× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

তুলির আঁচড়ে স্বপ্ন বুনছেন স্বর্ণা, শিল্প থেকেই গড়ে তুলেছেন ‘অর্নিমা’

‎হ্লাথোয়াইছা চাক, রাবি

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:২৫ পিএম

ছবি: সংবাদ সারাবেলা।

ক্যানভাসের গণ্ডি পেরিয়ে শাড়ি, গ্যাসলাইটারসহ নানা সামগ্রীতে শিল্পের ছোঁয়া; পড়াশোনার পাশাপাশি নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলার পথে হাঁটছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণী।

‎শিল্প কারও কাছে নিছক অবসরের সঙ্গী, কারও কাছে মনের প্রশান্তি খোঁজার আশ্রয়, আবার কারও কাছে নেহাতই ভালো লাগার বিষয়। তবে কারও কারও জীবনে শিল্পই হয়ে ওঠে পরিচয়ের প্রথম অক্ষর, স্বপ্নের প্রথম রং—নিজেকে চেনার, স্বপ্ন পূরণের এবং আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার এক নিরব পথ। তুলির আঁচড় যখন সাদা ক্যানভাসের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে দৈনন্দিন জীবনের অলি-গলিতে, মানুষের ব্যবহারিক নানা উপকরণে, তখন শিল্প যেন নিঃশ্বাস নেয় নতুন করে, খুঁজে পায় ভিন্ন এক মাত্রা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান স্বর্ণার জীবনও এমনই এক রঙিন আখ্যান, যেখানে রং আর স্বপ্ন একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে হাঁটে।


‎কুষ্টিয়ার মেয়ে স্বর্ণার ছবি আঁকার প্রতি ভালো লাগা তৈরি হয় ছোটবেলা থেকেই। তখন আঁকাআঁকি ছিল নিছক ভালো লাগা ও শখের বিষয়। কখনো ভাবেননি, এই ভালো লাগাই একসময় তাঁর জীবনের সঙ্গে এতটা জড়িয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঝোঁকই পরিণত হয়েছে শিল্পচর্চার গভীর ভালোবাসায়। আর চারুকলা অনুষদে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পর সেই ভালোবাসা পেয়েছে নতুন দিশা।

‎স্বর্ণা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি একটা ঝোঁক ছিল। ভালো লাগা কাজ করত। কিন্তু কখনো ভাবিনি এটার সঙ্গেই জীবন জড়িয়ে যাবে। সেই ভালো লাগা থেকেই চারুকলায় সুযোগ পাওয়া মাত্রই ভর্তি হই।”

‎চারুকলায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নিজের কিছু করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন স্বর্ণা। এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চেয়েছেন, যেখানে তাঁর কাজ ও শিল্প মানুষের মনে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করবে। সেই ভাবনা থেকেই যাত্রা শুরু হয় তাঁর নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘অর্নিমা’র।

‎‘অর্নিমা’ স্বর্ণার কাছে শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়; এটি তাঁর শিল্পভাবনা, সৃজনশীলতা ও স্বপ্নকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম। খুব বেশি দিনের পথচলা না হলেও এরই মধ্যে নিজের হাতে তৈরি বিভিন্ন পণ্যের মাধ্যমে আলাদা পরিচিতি তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি।

‎‘অর্নিমা’র মূল কাজ শাড়ি ঘিরে। হ্যান্ডপেইন্টেড, ব্লকপ্রিন্ট ও ওয়াশপেইন্ট বিভিন্ন মাধ্যমে শাড়িতে নকশা ফুটিয়ে তোলেন স্বর্ণা। প্রতিটি শাড়ির নকশা তিনি নিজেই তৈরি করেন। একটি কাপড় তাঁর কাছে কেবল কাপড় নয়, একটি বিশাল ক্যানভাস। সেই ক্যানভাসে মাথায় আসা ভাবনাগুলো তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন তিনি। তাই একই ধরনের কাজ করলেও একেকটি শাড়ি হয়ে ওঠে অন্যটির চেয়ে আলাদা।

‎স্বর্ণার ভাষায়, “আমি যখন কোনো কাপড়ে কাজ করি, তখন মনে হয় এটা একটা বিরাট ক্যানভাস। মাথায় যা আসে, আঁকতে থাকি। তাই একটা শাড়ি আরেকটি থেকে ভিন্ন হয়।” এই ভিন্নতাই তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রচলিত নকশার বাইরে গিয়ে নিজের কল্পনা ও চারুকলায় অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রতিটি পণ্যকে স্বতন্ত্র করে তোলার চেষ্টা করেন তিনি।

‎শাড়ির পাশাপাশি স্বর্ণার সৃজনশীলতার সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলোর একটি হলো হ্যান্ডপেইন্টেড গ্যাসলাইটার। সাধারণত রান্নাঘরের ব্যবহার্য একটি সামগ্রী হিসেবেই গ্যাসলাইটারকে দেখা হয়। কিন্তু স্বর্ণার হাতে সেটিই হয়ে ওঠে ছোট্ট একটি শিল্পকর্ম।

