ছবি: সংবাদ সারাবেলা।
‘কঠিন সময়ে দায়িত্ব পেয়েছি, তবে সবার সহযোগিতায় অতীতের মতোই আবার ঘুরে দাঁড়াবে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।’ পুনরায় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন ব্যাংকটির অন্যতম শীর্ষ উদ্যোক্তা পরিচালক বদিউর রহমান।
গত ১৬ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
২০০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেন আমলের চরম সংকটের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, অতীতেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক থাকা অবস্থায় তিনি সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে ব্যাংকটিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন।
সেই পুরোনো অভিজ্ঞতার আলোকেই ২০২৬ সালের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে গ্রাহক ও অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাংকটিকে পুনরায় স্বরূপে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নবনির্বাচিত এই চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ‘২০০৮ সালে প্রথমবার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, সবার সহযোগিতায় আমরা তখন সেই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ব্যাংকটিকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। এখন ২০২৬ সালে আবারও কঠিন এক সময়ে দায়িত্ব পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় অতীতের মতো এবারও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ, খুব দ্রুতই ব্যাংক স্বরূপে ফিরবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ, অডিট ও মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে প্রায় দুই বছর পর পুনরায় মূল উদ্যোক্তা পরিচালকদের নিয়ন্ত্রণে ফিরেছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা ও সম্পদের মান যাচাই করে কোনো গুরুতর অনিয়ম বা নেতিবাচক তথ্য না পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে গত তিন দশকে ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি-সহ সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোর পর্যালোচনায় ব্যাংকটির সম্পদ ক্ষয়, কোনো বড় বিনিয়োগ কেলেঙ্কারি বা একক কোনো গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার সত্যতা মেলেনি। বরং চরম প্রতিকূল পরিস্থিতেও ব্যাংকটি তারল্য সংকট এড়িয়ে গ্রাহকদের আমানত পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে গত ১৬ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নতুন পর্ষদ অনুমোদন দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পর্ষদ ভেঙে দেওয়া ১২টি ব্যাংকের মধ্যে কেবল আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকেই আবার পুরোনো উদ্যোক্তা পরিচালকদের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হলো।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। তাই পরীক্ষিত উদ্যোক্তাদের কাছে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্য যেসব ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, সেসব ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চিত্র ভিন্ন।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, গত ৩০ বছরে কারা ব্যাংকটির বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন এবং কারা বিভিন্ন সময় বিতর্কের বাইরে থেকে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়েছেন, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন সরকার আমলে পর্ষদ পরিচালনার ইতিহাস এবং কোনো উদ্যোক্তা পরিচালক অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হয়েছেন কি না, তাও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক কারণে পর্ষদে বড় ধরনের দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের নজিরও পাওয়া যায়নি। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অর্থায়নে এবং সাবেক সচিব এ জেড এম শামসুল আলমের উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে এই ব্যাংকটি যাত্রা শুরু করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, যারা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছেন, সংকটকালে দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছেন এবং ভবিষ্যতেও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, এমন উদ্যোক্তাদের নতুন পর্ষদে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকজন যোগ্য উদ্যোক্তাকে পর্ষদে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
প্রায় দুই বছর আগে এস আলম গ্রুপের সম্পৃক্ততার অভিযোগের প্রেক্ষিতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনোনীত পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালকের হাতে ব্যাংকটির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। তখন ধারণা করা হয়েছিল, অন্যান্য কয়েকটি আলোচিত ব্যাংকের মতো আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ভেতরে ভেতরে আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে পরবর্তী তদন্ত ও নিরীক্ষায় সে ধারণার পুরোপুরি সমর্থন মেলেনি।
