× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

চীনের কিছু স্মৃতি, কিছু কথা

ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো

০৫ অক্টোবর ২০২২, ১১:৩৬ এএম । আপডেটঃ ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১২:৪২ পিএম

আমার জীবনের সব শ্রম আর সাধনার বিনিময়ে গড়ে তোলা মোনঘর ও বনফুল চিলড্রেন হোমসের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব নির্ধারিত কমিটির হাতে স্থানান্তর করে রাঙামাটির আনন্দবিহারে অবসর জীবনযাপন করতে চলে গেলাম। তখন আমার জীবন কাটছিল জীবনের নিয়মেই। সময়টা ১৯৯৭ সালের প্রথমদিকে। সেই নিস্তরঙ্গ সময়ে অগ্রজ ভদন্ত বিমল তিষ্য মহাথেরো আমাকে এক নতুন ঠিকানার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। মূলত ভদন্ত বিমল তিষ্য মহাথেরোর হাত ধরেই পরিচিত হলাম চীনের মহাচার্য মাস্টার শিং ইউন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত বুদ্ধ’স লাইট ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলআইএ) সঙ্গে। এ পরিচয় আমার জীবনযাত্রায় এক নতুন পথের সূচনা হলো। আজকের এ ভ্রমণকথা বাংলাদেশ থেকে সুদূর চীনে অবস্থিত বিএলআইএর সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বৌদ্ধদের তৃতীয় সভা ঘিরে।

৯ অক্টোবর ২০১৩ সাল। সময়: রাত ১০.০০ ঘটিকা। ঢাকা শাহ্জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর হতে ড্রাগন এয়ার যোগে হংকং রওয়ানা হলাম। ঘন্টা খানেক চলার পর বিমানটি নেপালের কাঠমন্ডুতে অবস্থিত ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণ করলো। যাত্রী উঠা নামার পর বিমানটি নেপালের আকাশ পেরিয়ে হংকংয়ের উদ্দেশে রওনা দিল। পরদিন স্থানীয় সময় সকাল ৭.০০টায় আমাদের বিমান চেক ল্যাপ কক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের মাধ্যমে হংকংয়ের মাটি স্পর্শ করে। বিএলআইএ’র হংকং চ্যাপ্টার থেকে আমাদের নিতে এসেছে। আমি আমাদের বললাম এ জন্য যে, এ যাত্রায় আমি ছাড়াও ভারত, নেপাল ও শ্রীলংকার প্রতিনিধিরা আছেন যাদের সবার গন্তব্য একই। বিমানবন্দরের যাবতীয় নিয়মনীতি শেষে অপেক্ষমান বাসটি আমাদের নিয়ে চলল সম্মেলন স্থলের কাছাকাছি একটি হোটেলে। এখান থেকে বেলা তিনটা নাগাদ পৌঁছলাম বিএলআইএ’র হংকং অধ্যায়ের প্রধান কার্যালয় বিলিয়ন সেন্টার টাওয়ারে। এটি ৩২ তলার অত্যাধুনিক একটি ভবন। এ যেন বদলে যাওয়া আধুনিক হংকংয়ের কথা বলে। ভবনের ১৬ তলায় বিএলআইএ’র কার্যালয়।

