উজানের ঢল আর টানা তিনদিনের অব্যাহত বৃষ্টিতে ফুলেফেঁফে উঠে মৌলভীবাজারের দুটি নদী মনু ও ধলাই। ফলশ্রæতিতে গত ৯ জুলাই জেলার রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুরে মনুনদীর ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরক্ষা বাঁধে বড় ধরণের ভাঙন দেখা দেয়। অবশ্য এর আগে ভাঙন ঠেকাতে এলাকাবাসী বালির বস্তা ফেলেও ব্যর্থ হন। এর পর পানির প্রবল ¯্রােতে উজিরপুর, একামধু আকুয়া গ্রাম সহ আশপাশের সবকটি গ্রামই পানিতে তলিয়ে যায়। প্লাবিত হয় অসংখ্য গ্রামীণ রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর। পরদিন শুক্রবার সকালে উজিরপুরের বাঁধ থেকে আধা কিলেমিটার দূরের ওয়াপদা বাঁধটিও পানির তোড়ে ধ্বসে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বন্যা প্রকট আকার ধারণ করে টেংরা, তারাপাশা, মনসুরনগর সহ ৫টি ইউনিয়নের ৩০টি গ্রামের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়লে মানবেতর জীবন যাপন শুরু হয়। বন্যায় উজিরপুরে পানিতে ভেসে আসা দুই মরদেহও উদ্ধার করে পুলিশ। যার একটি একামধু গ্রামের আশরাফ মিয়া আশই (৭০) ও অপরটি অজ্ঞাত বয়সী কিশোরীর বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আকষ্মিক এই বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উজিরপুর ও একামধূ গ্রামের বাসিন্দারা। মনুনদীর একেবারে তীরে বসবাস করা গ্রাম দুটির বাসিন্দারা তাদের বাড়িঘর মুহুর্তেই প্লাবিত হওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েন। অনেকে গায়ের কাপড় ছাড়া কিছুই ঘর থেকে নিয়ে বেড় হতে পারেননি। বানের পানির ¯্রােতে ধান-চাল, কাপড়-চোপর ও আসবাবপত্র সহ ঘরের প্রয়োজনীয় সবকিছুই চোখের সামনে ভেসে যেতে দেখলেও কিছুই করার ছিলনা তাদের। এমন কী ঘরের টিন কিংবা হাঁস-মোরগ ও গবাদিপশুকেও পানির ¯্রােতে ভাসতে দেখেছেন চোখের সামনেই। পানিবন্দী হয়ে পড়া এসব মানুষের ঠিকানা হয় ওয়াপদা বাঁধ কিংবা আশ্রয়ন কেন্দ্রে। কারো আবার আশ্রয় জোটে দূরের স্বজনের ঠিকানায়। মাত্র ক‘দিন আগের এই দু:সহ স্মৃতি এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে নদী তীরবতী উজিরপুর ও একামধু গ্রামের বাসিন্দাদের। বন্যার পানি কমতে শুরু করার সাথে সাথে নিজেদের নীড়ে ফিরতে শুরু করেন গ্রাম দুটির বাসিন্দারা। শুধু উজিরপুর কিংবা একামধূ নয়, এবারের বন্যায় পানিবন্দী হয়ে পড়া অন্যান্য গ্রামেরও হাজার হাজার মানুষ পানি কমতে শুরু করায় এখন নিজেদের বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন।
বন্যা পরবর্তী সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, মনুনদীর তীরবর্তী উজিরপুর ও একামধু গ্রামের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই নি¤œ মধ্যবৃত্ত শ্রেনীর। বন্যার পানি কমে যাওয়ায় তারা যখন বাড়ি ফিরেন, তখন দেখতে পান তাদের ঘরবাড়ি অক্ষত অছে, তবে গোয়ালের ধান-চাল,কাপড়-চোপড় সহ নিত্যপণ্য সামগ্রী বানের ¯্রােতে চলে গেছে। নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র। অনেকের আবার চালের অথবা দেয়ালের টিনও পানির তোড়ে ভেসে গেছে। এছাড়াও নষ্ট হয়েছে ধানের বিজতলা নানা জাতের শাক-সবজি ও ফসলের মাঠ। তিলে তিলে গড়ে তোলা এসব হারিয়ে এখন তারা প্রচন্ড দুশ্চিন্তা ভুগছেন। তাদের সামনে এখন মাথা তুলে দাঁড়ানোটাই মূল চ্যালেঞ্জ। তাদের প্রত্যাশা বন্যা পরবর্তী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর সংস্কারে সরকার যেন এগিয়ে আসে।
