কর্ম, আদর্শ ও মানবিকতা কখনো হারিয়ে যায় না।

রতন সরকার ছিলেন এমন একজন সাংবাদিক, যিনি সংবাদকে কখনো পেশা হিসেবে দেখেননি; মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা হিসেবেই দেখেছেন। উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক মানুষের সুখ-দুঃখ, তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব হওয়া পরিবার, সীমান্তবাসীর জীবনসংগ্রাম, কৃষকের হতাশা, শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট কিংবা অবহেলিত জনপদের উন্নয়নবঞ্চনা—এসবই ছিল তাঁর সংবাদচর্চার কেন্দ্রবিন্দু।

তাঁর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা। একবার বক্তব্য নেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, "দীর্ঘসূত্রতা শব্দটা পরিবর্তন করে সহজ শব্দ বললে ভালো হয়। চায়ের দোকানে বসেও সাধারণ মানুষ আমার রিপোর্ট দেখবে। সেখানে এমন শব্দ থাকুক, যাতে সবাই বুঝতে পারে।" এই একটি বাক্যই তাঁর সাংবাদিকতার দর্শনকে স্পষ্ট করে। সংবাদ মানুষের জন্য—তাই ভাষাও হতে হবে মানুষের।

রতন সরকার শুধু সংবাদ সংগ্রহ করতেন না, সংবাদকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতেন। দুর্গম চর, নদীভাঙন এলাকা, সীমান্ত কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের পথে তাঁর ক্যামেরা যেমন পৌঁছেছে, তেমনি পৌঁছেছে রাষ্ট্রের দৃষ্টি। এজন্য অনেকেই তাঁকে ‘চারণ সাংবাদিক’ বলতেন। আবার অনেকেই তাঁর নিরলস মাঠকেন্দ্রিক সাংবাদিকতার সঙ্গে কিংবদন্তি সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের কাজের মিল খুঁজে পেতেন।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আবেগের জায়গাগুলোর একটি ছিল তিস্তা নদী। ২০১০ সালের পর থেকে তিস্তা ইস্যুকে জাতীয় আলোচনায় রাখতে যাঁরা নিরলস কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে রতন সরকার অন্যতম। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে তিনি সংবাদ করেছেন, মানুষের মতামত তুলে ধরেছেন, এমনকি সাংবাদিকতার গণ্ডি পেরিয়ে আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন।

মৃত্যুর আগে তাঁর সর্বশেষ ফেসবুক স্ট্যাটাস ছিল— "সর্বোচ্চ ত্যাগের শপথ আর কোটি মানুষের স্বপ্ন নিয়ে পা বাড়ালাম। দোয়া করো উত্তরের ধূলিকণা, পানি ও বাতাস।" এই কথাগুলো আজও তিস্তাপাড়ের মানুষের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। এটি শুধু একটি স্ট্যাটাস ছিল না; ছিল উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার এক নিঃশব্দ অঙ্গীকার।

জীবনের শেষ দিনটিও ছিল কর্মব্যস্ত। ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে রাতে রংপুরে ফেরেন। পরে রংপুরের চওড়ারহাট এলাকায় গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও আর জ্ঞান ফেরেনি। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে সেই রাতেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্তও তিনি মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি বিষয় নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন—এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

রতন সরকারকে ঘিরে বিতর্কও ছিল। তাঁর কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কারণে মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি হতে হয়েছে, আত্মগোপন করেও থাকতে হয়েছে। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যের পথে হাঁটতে গেলে বাধা আসবেই। একজন সাংবাদিকের মূল্যায়ন তাঁর ভুল-ত্রুটিসহই হয়; রতন সরকারও তার ব্যতিক্রম নন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন আপসহীন এবং মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো এক সংবাদযোদ্ধা।

মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে একটি বই লেখার কাজও করেছিলেন তিনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। যদি সেই বই প্রকাশ পেত, তবে হয়তো নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা মাঠের সাংবাদিকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আরও অনেক কিছু শেখার সুযোগ পেতেন।

ব্যক্তিগতভাবে রতন সরকার আমার কাছে শুধু একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ছিলেন না; ছিলেন একজন অকৃত্রিম বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুপ্রেরণার মানুষ। তাঁর সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহের অসংখ্য স্মৃতি আজও মনে পড়ে। মানুষের জন্য কাজ করার যে তাগিদ, সংবাদে মানবিকতা রাখার যে শিক্ষা, তা আমি তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি। তিনি সবসময় বলতেন—সংবাদ এমন হতে হবে, যা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এবং নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারে।

আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে মনে হয়, তিনি যেন এখনো ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে তিস্তার পাড়ে কিংবা কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে মানুষের গল্প খুঁজে বেড়াচ্ছেন। সময় বদলেছে, সংবাদমাধ্যম বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু মানুষের জন্য সাংবাদিকতা করার যে আদর্শ তিনি রেখে গেছেন, তা কখনো পুরোনো হবে না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন— "নয়নসম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।" রতন সরকারের ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। তিনি চোখের সামনে নেই, কিন্তু উত্তরবঙ্গের মানুষের হৃদয়ে, সহকর্মীদের স্মৃতিতে এবং নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের অনুপ্রেরণায় তিনি আজও বেঁচে আছেন।

মহান আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন মরহুম রতন সরকারকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং মানুষের কল্যাণে করা প্রতিটি কাজকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন।

রতন সরকার নেই, কিন্তু সত্যের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা, মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর আপসহীন অবস্থান উত্তরবঙ্গের আকাশে আজও আলোর প্রদীপ হয়ে জ্বলছে। এমন মানুষ মৃত্যুর পরও হারিয়ে যান না—তাঁরা তাঁদের কর্মের মধ্য দিয়েই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকেন।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.