ফেনীতে অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ দাফন ও ব্যবস্থাপনায় চরম অবহেলা এবং অব্যবস্থাপনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বেওয়ারিশ মরদেহ বহনে এ্যাম্বুলেন্সের বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে পৌরসভার ময়লা ফেলার গাড়ি। একই সঙ্গে ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী গোসল ও জানাজার তোয়াক্কা না করেই সম্পন্ন করা হচ্ছে দাফনকাজ। পরিচয়হীন এসব মানুষের শেষ বিদায়ের এমন অমানবিক ও চরম অবহেলাজনিত দৃশ্যে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করে তুলেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে অজ্ঞাত মরদেহগুলো দাফনের জন্য ফেনী পৌরসভার তত্ত্বাবধানে শহরের সুলতানপুরে অবস্থিত 'ফেনী পৌর কবরস্থানে' নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, উপযুক্ত যানবাহনের পরিবর্তে এসব লাশ ময়লাবাহী ট্রাকে করে আনা হয়। কবরস্থানে আনার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মরদেহগুলোকে ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী গোসল করানো কিংবা জানাজার নামাজ আদায় করা হয় না। এখানেই শেষ নয়, স্থান সংকুলানের অজুহাতে মাত্র ৫-৬ মাসের ব্যবধানে একই কবরে একাধিক মরদেহ দাফনের ঘটনাও ঘটছে অহরহ।
সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়,ঐতিহ্যবাহী এই কবরস্থানটিতে ন্যূনতম পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষার কোনো পরিবেশ নেই। লাশ গোসলের জন্য পানি তোলার মোটর না থাকায় পুকুরের নোংরা পানি ব্যবহার করতে হয়। গ্রীষ্মকালে ওই পুকুর শুকিয়ে গেলে তৈরি হয় চরম বিপত্তি। এছাড়া পুরো এলাকা জুড়ে নেই কোনো সীমানা প্রাচীর কিংবা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। ফলে দিনেদুপুরে গরু-ছাগল অবাধে বিচরণ করে এবং সন্ধ্যার পর অন্ধকার নেমে এলে পুরো স্থানটি মাদকসেবী ও জুয়াড়িদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের উদ্যোগে 'মুসলিম কবরগাহ' নামে এই গোরস্থানটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথের দূর্ঘটনাসহ নানা কারণে ফেনীতে নিহত বেওয়ারিশ মরদেহের প্রধান ঠিকানা এই কবরস্থান। ২০০৫ সালে তৎকালীন পৌর মেয়র নুরুল আবছারের উদ্যোগে 'বিটুপিকা' নামের একটি সবুজায়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। সে সময় পুকুরের দৃষ্টিনন্দন ঘাট ও দর্শনার্থীদের বসার জায়গা তৈরি করা হলেও দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে সেগুলো ধ্বংসপ্রায় ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে বা জিয়ারত করতে আসা মানুষজন কোনো সুস্থ পরিবেশ পান না।
স্থানীয় বাসিন্দারা আক্ষেপ করে জানান, "বেওয়ারিশ হলেও এই মানুষগুলো কারো না কারো সন্তান বা স্বজন। তাই অজ্ঞাত মরদেহ পরিবহনে ময়লার গাড়ির অবমাননাকর ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করে মর্যাদাপূর্ণ এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে দাফনের আগে গোসল ও জানাজার মতো ধর্মীয় ও মানবিক আনুষ্ঠানিকতাগুলো সঠিকভাবে নিশ্চিত করা জরুরি।"
স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, পৌরসভা যদি একার পক্ষে না পারে তাহলে সরকারী-বেসরকারি আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের বলুক। তবুও এই কাজের সামগ্রিক একটা সুন্দর সুষ্ঠ ব্যবস্থা হোক।
জামাল হোসেন নামের স্থানীয় এক যুবক জানান,পৌর কবরস্থান এলাকাটি সন্ধ্যা হলেই মাদক ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যায়। পাশের পরিত্যাক্ত সার কারখানাতে বসেই মাদক সেবন করে তারা। প্রশাসনকেও এ বিষয়ে নির্বাক দেখা যায়।
এ বিষয়ে কবরস্থানের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা ফেনী পৌরসভা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সীমিত সামর্থ্য ও বাজেটের মধ্যেই তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের তথ্যমতে, প্রতি বছর এখানে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন অজ্ঞাত মানুষের লাশ দাফন করা হয়। তবে ভবিষ্যতে এই ঐতিহাসিক কবরস্থানটির অবকাঠামো ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নে বড় ধরণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তারা।
এ কাজের দায়িত্বে থাকা পৌরসভার আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা: কৃষ্ণপদ সাহা বলেন, অজ্ঞাত মৃতদেহ বহনের জন্য তাদের কোন গাড়ি আলাদা নেই। তাই যেটি আছে সেটি দিয়েই কাজ করা হচ্ছে।
গোরস্থানের সীমানা প্রাচীর ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, পৌর সভার পরিকল্পনা রয়েছে। গোরস্থানটির উন্নয়নে পরিকল্পনা হাতে আছে। মৃতদেহ পরিবহনের জন্য আলাদা গাড়ির জন্যও চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ নিয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও ফেনী পৌরসভার প্রশাসক মো: দিদারুল আলম জানান, মুসলিম রীতি অনুযায়ী গোসল, জানাযা ছাড়া লাশ দাফনের বিষয়টি আমাকে ব্যাথিত করেছে। আমি বিষয়টি পৌরসভার সংশ্লিষ্টদের সাথে মিটিং করে নির্দেশ দিয়েছি যাতে এমনটি আর না করা হয়। আর ময়লার গাড়ির পরিবর্তে একটি এ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী গাড়ি যাতে দেয়া হয় এ বিষয়ে আমি স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে অর্থ বরাদ্দ হলে গাড়ির সমস্যা দূর হবে আশা করছি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