১১ অক্টোবর। হংকংয়ে আরেকটি দিনের শুরু। সকাল সাতটার মধ্যে নাস্তা সেরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসে চড়ে বসলাম কারণ আজ সম্মেলনের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠান। বিলিয়ন সেন্টারের ১৬তম ফ্লোর, এখানেই সৌকর্যমণ্ডিত আসনে উপবিষ্ট করুণাময় বুদ্ধের সুবৃহৎ মূর্তি। শান্ত স্নিগ্ধ সেই অবয়বে নজর পড়তেই শত অস্থির চিত্ত মুহূর্তেই স্থির হয়ে আসে। এই বুদ্ধ সম্মুখেই অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য উদ্ধোধনী অনুষ্ঠান। এখানে করুণাঘন বুদ্ধমূর্তির পাদমূলে ভিক্ষু-ভিক্ষুনী, উপাসক-উপাসিকাগণ প্রার্থনা ও পূজা নিবেদন করছেন। তবে আমার কাছে বিষয়টি ব্যতিক্রম মনে হলো কারণ যারা প্রর্থনা বা পূজা নিবেদন করছেন তাদের প্রত্যেকের পায়ে জুতা মোজা অথবা অনেকে শারীরিক কারণে চেয়ারে বসেও বুদ্ধ পাদমূলে প্রার্থনা করছেন। আমাদের দেশের বৌদ্ধ সমাজের ক্ষেত্রে এ চিত্র ভাবাই যায় না। যদি কোন ভিক্ষু বা উপাসক এরূপ অবস্থায় বুদ্ধ পূজা করতো তবে আমার বিশ্বাস কোন কোন ভিক্ষুগণ ধর্ম গেলো বা পবিত্রতা আত্মহুতি দিলো বলে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করতেন; কিন্তু এখানে তার বিন্দুমাত্র টের পেলাম না। উদ্ধোধনী অনুষ্ঠান, আলোচনা, প্রার্থনা মাঝখানে চা বিরতী, মধ্যাহ্ন ভোজন এভাবেই কেটে গেল কর্মব্যস্ত আরেকটি দিন। দিন শেষ তো সব শেষ হলো না। শুরু হলো আরেক রোমাঞ্চক পর্ব। বিএলআইএ’র উদ্যোগে লিমুজিন বাসে চড়ে আমরা সবাই দেখলাম রাতের হংকং। আধুনিক থেকে আরও আধুনিক হয়ে ওঠা রাতের হংকং যেন এক মায়াবী আলোর মালা।

বিগতদিনের সুখস্মৃতি নিয়ে শুরু হলো ১২ অক্টোবর। এবার হংকং শহরকে বিদায় বলার পালা। গন্তব্য মেইনল্যান্ড চায়না বা হার্ট অব চায়নার নানজিং। স্থানীয় সময় অনুযায়ী সকাল ১০:৪০ মিনিটে আমাদের আকাশযান নানজিং-এর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলো। দুপুর ২.০০টার দিকে আকাশযানটি নানজিং বিমান বন্দরে অবতরণ করে। পর পর বেশ কয়েকটি বিমানে চড়ে আগত সব প্রতিনিধিরা নানজিং বিমান বন্দরের লাউঞ্জে সমবেত হলে প্রায় ১৫টি লিমুজিন বাস আমাদেরকে নিয়ে শুরু করলো চিত্তাকর্ষক নানজিং শহর পরিভ্রমণ। আমাদেরকে নেওয়া হলো চীনাদের জাতির পিতার সমাধি স্থলে। সমাধির বেশ দূরে আমাদেরকে বাস থেকে নামিয়ে জোড়া লাগানো ‘টয় ট্রেন’-এর মতো এক ধরণের যন্ত্রযানে করে সমাধিস্থলে নিয়ে পৌঁছাল। অসংখ্য দর্শনার্থী। অনেকের কাছে জাতির পিতার নাম জিজ্ঞাসা করলাম কিন্তু কোন চীনা ভদ্রলোকের মুখে উচ্চারিত জাতির পিতার নামের মর্মার্থ বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। পরে একজন ইংরেজি জানা লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করে সান ইয়াত-সেন’র নাম জানতে পারলাম। রাজনৈতিক দার্শনিক ও মহামানব সান ইয়াত-সেনকে গণচীন তাঁদের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় অভিষিক্ত করেছে। চীনের অধিবাসীরা তাদের জাতির পিতা সান ইয়াত-সেনকে পরম মমতায় শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের স্মৃতিতীর্থ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার পরম পরাকাষ্টা প্রদর্শন করছে। জাতির পিতার স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের পর আমরা দাজুয়ে মন্দির অভিমুখে রওয়ানা দিলাম। বিকেল ৫ টার দিকে আমাদের গাড়িটি দাজুয়ের প্রধান ফটকে গিয়ে পৌঁছলো। এখানে আমাদেরকে দাজুয়ে মন্দিরের অফিস থেকে থাকার জন্য নির্ধারিত হোটেলের নিজ নিজ রুমের চাবি সংগ্রহ করতে বলা হয়। আমরা তাই করলাম।