একামধূ গ্রামের গৃহবধু সাবানা বেগম বলেন, বন্যার পানিতে ঘরের সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। হাঁস-মুরুগ,গরু-ছাগল পানি নিয়ে গেছে। দুটি ছাগল পানির ¯্রােতে ভেসে গিয়ে মারা গেছে। হাঁস-মুরুগ আন্তত ১০ থেকে ১২টা পানি নিয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে কিচ্ছু পাইনি। সব চলে গেছে পানির তোড়ে। ঘড়ের পালং-চেয়ার সহ আসবাবপত্র ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পচে নষ্ট হয়েছে ঘরে রাখা ধান-চালও। এখন অনেক কষ্টের মধ্যে আছি। বন্যার সময় তিনদিন বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়ে উপোষ থাকতে হয়েছে। ত্রান সামগ্রীও যে পেয়েছে সে খেতে পেরেছে আবার যে পায়নি সে খেতে পারেনি।
উজিরপুর গ্রামের বৃদ্ধা লিনা দে বলেন, হঠাৎ করে বিকাল সাড়ে ৪টার সময় উজিরপুরের প্রতিরক্ষা বাঁধটি ভেঙে গেছে। ভাঙার পর আমরা ভাবিনি আমাদের ঘরে পানি উঠবে। যেভাবে সমুদ্রের জোয়ার হয় এভাবে আমাদের বাড়িঘর তলিয়ে যায়। যতো কাঁচা ঘর ছিল সব ভেঙে নিয়ে যায়। আগের দিন ৩হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করা চালের বস্তাটিও নিয়ে যায়। খেতে পারিনি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে একামধু গ্রাম থেকে আসা একটি নৌকা আমাকে উদ্ধার করে চারজনে উঠাইয়া নিয়ে ওয়াপদা বাঁধের উপর নিয়ে যান, সেখানে অন্য আরেক জনের ঘরে আশ্রয় নেই। চার বছরের নাতিন কে উদ্ধার করে তাদের মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেই। এখন ঘরে এসে দেখি কাদামাটিতে ভরা, হাটা যায়না। ঘরেও কোন খরচ নাই।
একামধু গ্রামের কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, বন্যা এসে ঘরের চাল পর্যন্ত পানি উঠে যায়। ধান-চাল সব পচে গেছে। রাস্তাঘাটও সব নষ্ট হয়ে গেছে। এমনভাবে পানির ¯্রােত ছিল যে ঘরের কম্বলটা পর্যন্ত উঠাতে পারিনি। শাক-সবজি বিজতলা সব নষ্ট হয়ে গেছে।
জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এবারের বন্যায় জেলায় ১ হাজার ৮শত ৪০টি পরিবার বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে মোট ১ হাজার ৪শত ৩৯টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২ হাজার ৪শত ৯৩টি ঘর। এছাড়াও সরকারিভাবে বন্যায় পানিবন্দী মানুষের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৩শত ২৫ জনের তথ্য জানানো হয়।
জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাদু মিয়া জানান, বন্যায় যাদের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সরকারি তরফে ঢেউটিন সহায়তা দিতে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে ঢেউটিন বরাদ্ধের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
