× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক চরিত্র

১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪১ পিএম । আপডেটঃ ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:০৫ পিএম

ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ শহীদ ওসমান হাদির অসমাপ্ত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।-

তৌফিক সুলতান,প্রভাষক - ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অফ মনোহরদী মডেল কলেজ,(বি জে এস এম মডেল কলেজ)মনোহরদী, নরসিংদী। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েল্ফশন মানবকল্যাণ সংঘ,কাপাসিয়া, গাজীপুর।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ‘এক দফা’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলেছিলেন, তা ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় এক যুগান্তকারী ধারণা। রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা—এই ধারণার ভেতরেই নিহিত ছিল একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত রাষ্ট্রীয় বা দলীয় কাঠামোর ভেতরে সুস্পষ্ট চর্চায় রূপ নিতে পারেনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কিংবা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ধারণাগত উচ্চারণের বাইরে খুব বেশি বাস্তব দৃষ্টান্ত হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক চরিত্র। তিনি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে বক্তৃতা, স্লোগান কিংবা ইশতেহারের অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং নিজের রাজনৈতিক আচরণ, নির্বাচনি কৌশল, অর্থায়ন পদ্ধতি ও সাংগঠনিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে সেটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। তার রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মূল দর্শন ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয়, নৈতিকতাকেন্দ্রিক; আধিপত্য নয়, অংশগ্রহণমূলক; পুঁজিনির্ভর নয়, জনগণনির্ভর রাজনীতি। এই দর্শনই তাকে অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।

ওসমান হাদির রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে রাজনীতির পুনঃসংযোগ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মকে কখনো ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে, কখনো আবার তাকে সম্পূর্ণ নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে ‘প্রগতিশীলতা’র নামে। হাদি এই দুই চরমপন্থার বাইরে গিয়ে ধর্মকে নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি হিসেবে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। তার নির্বাচনি যাত্রার সূচনা—শাহবাগ জাদুঘরের গেটে মিলাদ ও বাতাসা-মুড়ি বিতরণ—ছিল এই দর্শনেরই প্রতীকী ও বাস্তব প্রকাশ। এটি কোনো লোকদেখানো ধর্মীয়তা নয়; বরং গ্রামবাংলার মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতির স্বাভাবিক সংযোগের ঘোষণা। ক্ষমতার রাজনীতির সূচনা যেখানে শোডাউন দিয়ে হয়, সেখানে দোয়ার মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করা ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতি এক নীরব কিন্তু তীব্র প্রতিবাদ।

পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতির বিপরীতে ওসমান হাদি একটি বিকল্প রাজনৈতিক মডেল নির্মাণের চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই যেখানে বহর, শোডাউন, ভয় প্রদর্শন ও জনদুর্ভোগ—সেখানে তিনি নিজ পায়ে হেঁটে, ছোট টিম নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গেছেন। নেতা মানুষের কাছে যাবেন—মানুষকে জড়ো করে শক্তি প্রদর্শন করবেন না—এই দর্শন বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন তিনি। রাস্তায় যানজট সৃষ্টি, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাওয়া, ফুটপাত দখল—এসব নাগরিক ভোগান্তিকে তিনি রাজনীতির ব্যর্থতা হিসেবে দেখতেন। তার প্রচারণা ছিল শান্ত, সংযত ও নাগরিকবান্ধব—যা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

অর্থবিত্তের রাজনীতির অবসান ঘটানোর প্রশ্নে ওসমান হাদির ভূমিকা ছিল আরও স্পষ্ট ও সাহসী। তিনি করপোরেট ফান্ড, কালোটাকা কিংবা অদৃশ্য বিনিয়োগকারীর ওপর নির্ভর না করে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ‘হাদিয়া’র মাধ্যমে নির্বাচনি ব্যয় পরিচালনা করেন। এখানে অর্থ কোনো নিয়ন্ত্রক শক্তি নয়; বরং আস্থার প্রতীক। রাজনীতি করতে বিপুল অর্থ লাগে—এই প্রচলিত ধারণাকে তিনি কার্যত চ্যালেঞ্জ করেন। বাতাসা-মুড়ি, লিফলেট, ভলান্টিয়ার টিম—এই কস্ট-ইফেক্টিভ মডেল প্রমাণ করে, রাজনীতি আবার সাধারণ মানুষের নাগালে ফিরতে পারে।

পরিবেশবান্ধব ও আইনসম্মত রাজনীতির চর্চাও ছিল ওসমান হাদির নতুন বন্দোবস্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অবৈধ মোটরসাইকেল শোডাউন, শব্দদূষণ, হেলমেটবিহীন চলাচল—এসব তিনি সচেতনভাবে পরিহার করেন। পরিবর্তে ভ্যানগাড়ি ব্যবহার, বড় ব্যানার ও বিলবোর্ডবিহীন প্রচারণা, কেবল লিফলেটের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছানো—এই সবই ছিল আইন মানা, পরিবেশ রক্ষা এবং নগরসৌন্দর্য রক্ষার রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রীয় আইনকে পাশ কাটিয়ে রাজনীতি করার প্রবণতার বিরুদ্ধে এটি ছিল এক নৈতিক অবস্থান।

ইশতেহার প্রণয়নেও ওসমান হাদি প্রচলিত ধারার বাইরে হাঁটেন। তিনি জনগণের কাছে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দেননি; বরং জনগণের কাছ থেকে ইশতেহার চেয়েছেন। ‘ভোটার-যোগ’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে বোর্ডে লিখে নিয়েছেন—তারা কী চায়। এরপর বাস্তবসম্মত ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরে সেগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সাজাতে চেয়েছেন। এটি প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির এক নতুন ব্যাখ্যা—যেখানে জনগণ কেবল ভোটার নয়, নীতিনির্ধারণের অংশীদার।

রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে মাস শেষে ফেসবুক লাইভে ফান্ডের হিসাব প্রকাশ করা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় অভূতপূর্ব। রাজনীতি মানেই অস্বচ্ছতা—এই ধারণাকে ভেঙে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, জনগণের কাছে রাজনীতিবিদের জবাবদিহিতা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান ও সহাবস্থানের রাজনীতি তার চরিত্রের একটি উজ্জ্বল দিক। রিকশাচালক প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে শুরু করে বিএনপি, জামায়াত—সবার প্রতিই তার আচরণ ছিল সম্মানজনক। রাজনীতি শত্রুতা নয়, সহাবস্থান—এই বোধই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ওসমান হাদির রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কোনো দলীয় মডেল নয়; এটি একটি নৈতিক রাজনৈতিক দর্শন। তিনি দেখিয়েছেন, নতুন বাংলাদেশ মানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, ভাষা ও সংস্কৃতির আমূল রূপান্তর। তার জীবন ও রাজনীতি প্রমাণ করে, রাজনীতি আবার মানুষমুখী, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক হতে পারে। ক্ষণজন্মা হয়েও তিনি তাই কিংবদন্তি। নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাইলে সব রাজনৈতিক শক্তির উচিত এই বন্দোবস্তকে কেবল স্মরণ নয়, চর্চায় রূপ দেওয়া।


Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.