‎ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কাস্টমাইজড ডিজাইন তৈরি করে গ্যাসলাইটারে ফুটিয়ে তোলেন তিনি। কোনোটি হতে পারে নির্দিষ্ট কোনো থিমের, কোনোটি ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী, আবার কোনোটি তাঁর নিজের সৃজনশীল ভাবনা থেকে তৈরি। বিশ্বকাপকে ঘিরেও গ্যাসলাইটারে ব্যতিক্রমী কাজ করেছিলেন স্বর্ণা। সাধারণ একটি গ্যাসলাইটারের গায়ে বিভিন্ন দেশের পতাকা এঁকে সেটিকে রূপ দিয়েছিলেন নান্দনিক শিল্পকর্মে। স্বর্ণার কাছে এগুলো শুধুই গ্যাসলাইটার নয়। তাঁর ভাষায়, “আমার কাছে গ্যাসলাইটারগুলো কোনো লাইটার না, একেকটা পিস আমার কাছে একেকটি শিল্পকর্ম। যারা আমার কাছ থেকে নেয়, তারাও বেশ শিল্পটাকে ভালোবাসে।”

‎তিনি বলেন,  ক্রেতাদের এই আগ্রহই তাঁকে আরও নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করছে। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ জিনিসকেও কীভাবে শিল্পের মাধ্যমে আলাদা করে তোলা যায় সেই ভাবনাই তাঁর কাজের বড় অনুপ্রেরণা।

‎ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির পাশাপাশি ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ারও ইচ্ছা ছিল স্বর্ণার। সেই স্বপ্ন এখনো তাঁর ভেতরে রয়ে গেছে। সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে আবার পড়াশোনা করার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর। বর্তমানে শাড়ি নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে যেন সেই পুরোনো স্বপ্নের সঙ্গেও কিছুটা পথচলা হচ্ছে। নিজের আঁকা নকশা, রঙের ব্যবহার ও নান্দনিকতার সমন্বয়ে পোশাককে আলাদা করে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। শুধু পোশাক নয়, ক্রাফট নিয়েও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। ভবিষ্যতে নিজের সব ধরনের সৃজনশীল কাজকে একটি জায়গায় নিয়ে এসে তার মধ্যে একটি মিলবন্ধন তৈরি করতে চান স্বর্ণা।

‎তিনি বলেন, “আমার ক্রাফটের কাজগুলো নিয়েও অনেক আগ্রহ কাজ করে। ভবিষ্যতে সবকিছুর একটা মিলবন্ধন করতে পারি কি না, এটাই ইচ্ছা।”

‎একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট ও একাডেমিক ব্যস্ততা; অন্যদিকে শিল্পচর্চা ও নিজের ব্র্যান্ড পরিচালনা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাচ্ছেন স্বর্ণা। ‘অর্নিমা’র প্রতিটি কাজের পরিকল্পনা, নকশা ও পরিচালনার সঙ্গে নিজেই যুক্ত তিনি। এর পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় তাঁদের নিজস্ব একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। সেখানে পার্টটাইম ড্রইং শিক্ষিকা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ফলে একসঙ্গে শিক্ষার্থী, শিল্পী, উদ্যোক্তা ও শিক্ষক—বিভিন্ন ভূমিকা সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।

‎স্বপ্নের পথে হাঁটা কখনোই পুরোপুরি সহজ ছিল না স্বর্ণার জন্য। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসায় নিজের স্বপ্ন পূরণে তাঁকে অন্যদের তুলনায় আরও বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর ব্র্যান্ডের যাত্রা খুব বেশি দিনের না হলেও এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আগ্রহ, নিজের ওপর বিশ্বাস এবং কাজ করে যাওয়ার মানসিকতা। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চান তিনি।

‎স্বর্ণা বলেন, “আমার ব্র্যান্ডের যাত্রা এত সোজা ছিল না। যেহেতু আমি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি, তাই আমাকে আমার স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজেকে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে।”

‎স্বর্ণার স্বপ্ন শুধু ‘অর্নিমা’কে একটি অনলাইন ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা নয়। শিল্প, ফ্যাশন ও ক্রাফট—নিজের সৃজনশীলতার বিভিন্ন দিককে একসঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চান তিনি। পাশাপাশি সুযোগ পেলে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে উচ্চশিক্ষার ইচ্ছাও রয়েছে তাঁর।

‎কুষ্টিয়ার মাটিতে বেড়ে ওঠা স্বর্ণার হাতে রংতুলি উঠেছিল ছেলেবেলাতেই, নিতান্ত খেলাচ্ছলে। তখন তা ছিল কেবল ভালো লাগার এক নিরীহ অভ্যাস কোনো লক্ষ্য ছিল না, ছিল না কোনো ভবিষ্যতের হিসাব। কিন্তু সময় যেমন নদীর মতো বহমান, তেমনি বদলে দেয় মানুষের অভ্যাসকেও ভালোবাসায়। ছোটবেলার সেই সাদামাটা আগ্রহ ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে গভীর শিল্পপ্রেমে। কুষ্টিয়া থেকে এরপর পথচলা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে; চারুকলা অনুষদে ভর্তি হওয়ার পর সেই ভালোবাসা যেন খুঁজে পায় তার আসল ঠিকানা। এখান থেকেই শেখা শিল্পভাবনাকে ঘিরে গড়ে ওঠে ‘অর্নিমা’। তবে এই পথচলা এখনো শুরু পর্যায়ে। সামনে রয়েছে আরও শেখা, নতুন কিছু করার চেষ্টা, ভুল থেকে শেখা এবং নিজের কাজকে আরও পরিণত করে তোলার সুযোগ।

‎স্বর্ণার গল্পে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তিনি তাঁর প্রতিভাকে শুধু নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি। তুলির আঁচড়কে তিনি পরিণত করেছেন স্বপ্ন দেখার শক্তিতে, আর সেই স্বপ্নকে ধীরে ধীরে রূপ দিচ্ছেন নিজের পরিচয়ে।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.