চাবি সংগ্রহের কাজ শেষ হলে আমাদেরকে রাতের খাবারের জন্য দাজুয়ের সুসজ্জিত ও সুবিশাল ডাইনিং হলে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের ভদ্র সমাজে পরিচিত বুফে পদ্ধতিতে খাদ্য পরিবেশন। যার যা ইচ্ছে আর রুচি মোতাবেক পরিচিত ও অপরিচিত বহু প্রকারের খাদ্য সম্ভার থেকে নিজ নিজ থালায় পরিমান মতো খাদ্যবস্তু নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে ডিনার পর্ব সুসম্পন্ন করা হলো। অনেক জনের একসাথে খাবারের সুন্দর সুবন্দোবস্ত চোখে পড়ার মতো। এক টুকরো খাদ্য কণাও কেউ ফেলে দেয়নি। আহার পর্ব সমাপ্তির পর প্রত্যেকে প্লেটের উচ্ছিষ্ট নির্দিষ্ট পাত্রে নিক্ষেপ করে এবং খাবারে ব্যবহৃত প্লেটটি স্ব-উদ্যোগে পূর্ব নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে রেখে আসতে হবে। কোথাও কোন কোলাহল নেই। নেই নিয়মের কোন ব্যত্যয়। আহারের সময় পিন পতন নীরবতা যেন ধ্যানের একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। এটা সত্যিই নিময়ানুবর্তিতার এক বিরল উপস্থাপনা। মনে হলো- সম্মেলনে আগত প্রত্যেক প্রতিনিধিই যেন মহাচার্য মাস্টার শিং ইউন-এর প্রবর্তিত মানবতাবাদী বুদ্ধ ধর্মের প্রতি গভীর আস্থা ও ভালোবাসার অপরিমেয় নির্য্যাস বিম্বিত করার পরাকাষ্টা দেখান।

রাত্রে যে হোটেলে আমি রাত্রী যাপন করলাম সে হোটেলটির নাম হল লং জিং হোটেল। প্রাতঃরাশ শেষে আমাদের যাত্রা শরু হলো দাজুয়ে মন্দির অভিমুখে। বাস থেকে নামার পর আমাদেরকে গ্রহণ করা হলো নানা আয়োজনে অতি সম্মানজনকভাবে। এর মধ্যে প্রায় সহস্রাধিক প্রতিনিধি মন্দিরের সম্মুখস্থ সুবিশাল ময়দানে জড়ো হলাম। অতঃপর শুরু হল দাজুয়ে মন্দির ভ্রমণ। প্রতিটি দলের সম্মুখে দ্যোতক পতাকা হাতে ভ্রমণ প্রদর্শক একজন চীনা যুবক। মন্দিরের প্রতিটি এলাকা পরিদর্শন শেষে সুবিশাল বুদ্ধের সম্মুখে প্রার্থনা ও পূজা নিবেদনের লক্ষে মূল ভবনে এসে পৌঁছলাম। এর সুরক্ষিত বুদ্ধ প্রতিমূতিটি মায়ানমার সরকার কর্তৃক প্রদত্ত। শ্বেতপ্রস্তরের সুবিশাল বুদ্ধ প্রতিমূর্তি। অবলোকন করলেই শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, বুদ্ধের সুবিশাল প্রতিমূর্তিকে যেখানে রাখা হয়েছে সেই ভবনে ঢোকার সময় আমরা কেউ কিন্তু জুতা মোজা খুলিনি। জুতা মোজা সমেত তিনবার হা্টুঁ মুড়ে বন্দনা করা ছাড়া সব কাজই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সম্পাদন করা হল।

