× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

বুরো তলিয়ে যাওয়ার পর এবার কাওয়াদীঘি হাওরে পাউবোর অবহেলায় হাজারও হেক্টর আমন রোপন অনিশ্চিত

মো. আব্দুল কাইয়ুম, মৌলভীবাজার

১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪০ পিএম

মৌলভীবাজারের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাওয়াদিঘী হাওরে বিগত বোরো মৌসুমে ধান যখন পেকে গিয়েছিল এবং কৃষকরাও কাটা শুরু করেছিলেন তখনই বাধে বিপত্তি। প্রবল বৃষ্টি ও উজানের পানিতে তলিয়ে যায় শতশত কৃষকের স্বপ্ন। পানির নিচে পঁচে নষ্ট হয় ধান। এবারও একই ভাবে আমন রোপনের ভরা মৌসুমে এসেও টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কাউয়াদীঘি হাওরের পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এমন পরিস্থিতিতে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার একাটুনা ইউনিয়ন ও আখাইলকুড়া ইউনিয়ন সহ রাজনগর উপজেলার ফতেহপুর, উত্তরভাগ, মুন্সিবাজার, পাঁচগাঁও, রাজনগর ও মনসুরনগর ইউনিয়নের হাজারও হেক্টর আমন জমি তলিয়ে গেছে পানির নিচে। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওরের অসংখ্য মৎস্য খামার। বুরো ও আমন মৌসুমের এমন ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি হয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যান দুই উপজেলার শতশত প্রান্তিক কৃষক। 

১৯৮২ সালে  প্রান্তিক কৃষকদের ফসল আবাদ ও তা রক্ষায় মনু নদীর তীরে বাস্তবায়ন করা হয় মনু সেচ প্রকল্প নামে ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প। এতে একদিকে যেমন বোরো মৌসুমে মনু নদীর পানি ব্যাবহার করে ধান উৎপাদন করা যাবে, তেমনি প্রকল্প এলাকার বিশাল ধান ভান্ডার সেচের মাধ্যমে বন্যা থেকে রক্ষা করা যাবে। তবে সিন্ডিকেটের হাতে পড়ে ফসল রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি সম্প্রতি পরিণত হয়েছে কৃষকের সর্বনাশের হাতিয়ারে। কৃষকদের অভিযোগ, হাওরের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য কাশিমপুর পাম্প হাউস কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে পানি সেচ দিচ্ছেন না। গুঞ্জণ রয়েছে মৎস খামার ও জলমহাল ইজারাদারদের সুবিধা দেয়ারও। 

অভিযোগ রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাশিমপুর পাম্প হাউজ এর মাধ্যমে কাওয়াদিঘি হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প হাউজের ৮টি পাম্পের মধ্যে ৬টি পাম্প দিয়ে সেচ চালু রাখলেও ২৪ ঘন্টার অর্ধেক সময় পাম্প বন্ধ রাখছেন। ফলে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষায় হাওরে পানি কমার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছেনা। এছাড়াও খোদ কাশিমপুর পাম্প হাউজের যেসব পাম্প দিয়ে পানি সেচ হচ্ছে তার আশপাশেই কচুরিপনায় ঠাঁসা। যার কারণে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে পানি নিষ্কাশন। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে ভিন্ন তথ্য। 

পাউবো সূত্র বলছে, মনু সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউজের সেচ পাম্পগুলো চালাতে প্রতিদিন অন্তত ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। এই ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুত চাহিদার বিপরিতে দেড় মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুত সর্বরাহ করায় ঘাটতি দেখা দেয়ায় মাঝে মধ্যে বাধ্য হয়ে পাম্প বন্ধ রাখছে কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক বন্যার সময় ৮টি পাম্পের একটি পাম্প বন্ধ হলেও সেটি আর মেরামত করা হয়নি। ফলে ৬টি পাম্প দিয়ে সেচ চালু রাখছেন কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে হাওরে পানি রয়েছে ৮ পয়েন্ট ৫৭ মিটার। এর মধ্যে যতটুকু সেচ হচ্ছে তার থেকে বেশি পানি নদী থেকে হাওরে প্রবেশ করছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, পাম্প গুলো বন্ধ রাখতে হয় শুধু মাত্র বিদ্যুত ঘাটতির কারণে। কারণ একেকটা পাম্পের বিদ্যুতের ধারণ ক্ষমতা আছে ৩৫০ কিলোওয়াট। এই পরিমাণ বিদ্যুত না পেলে পাম্পগুলোর যে মটর রয়েছে সেগুলোর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবী বর্তমানে যে ৬টা পাম্প চালু আছে, এই ৬টা পাম্প ২৪ ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন চললে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মিলিমিটার পানি কমবে। তবে হাওরে পাম্প মাঝে মধ্যে বন্ধ রাখা হয় নির্দিষ্ট টেকনিক্যাল কারণে। বর্তমানে হাওরে পানির যে লেভেল রয়েছে সেটার জন্য এই পাম্প হাউজ যথেষ্ট না উল্লেখ করে পাউবো বলছে হাওরে পানি সেচের জন্য কতটুকু পাম্প লাগবে এটা সমীক্ষার বিষয় আছে। এই বিষয়টা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এখন হাওরে পানির পরিমাণ আনেক বেশি। বর্ষা মৌসুমে এই পাম্পগুলো দিয়ে পানি কমানো সম্ভব না। পানি কমাতে হলে আরও উচ্চ ক্ষমতার পাম্প বসাতে হবে।    

ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর মিয়া বলেন, বিদ্যুত না পেলে তারা কীভাবে পাম্প চালাবে। কারণ একদিনের বৃষ্টির পানি একসাপ্তাহ পাম্প চালিয়েও বিশাল আয়তনের এই হাওরের পানি কমানো সম্ভব নয়। 

কাশিমপুর গ্রামের কৃষক মমতাজ উল্লাহ বলেন, আমন রোপন করতে পারিনি পানি না কমার কারণে। এর আগে বন্যায় ৫ কিয়ার বুরো ধান তলিয়ে গেছে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার এর নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মুহাম্মদ ফয়জুল ইসলাম জানান, হাওরে পানির যে লেভেল রয়েছে সেটার জন্য এই পাম্প হাউজ যথেষ্ট না। এখন এই হাওরে পানি সেচের জন্য কতটুকু পাম্প লাগবে এটা সমীক্ষার বিষয়। এই বিষয়টা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এখন কর্তৃপক্ষ যেটা সিদ্ধান্ত দেন। বর্ষা মৌসুমে এই পাম্পগুলো দিয়ে পানি আসলে কমানো সম্ভব না। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর কাওয়াদিঘি হাওরে আমনের চাষাবাদ হয়েছিল প্রায় ৫০০ হেক্টর, যার বাজার মূল্য প্রায় ৭ কোটি ৮ লক্ষ টাকা। এবছর কাওয়াদিঘী হাওরে আনুমানিক ৬০০-৭০০হেক্টর জমিতে আমন চাষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও জমি গুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় চাষাবাদ অনিশ্চিত। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই পরিসংখ্যানের বিপরিতে বাস্তবে হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।    

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর উপ-পরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, এ বছর বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় এবং কাশিমপুর সেচ পাম্পের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা দেখা দিয়েছে, ফলে আমন চাষাবাদ কম হবে। 

এ দিকে হাওরের জলাবদ্ধতা দূর করার দাবিতে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ১১ আগস্ট বিকালে হাওর রক্ষা আন্দোলন এর প্রতিনিধি দল পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠক করতে বিষয়টি সমাধানে কাশিমপুর পাম্প হাউজ পরিদর্শন করেন। সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোঃ সাইফুল ইসলাম এর সাথে বৈঠক হয় তাদের। সিদ্ধান্ত হয়, এখন থেকে ২৪ ঘন্টাই পাম্প চলবে এবং যতটুকু সম্ভব পানির লেভেলটা বর্তমানে যেভাবে আছে তা থেকে ২ ফুট কমানোর। সেই ২ফুটের আলোকে বিদ্যুৎ প্রাপ্তি স্বাপেক্ষে পাম্প ২৪ ঘন্টা চলবে বলে নিশ্চিত করেন পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতিনিধি। সেই সাথে সিদ্ধান্ত হয় যে নদীর পানি যখন নেমে যাবে তখন পাম্প হাউজের রেগুলেটরগুলো খুলে দেয়া হবে। তাতে পাম্প হাউজ দিয়ে যতটুকু পানি বের হয় তার থেকে কয়েকগুণ পানি অতি দ্রুত নিষ্কাশন হবে। ওই সিদ্ধান্তের পুরো বিষয়টি নজদারি করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব লোকবল এর পাশাপাশি হাওর রক্ষা আন্দোলন তাদের দুজন প্রতিনিধি পাম্প হাউজে ২৪ ঘন্টা অবস্থান করবেন এবং তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করবে কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্তও হয় ওই বৈঠকে। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাশিমপুর পাম্প হাউজে ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কিন্তু জ¦ালানি সঙ্কটের কারণে দেখা যায় যে আমাদের ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে পারতনা। সে হিসেবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও জেলা প্রশাসক এর সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় আড়াই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সর্বরাহের জন্য। ওই সিদ্ধান্তের পর ৮ আগস্ট থেকে আড়াই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সর্বরাহ করা হচ্ছে এবং ৬টা পাম্প ২৪ ঘন্টা নিয়মিত চলছে।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.