রাজশাহী মহনগরীর বড়কুঠি এলাকায় পদ্মা নদীর খেয়াঘাটে দুর্গম চরাঞ্চলের মৎসজীবী বা জেলেদের সাথে প্রায় প্রতিনিয়তই মাশুল আদায়কারীদের সাথে সৃষ্টি হচ্ছে হট্রগোলের। ইজারাদারের লোকজন জেলেদের কাছ থেকে ব্যাক বা থলে প্রতি জোড়পূর্বক হাতিয়ে নিচ্ছেন অতিরিক্ত অর্থ বলেও অভিযোগ তাদের। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজনকে শারীরিকভাবেও করা হয়েছে লাঞ্চিত; অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে রোষানলে পরে হতে হচ্ছে লাঞ্চিত বলে অভিযোগ জেলেদের। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার কারনেই ইজারাদার ও মৎসজীবী সহ কৃষকরাও পরেছেন বেশ বেকায়দায়। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে, নানামূখী চাঁপে কোন উপায়ন্তর না দেখে রাসিক কর্তৃপক্ষ খেয়াঘাট স্থলে বসিয়েছেন বড় আকৃতির একটি মাশুল আদায়ের তালিকা। কিন্তু বাজিমাত হয়েছে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের পরিবর্তে রাসিক কর্তৃপক্ষ সেখানে বসিয়েছেন ১৪২৩ সালের পুরাতন একটি সাইনবোর্ড। দশ বছর আগের সেই মেয়াদোত্তীর্ণ সাইনবোর্ডটি আজ কলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে ইজারাদার ও মৎসজীবিদের মাঝে।
ছোটখাটো জেলেদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ইজারাদারের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে পদ্মার ওপারের চর খানপুর ও চর মাজারদিয়ার দরিদ্র মৎস্যজীবীদের কাছ থেকে সামান্য পরিমাণ মাছের বিপরীতে জোড়পূর্বক নেয়া হচ্ছে অতিরিক্ত মাশুল। তাদের দাবি, নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় কয়েক ঘণ্টা পরিশ্রম করে আধা কেজি থেকে সর্বোচ্চ এক-দুই কেজি মাছ নদী থেকে ধরে শহরের সাহেব বাজার সহ অন্যান্য বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে ঘাটে নামার পরেই রোষানলে পরতে হয় ইজারাদারের লোকজনের কাছে। চর থেকে আসা জেলে আলিফ, আমিরুল, মোজাহার, বাক্কার, সামাল সহ অন্যরা অভিযোগ করে বলেন, ব্যাগ বা থলে প্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত ইজারাদারের লোকজন জোড়পূর্বক আদায় করেন। কিছু বলতে গেলেই জেলেদের উপর ক্ষিপ্ততা দেখানোর পাশাপাশি চলে ব্যবসা বন্ধ করে দেবার মতো ভয়ভীতি প্রদর্শন। আধাঁ কেজি কিংবা এক-দুই কেজি ওজনের সামান্য মাছ বিক্রির জন্য ঘাটে নামার সাথে সাথেই ব্যাগ বা থলে প্রতি ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা করে ইজারাদারকে দেয়া লাগে। এর উপর আছে নদী পাড়াপাড়ের জন্য আলাদাভাবে দশ টাকা নৌকা ভাড়া। এছাড়াও আছে বাজার পর্যন্ত যাওয়া আসার খরচ। সবমিলিয়ে মাছ বিক্রি করে বাড়ি ফেরার পর সংসারের জন্য বাজারঘাট করার অর্থও পকেটে থাকেনা অনেকের। হাতে যদি আধা কেজি করে দুই ব্যাগে বা থলেতে দুই ধরনের মাছ থাকে; তাহলে দুই থলের জন্য আলাদা আলাদাভাবে ইজারাদারকে মাশুল দিতে হয় সর্বনিম্ন ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত। একজন জেলে ছোট ছোট দুই তিনটা থলেতে করে সর্বসাকুল্যে এক দেড় কেজি মাছ নদী থেকে আহরণ করে শহরের বাজারে বিক্রি করতে চাইলে প্রথমেই তাকে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে মাশুলের মাধ্যমে ইজারাদারকে প্রদেয় অর্থ দিয়ে। সুনির্দিষ্ট কোন নিয়মনীতি ও মাশুল আদায়ে হারের তালিকা বা নির্দেশিকা না থাকার কারণে প্রতিনিয়তই হট্টগোল বাঁধছে সেবাগ্রহীতা ও প্রদানকারির মধ্যে।
