একের পর এক সমালোচনার ঝড় লেগেই আছে শিক্ষা বোর্ডের বেশকিছু কর্মকান্ডের সাথে। মাস দুয়েক আগে নানামূখী আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় তুলেছিলো ৬০ জন কর্মচারির স্থায়ী নিয়োগ নিয়ে। উক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অবৈধ ও নিয়োগ বাণিজ্য হিসেবে ট্রিট করে সৃষ্টি হয়েছিল সমালোচনার ঝড়। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছিল প্রতিবেদন। সেই গরম ঝড়ের তীব্রতা কিছুটা কমতে শুরু করলেও চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে নতুন করে আবারো আলোচনায় আসে শিক্ষা বোর্ড। এবারের বিষয় ক্যাজুয়াল ওয়ার্কার (মজুরি ভিত্তিক কর্মচারি)। পূর্বের ক্যাজুয়াল ওয়ার্কারদের চাকুরি স্থায়ীকরণের পর নতুন করে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে লোকবল নেয়ার বিষয়টি নিয়ে একটি চক্র আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে জানায় বোর্ড সূত্র। যদিওবা শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট শাখা ও সর্বোচ্চ কর্তা-ব্যক্তিরা এই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি তাঁদের।
দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে লোকবল নিয়োগের চাইতে স্থায়ীভাবে লোকবল নিয়োগের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি কর্মরতদের। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে শিক্ষা বোর্ড থেকে অবসরে যাবেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারি। তাই শিক্ষা বোর্ডের দাপ্তরিক কাজের গতিশীলতা ধরে রাখতে স্থায়ী নিয়োগের কোন বিকল্প নেই বলে স্বীকার করেন সংস্থাপন শাখায় কর্মরতরা।
সর্বশেষ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটি চক্র নিজস্ব স্বজন ও প্রার্থীদেরকে চাকুরি দিয়ে অনৈতিক পন্থায় পকেট ভারি করেছেন বলেও আছে সমালোচনার ঝড়। ঐ চক্রটির একাধিক সদস্য আবারো মাথাচারা দিয়েছে চুক্তিভিত্তিক ক্যাজুয়াল নিয়োগের বিষয়ে বলে দাবি কর্মরতদের।
নতুন করে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেবার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে শিক্ষা বোর্ডের পুরাতন ভবনের নিচ তলার একটি কার্যালয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে হয়েছে হট্টগোল। সেই হট্টগোলের কারণ হিসেবে প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মরতরা বলছেন, নিয়োগ নিয়ে যে যার স্থান থেকে প্রার্থীর পাল্লা ভারি করতে চাচ্ছেন। ঠিক যেমনটা হয়েছিল সর্বশেষ স্থায়ীকরণ নিয়োগের ক্ষেত্রে। কখনো স্থায়ীকরণ আবার কখনোবা নতুন করে ক্যাজুয়াল ওয়ার্কার নিয়োগের বিষয়ে কয়েকমাস ধরেই সরগরম রয়েছে শিক্ষা বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি। সংস্থাপন শাখার একজন কর্মকর্তা সর্বশেষ দিয়েছিলেন ছয়জন চাকরিপ্রার্থির ফর্দ। গেলবার সেই কর্মকর্তার আশাও হয়েছে পূর্ণ। পূর্বের ধারাবাহিকতায় তিনি আবারো দাবি তোলেন ক্যাজুয়াল ভিত্তিক নিয়োগ তার যেনো ৫/৬ জন প্রার্থীকে চাকুরি দেয়া হয়। আর এই অনৈতিক দাবি নিয়েই শুরু হয় বাকবিতন্ডা ও হট্টগোল।
একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডের সেই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে নতুন করে জন্ম নিলো আরো একটি ঘটনা। এবার আর চাকুরি নয়; এবারের বিষয়টি ছিল সর্বোচ্চ স্পর্শকাতর। মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা ও ফলাফল পুণঃনিরীক্ষণের জন্য দ্বিতীয় দফায় ২৭ জন শিক্ষকের গভীর রাত পর্যন্ত শিক্ষা বোর্ডে অবস্থান করার বিষয়টি বোর্ডের ইতিহাসে এইপ্রথম বলে দাবি কর্মরতদের। আর সেটি নিয়েই শুরু হয়েছিল হোইচোই। বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, ঐদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শিক্ষা বোর্ডের অভ্যন্তরে পুনঃনিরীক্ষণের কাজ শেষ করে শিক্ষকরা শিক্ষা বোর্ড ত্যাগ করেন। শিক্ষকদের প্রস্থানের কয়েক ঘন্টা পর তাঁদেরকে পুণরায় ডেকে আনা হয় শিক্ষা বোর্ডে। ঐসময় শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান ও সচিবের অনুপস্থিতিতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের পরিচালনায় গভীর রাত পর্যন্ত ২৭ জন শিক্ষক সমাপ্ত হওয়া কাজ নিয়ে আবারো ব্যস্ত থাকেন। গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হবার পর শিক্ষা বোর্ড চত্বরে অবস্থান নিলেও প্রধান ফটকের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা কাউকেই ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। পরবর্তীতে মধ্যরাতের পর ভেতরে অবস্থান করা শিক্ষকরা একে একে বাইরে আসলেও গণমাধ্যমকর্মীদের কোন প্রশ্নের সদুত্তর দেয়নি।