ধর্মদেশনাসহ নানা কর্মযজ্ঞে অতিবাহিত হলো আরও একদিন। পরদিন অর্থাৎ ১৪ অক্টোবর, আমাদের গন্তব্য জিয়াংসু প্রদেশের উক্সির অদূরে বিনহু যার মাশানে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী গ্রান্ড বুদ্ধ। এটি তাই লেকের উত্তর তীর লিংশানে। দণ্ডায়মান বুদ্ধমূর্তিকে দেখে ও পূজা নিবেদন করে আমার নয়ন মনে যেন অনাবিল প্রশান্তি অর্জিত হলো।

পরদিন ১৫ অক্টোবর, হোটেল থেকে আমাদের গন্তব্য দাজুয়ে মন্দির। এখানকার বন্ধুত্ব বৈঠকে আমরা পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করলাম। একটু আগেভাগে মধ্যাহ্ন ভোজন শেষে আবারও পরিভ্রমণের পালা তবে দল ভিত্তিক এবং নিজ পছন্দ অনুযায়ী। আমার জন্ম পাহাড় পর্বত ঘেরা পার্বত্য এলাকায় তাই আমি ইক্সির লংবেই পর্বত ও উদ্যান এলাকা পরিভ্রমণ দলে যোগ দিলাম। নয়নাভিরাম লংবেই পর্বত ও উদ্যান দেখে চোখে প্রশান্তি আসে। এখানকার পর্বত চূড়া থেকে মহাচীনকে যদ্দুর সম্ভব চোখ বুলানো যায়। উক্সি থেকে আমরা এগিয়ে চললাম হ্যাংঝোর অভিমুখে। যাত্রাপথে আরও বেশ কয়েকটি সুপ্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শন ও বুদ্ধের পাদমূলে প্রণাম নিবেদন করার অবকাশ পেলাম। অনেক মহাজ্ঞানী ভিক্ষু ও ভিক্ষুনীর দেখা পেলাম এখানে। ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর, পূর্ব নির্ধারিত ছক অনুযায়ী চললো পরিভ্রমণ। হ্যাংঝোতে দেখলাম বিশ^ প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের নয়নাভিরাম অংশ মিঠা পানির ওয়েস্ট লেক। এখানাকর প্রতিটি স্থাপনা ও মন্দির মনকাড়া। ১৯ তারিখ সাংহাই অভিমুখে যাওয়ার আগে ঐতিহাসিক নৈসর্গিক শহর উজেনে পরিদর্শন করলাম বহু মনোমুগ্ধকর স্থান। সাংহাই যাওয়ার পথে মহাচার্য মাস্টার শিং ইউন কর্তৃক তাইওয়ানের কাউশিয়াং এ প্রতিষ্ঠিত ফু গুয়াং সান বৌদ্ধ পীঠস্থানের একটি শাখা কার্যালয় তথা মন্দির পরিদর্শন করলাম।

এখানে একটি দারুন অভিজ্ঞতার কথা বলতেই হয়, ১৩ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত গণ চীনের অভ্যন্তরে দাজুয়ে মন্দিরসহ ৯টি মহাচার্য মাস্টার শিং ইউন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ফু গুয়াং সান-এর শাখা কার্যালয় বা বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শন করার সুযোগ পেয়েছি। সবগুলিতে ভিক্ষুনীরাই শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। পুরুষ ভিক্ষুর দেখা পেয়েছি খুব কম। এখানে বৌদ্ধ সমাজ এখনও মানবপুত্র বুদ্ধের এ বৈষম্যহীন প্রথাকে শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরে বৌদ্ধিক সমাজ বিনির্মাণে অনন্য সাধারণ অবদান রেখে চলেছেন যা আমাদের জন্য অনন্য শিক্ষার।

লেখক: বিশিষ্ট বৌদ্ধ মনীষী ও সভাপতি, বনফুল আদিবাসী গ্রিনহার্ট কলেজ এবং পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ

Sangbad Sarabela

সম্পাদক: আবদুল মজিদ

প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । 01894-944220 । sangbadsarabela26@gmail.com, বিজ্ঞাপন: 01894-944204

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2022 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.