ইজারাদারের ইচ্ছেমতো মাশুল আদায়ের প্রতিবাদে গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভুক্তভোগী শ্রমজীবী জেলেরা বড়কুঠি খেয়াঘাটে মানববন্ধনের প্রস্তুতি নিলে ইজারাদারের লোকজন তাদের বাঁধা প্রদান করেন। সেখানে উপস্থিত থাকা প্রায় শ’খানেক স্থানীয় পর্যটক ও সাংবাদিকদের সামনেই জেলেদেরকে ইজারাদারের লোকজন হুমকি-ধমকি ও হেনস্থা করেন। এক পর্যায়ে দু’পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হলে উপস্থিত সাংবাদিক ও অন্যান্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। মানববন্ধন করতে আসা জেলে আলিফ, আমিরুল, মোজাহার, বাক্কার, সামালসহ প্রায় ৫০ জন জেলে এই অতিরিক্ত মাশুল আদায়ের বিরুদ্ধে জোড়প্রতিবাদ করেন।
মৎসজীবী ও জেলেদের সাথে মাশুল নিয়ে প্রায় প্রতিনিয়তই হট্টগোল ও ঝামেলা সৃষ্টি হবার কারণ জানতে চাইলে, ঘাটের মাশুল আদায়ের দায়িত্বে থাকা ইজাদারের প্রতিনিধি সেরাজুল ইসলাম ওরফে সেরআলী বলেন, বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষকে অবগত করলে রাসিক থেকে কিছু লোকজন এসে “দশ বছর আগে এই ঘাটে মাশুল আদায়ের হার সম্বলিত যে সাইনবোর্ড স্থাপন করে গিয়েছিলে, সেই তালিকা সম্বলিত সাইনবোর্ডটি তারা পুণরায় স্থাপন করে গেছেন। ঘাট ইজারা প্রদানের বিপরীতে ট্যাক্স-ভ্যাট ও অন্যান্য খরচ মিলে প্রায় ১৭/১৮ লাখ টাকা ইজারাদারকে পরিশোধ করতে হয়েছে। যেটা পূর্বের যে কোন সময়ের প্রদেয় অর্থের চাইতে অনেক বেশি। তাই, দশবছর আগের হিসেবানুযায়ী দশবছর পরে একই হারে মাশুল আদায় করলে যেকোন ইজারাদারকে; তার বিনিয়োগের বিপরীতে লোকসান গুণতে হবে। কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে নির্দিষ্ট হারে আদায়ের লক্ষে নতুন করে একটি মাশুল আদায়ের হার সম্বলিত সাইনবোর্ড লাগানোর অনুমিত দিলে বিষয়টি নিয়ে সৃষ্ট ঝামেলার সমাপ্তি ঘটতো বলে জানান ঘাটে কর্মরতরা। সিটি কর্পোরেশন আমাদের টোল আদায়ের বিষয়ে নতুন কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। ফলে পুরোনো তালিকা নিয়ে ইজারাদার ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। সেরআলীর কথার সত্যতাও মেলে ঘাটের উত্তর-পশ্চিম কোণে স্থাপন করা সিটি কর্পোরেশনের সেই সাইন বোর্ডের উপস্থিতি দেখে।
রাসিক কর্তৃক স্থাপিত ‘ফেরীঘাট মাশুল আদায়ের হারের তালিকা’ নামের বিশালাকার সেই সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লিখা আছে ‘এটি বাংলা ১৪২৩ সন হতে কার্যকরী হবে’। সেখানে আলাদা আলাদা ভাবে উল্লেখ আছে, যেসকল দফায় মাশুল নেয়া হবে। সর্বমোট ৪২ ধরনের দফার বিপরীতে অর্থ্যাৎ সেবার বিপরীতে এই ফেরীঘাট থেকে নির্ধারীত হারে মাশুল আদায় করবেন ঘাটের ইজারাদার। সেই ৪২টি দফার মধ্যে ২২ নম্বর দফায় বলা হয়েছে খালি মাল বস্তা প্রতি মাশুল আদায়ের হারের কথা। ১৪২৩ বঙ্গাব্দে ইজারার নিয়মানুযায়ী প্রতি বস্তার বিপরীতে ইজারাদার মাশুল আদায় করবেন ছয় টাকা। অন্যদিকে, এক মণ বা সমতুল্য কোন মালামাল সহ বস্তার মাশুল হার আদায় হবে সাত টাকা করে। যেটি ঐ তালিকার ২৩ নম্বর সিরিয়ালে উল্লেখ করা আছে। দশবছর পর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে এসে নতুন করে এই খেয়াঘাটটি ইজারা দেবার পর কর্তৃপক্ষ মাশুল আদায়ের হার সম্বলিত কোন তালিকা বা সাইনবোর্ড ঘাটের পাশে স্থাপন করেননি। ইজারাদারের পার্টনার শান্তর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, ইজারা নেয়ার পর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আপনাদেরকে কোন কাগজীয় তালিকা বা কাগজে কলমে কোন মাশুল আদায়ের হারের তালিকা দিয়েছে কিনা? প্রতুত্তরে তিনি বলেন, না; এমন কোন তালিকা কাগজে কলমে আমাদেরকে দেয়া হয়নি।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালে মো. নুর-ঈ সাইদ বলেন, “খেয়াঘাট ইজারার বিষয়টি মূলত সিটি করপোরেশনের প্রশাসন শাখা থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। ইজারা সংক্রান্ত বিষয়গুলো তারাই মনিটরিং করে থাকে। তবে নির্ধারিত তালিকার বাইরে অতিরিক্ত টোল আদায় বা অন্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