প্রশ্নবিদ্ধ এই কর্মকান্ডের বিষয়ে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ফলাফল পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে শিক্ষকদের ডাকা হয়নি। পুনঃনিরীক্ষণের পর বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে প্রত্যাশার তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী ফেল করায় বিষয় দুটি আবার যাচাই করা হয়েছে। তিনি বলেন, পুনঃনিরীক্ষণের ফল নিয়ে কিছু অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়ায় বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দিয়ে পুণরায় যাচাই করা হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করার প্রয়োজন থাকায় রাতে শিক্ষকদের বোর্ডে ডেকে আনা হয়েছে।
রাত প্রায় একটা অবদি শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষকদের অবস্থান ও কর্মকর্তাদের অসামঞ্জস্যতুল্য বক্তব্যের পেছনে বড় রকমের কোন ষড়যন্ত্র ও ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির গন্ধ পাচ্ছেন বলে মন্তব্য সচেতন মহলের। শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসে এমন ধরনের ঘটনার তেমন কোন নজির নেই বলেও জানান কর্মরতরা।
শিক্ষা বোর্ডের সেই প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ড বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনলাইন পোর্টাল, মাল্টিমিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হবার পরেরদিন ৯ সেপ্টেম্বর রাত আটটার পরে বোর্ডের জনসংযোগ শাখা থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি বিভিন্ন গণমাধ্যমে মেইল করা হয়। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক স্বাক্ষরিত সেই পত্রে বলা হয়, "সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে পুনঃনিরীক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি বোর্ড কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হবার কারনসহ নির্ধারিত সময়ের বাধ্যবাধকতা থাকায় এবং আবেদনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অধিক হওয়ায় ও শিক্ষাবর্ষের কথা চিন্তা করে পরীক্ষা সংক্রান্ত, উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণ বা জরুরি প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রয়োজনবোধে অফিস সময়ের পরেও অব্যাহত রাখা বোর্ডের একটি নিয়মিত ও রুটিন কাজের অংশ। তাই, ৮ সেপ্টেম্বর রাতে শিক্ষা বোর্ডে ২৭ জন শিক্ষকের অবস্থান ও কার্যক্রমকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানানো হলো।
২৭ জন শিক্ষকের গভীর রাত পর্যন্ত শিক্ষা বোর্ডে অবস্থান ও বোর্ড কর্তৃক প্রেরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বোর্ডে কর্মরতদের অনেকেই বলেন, ‘আগেরদিন প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকান্ডের পরেরদিন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের প্রেসবিজ্ঞপ্তির বিষয়টি বেশ মনগড়া। প্রেস বিজ্ঞপ্তিকে ঢাল করে গভীর রাত অবদি শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষকদের রাত্রিকালিন অবস্থানের বিষয়টিকে স্বাভাবিক ও রুটিন মাফিক কাজ বলে ধাঁমাচাঁপা দেয়ার বিষয়টিকে অপরাধ প্রবণতাকে উস্কে দেয়ার সামিল বলেই মনে করছেন অনেকেই। খাতা ও ফলাফল পুণর্নিরীক্ষণের বিষয়ে এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসে নেই বললেই চলে বলে জানান কর্মরতরা। বিষয়টির স্বচ্ছতা থাকলে শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষা বোর্ডে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা, সচিব ও চেয়ারম্যান স্বশরীরে শিক্ষা বোর্ডে উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু সেটি হয়নি। লোকচক্ষুর আড়ালে এই ধরণের কাজ কাম্য নয় বলে মন্তব্য অনেকের। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কর্তৃক স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিকে অনেকেই বলছেন "শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা' করেছে কর্তৃপক্ষ।
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
