ছবি: সংগৃহীত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন, স্টেকহোল্ডারসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বৈঠকে চলমান বিদ্যুৎসংকটের সমাধান মিলতে পারে। অংশীজনেরা বলেছেন, এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পুরোপুরি সমাধান না হলেও আলোচনার ভিত্তিতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা আছে।
ব্যবসায়ী মহল এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সমস্যা সমাধানে গাইডলাইন প্রত্যাশা করছে। আর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমস্যা সমাধানে এ মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সরকারের আলোচনায় বসা বেশ জরুরি। গতকাল সকালে জাতীয় সংসদে অধিবেশনের আগে সরকারি দলের সদস্যদের নিয়ে বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ে বেশ কিছু গাইডলাইন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।বিদ্যুৎসংকট সমাধানে স্টেকহোল্ডার, শিল্প খাতের ব্যবসায়ী এবং বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রর মালিকরা বেশ কিছু সুপারিশও করেছেন। এগুলো হলো দ্রুত বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলারের চার্জের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থাপনায় রুফটপ সোলার বসাতে হবে। আর এলএনজির তুলনায় তেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ৫ থেকে ৬ শতাংশ কম বিধায় আপাতত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে চালাতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল দুপুরে বলেন, তেল দিয়ে দ্রুত এ মুহূর্তে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও সমস্যা হচ্ছে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো টানা ৪-৫ ঘণ্টা চালানো যায় না। এগুলোয় এরপর কিছুটা বিরতি দিতে হয়। এজন্য এ মুহূর্তে সোলার রুফটপ স্থাপন করাই হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুত সমাধান। বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন সব স্থাপনার রুফটপে সোলার বসিয়ে অবস্থা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে ডলার দিয়ে জ্বালানি আমদানি করতে হয় না। এটি স্থাপন করে গ্রিডে দিলেই হলো। সরকার এরই মধ্যে ব্যবসায়ীসহ অংশীজনদের নিয়ে সংকট সমাধানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই মধ্যে সব মহলের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে। এ ছাড়া সরকারদলীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিবিড় যোগাযোগ আছে। তাঁদের থেকেও বিভিন্ন সময় পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালিয়ে গ্যাসশিল্প খাতে দেওয়া হচ্ছে।
পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গতকাল বলেন, ‘বিদ্যুৎসংকট সমাধানের জন্য আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদকে পাশে রেখে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলতে চাই। এ ব্যাপারে আমাদের করণীয় বিষয়ে তাঁদের গাইডলাইন ও পরামর্শ চাই। আশা করছি প্রধানমন্ত্রী জ্বালানিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট যাঁরা এর সঙ্গে জড়িত তাঁদের নিয়ে আমাদের গাইডলাইন দেবেন। এটা আমরা প্রত্যাশা করছি। এ মুহূর্তে সংকট কাটাতে অবশ্যই সরকার সচেষ্ট এবং কাজ করছে। কাজটা কীভাবে করছে এবং কত দিনের মধ্যে কী পরিস্থিতিতে যাবে এ বিষয়টি জানা দরকার। এটি জানতে পারলে আমাদের কর্মপরিকল্পনা ও শিল্পের কাজগুলো সেভাবেই সাজিয়ে নিতে পারব। এদিকে আমাদের ক্রেতাদের যে শিপমেন্ট ডেটগুলো ধরতে পারিনি সেগুলো কবে এবং কীভাবে দেব তা জানিয়ে সময় নিতে হচ্ছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি কবে এবং কীভাবে ঠিক হবে এ বিষয়ে পরিপূর্ণ গাইডলাইন সরকারের কাছ থেকে চাই।’
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘এলএনজি আমদানি এখন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। যদিও এ মুহূর্তে এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়ার কাজ সরকার শুরু করেছে। সংকট কাটাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। আর কিছু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে সেই গ্যাস শিল্প খাতে দিতে হবে। সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে বৈঠক করছেন। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি।’
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘এ মুহূর্তে সংকট সমাধানে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া অন্য বিকল্প নেই। আমরা জানতে পেরেছি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবকটি উৎপাদনে ছিল না। এখানে কিছু বকেয়া টাকার ব্যাপার থাকতে পারে। তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ যদি পরিমাণে আরও বেশি অপারেশনে আনা যায় তাহলে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এখানে সরকার কতটা করতে পারবে এটি তার অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। এ সংকটের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অবগত আছেন। এ মুহূর্তে দেশের এক নম্বর সমস্যা হচ্ছে জ্বালানি সরবরাহ। আমরাও প্রতিদিন বিষয়টি বলছি। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হতেই পারে। এরই মধ্যে সরকারও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এ উদ্যোগে কাজ হয় কি না দেখতে চাই। আর তা না হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমরা দেখা করার চেষ্টা করব।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকে সরে এসে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। নতুন করে এলএনজি টার্মিনাল তৈরি কিংবা গ্যাস আমদানির মাধ্যমে বর্তমান সংকট সমাধান করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় থাকা অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বিশেষ কওে যেসব স্থানে বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলারে চার্জ দেওয়া হয়, সেখানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের লাইনগুলো বিচ্ছিন্ন করা জরুরি। একই সঙ্গে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র টেংরাটিলাসহ যেসব ক্ষেত্র থেকে দ্রুত গ্যাস উত্তোলন সম্ভব, সেসব জায়গা থেকে গ্যাস নিয়ে দ্রুত গ্রিডে যুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। ভোলার গ্যাসকূপগুলো দ্রুত খনন কওে সেখান থেকেও গ্যাস নেওয়ার কাজ এগিয়ে নিতে হবে।’ এতে তাৎক্ষণিকভাবে বর্তমান সংকটের সমাধান সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে বৈঠক করলে সংকটের সমাধান সম্ভব কি না-এমন প্রশ্নে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, স্টেকহোল্ডাররা যাঁর যাঁর মতো চিন্তা করেন। দেশের ভিতরে ও বাইরে বিভিন্ন লবি গ্রুপের চাপও রয়েছে। এসব লবি গ্রুপের স্বার্থের বাইরে গিয়ে স্টেকহোল্ডাররা সবাই একমত না-ও হতে পারেন। তবে সরকারকে সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসা জরুরি। অন্তত স্টেকহোল্ডাররা কী বলছেন, তা সরকার শুনতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফাঁদে সরকার যেন পা না দেয় সেটি দেখতে হবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