ব্যাংকটির দাবি, সম্পদের গুণগত মানে বড় ধরনের অবনতি হয়নি। জালিয়াতি বা অনৈতিক উপায়ে বড় বিনিয়োগ কেলেঙ্কারির তথ্য পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কঠিন সময়ে ব্যাংক তারল্য সংকটে না পড়ে গ্রাহকের অর্থ পরিশোধ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে।
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম এক দশকের বেশি সময় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। বিশেষ করে ২০০৭ সালে খেলাপি বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সে সময়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নানান ব্যর্থতার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠলে ব্যাংকটিকে গভীর সংকট থেকে টেনে তোলার জন্য পদক্ষেপ নেয় ওয়ান-ইলেভেন সরকার। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় এবং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সে সময় উদ্যোক্তা পরিচালকদের সম্মতিতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বদিউর রহমান। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন আব্দুস সামাদ শেখ। পরবর্তী সময়ে একরামুল হক ও মো. হাবিবুর রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যাংকটির সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের নেতৃত্বে ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নেতৃত্বের সমন্বয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ, মুনাফা বৃদ্ধি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। মূলত এই এমডি-চেয়ারম্যানের জুটিই নতুনভাবে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মজবুত ভিত্তি গড়ার কাজ শুরু করেন।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে মুনাফার প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ২২ শতাংশ। দুই বছরের ব্যবধানে ২০০৯ সালে তা ইতিবাচক হয়ে ১৩ শতাংশে পৌঁছায়। ২০১১ সালে মুনাফা প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৩৪ শতাংশে। আর ২০১৬ সালে চেয়ারম্যান হিসেবে বদিউর রহমানের শেষ বছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ শতাংশ।
এই ৮ বছরে আমানত প্রায় সাত গুণ বেড়ে ২ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা থেকে ১৯ হাজার ৯৭০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। একই সময়ে বিনিয়োগ ২ হাজার ৯৭২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা। আমদানি ব্যবসা ৩ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা থেকে ১১ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা এবং রপ্তানি ব্যবসা ২ হাজার ১৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ৮১৫ কোটি টাকায় পৌঁছে। পাশাপাশি শাখার সংখ্যা ৫০ থেকে বেড়ে ১৪০-এ উন্নীত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত নতুন পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান হয়েছেন সেই পরীক্ষিত প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা পরিচালক বদিউর রহমান। নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যান করা হয়েছে ব্যাংকের দুই মেয়াদের সফল সাবেক চেয়ারম্যান ও কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম রহমানকে, যিনি বিজিএমইএ-র প্রথম সহ-সভাপতি হিসেবেও সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
এছাড়া প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে পর্ষদে ফিরেছেন, নাজমুল আহসান খালেদ, হাফেজ মো. এনায়েত উল্যা, আনোয়ার হোসেন (মোহাম্মদ হারুনের ছেলে), মোহাম্মদ আব্দুস সালাম (মীর আহমেদ সওদাগরের ছেলে), মো. রফিকুল ইসলাম (বাদশা মিয়ার ছেলে) এবং ইমাদুর রহমান (মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমানের ছেলে)।
নব-নির্বাচিত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ত্রিশ বছর আগে কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমানের আহ্বানে আমার বাবাসহ দেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নানা সংকটে তিনি ব্যাংকটির পাশে ছিলেন, আগলে রেখেছেন। নতুন এই চ্যালেঞ্জেও তার অভিভাবকত্বে এই ব্যাংকটি আবার নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা আশাবাদী।’
এস আলম সম্পৃক্ততার ব্যাপারে ব্যাংকের এক সাবেক পরিচালক বলেন, সাইফুল আলম (এস আলম) উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে ৩০ বছর আগে ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তবে পরিচালনা পর্ষদে সব সময় একাধিক শক্তিশালী উদ্যোক্তার উপস্থিতি ও শক্ত প্রতিনিধিত্ব থাকায় কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যাংকটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। সুশাসন ও পেশাদার নেতৃত্বের কারণে কিছু ঝুঁকি তৈরি হলেও ব্যাংকটি কখনো বড় ধরনের সংকটে পড়েনি।
তিনি জানান, ২০১৭ সালে এস আলমের ছোট ভাই আব্দুস সামাদ লাবু নেতৃত্বে এলেও পর্ষদে ভারসাম্য বজায় ছিল। তবে নতুন পরিচালনা পর্ষদে আব্দুস সামাদ লাবুকে আর ফেরানো হয়নি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
