× প্রচ্ছদ জাতীয় সারাদেশ রাজনীতি বিশ্ব খেলা আজকের বিশেষ বাণিজ্য বিনোদন ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

দেশের প্রায় ১০ ভাগ মানুষ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত

বছরে এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে ৬ হাজার শিশু

শাহনাজ পারভীন এলিস

০৯ মে ২০২২, ১৭:৪৫ পিএম

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত এক রোগী। ছবি: সংবাদ সারাবেলা

রোববার (৮ মে) বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ১০ কোটির বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করে। প্রতিবছর জটিল থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়েই জন্ম হচ্ছে প্রায় ১ লাখ শিশুর। বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সঠিক কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও সম্প্রতি বাংলাদেশে বিভিন্ন স্বাস্থ্য জার্নালে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে- দেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ জ্ঞাত বা অজ্ঞাতে থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি লোক এ রোগে আক্রান্ত বা এর জীন বাহক। এর মধ্যে ৩ শতাংশ লোক বিটা থ্যালাসেমিয়ার বাহক, ৪ শতাংশ অন্য ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন রোগের বাহক। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের হিসাবে, প্রতিবছর ৬ হাজার শিশু বিভিন্ন রকমের থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, থ্যালাসেমিয়া হচ্ছে অনিরাময়যোগ্য বংশগত রক্তরোগ। বাংলাদেশে যেসব বংশগত রোগ নিয়ে শিশুজন্মের হার বাড়ছে তার মধ্যে থ্যালাসেমিয়া অন্যতম।  থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের শরীরে রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, লোহিত রক্তকণিকা ঠিকমতো তৈরি হতে পারে না, রক্তের উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে, ফলে রক্তশূন্যতা তৈরি হয়। এর ফলে আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত বিরতিতে রক্ত নিতে হয়। শিশুজন্মের কয়েক মাস বা বছরের মধ্যে রোগটির লক্ষণ প্রকাশ পায়। থ্যালাসেমিয়া রোগীকে প্রতিনিয়িত অন্যের দান করা রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। রোগীরা নিয়মিত রক্ত নিলেও অনেক ধরনের সমস্যা হয়, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। আমাদের দেশে বেশিরভাগ রোগী পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে ১০-১৫ বছর বয়সের মধ্যে মারা যায়।

৭ বছরে শিশু মোরসালিন। সে থ্যালাসেমিয়ার রোগী। প্রতি মাসে ছোট তার শরীরে এক ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। আর শরীরে রক্ত দিতে ভালুকা থেকে মায়ের সঙ্গে মোরসালিনকে আসতে হয় ঢাকার শান্তিনগরে থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। তার মা নাসরিন জানালেন, ‘ওর শরীরের রক্ত কমতে থাকলে খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়। মাথা ঘুরে। বমি করে। ও তো প্রতিবন্ধীর মতোই, তেমন কোনো কাজও করতে পারে না। তবু রক্তটা দিলে ওর শরীরটা একটু চাঙা হয়। ছেলেটা জীবিত, এইটাই বড় শান্তি। রক্ত আর ওষুধ না দিতে পারলে ছেলেটারে আর বাঁচানো যাইবো না, মইরা যাইবো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু হেমাটোলজি বিভাগে চিকিৎসাধীন ১৩ বছরের কিশোরী জিম। তিন মাস আগে টাঙ্গাইলে থ্যালাসেমিয়া ধরা পরে তার। এরপর হাসপাতালে ভর্তি। পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর চিকিৎসক জানান, তার বয়স দশ বছরের বেশি হওয়ায় নিয়মিত প্রায় ৩ বছর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। এই সময় তাকে এক-দু’সপ্তাহ অন্তর অথবা মাসে একবার হলেও অন্যের শরীর থেকে রক্ত গ্রহণ করা জরুরি। জিমের বাবা দরিদ্র কৃষক আব্দুল হালিম জানান, এক মাস হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় জরুরি চিকিৎসার পর জিমকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। তবে ঢাকায় বাড়িভাড়া করে হাসপাতালে কাছাকাছি দূরত্বে থেকেই প্রতি সপ্তাহে এসে রক্ত অথবা সেবা নেয়ার প্রয়োজন হয়। এরই মেয়ের চিকিৎসার জন্য নিজের জমানো কিছু সম্বল ও কৃষিজমি বিক্রি করা প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তা দীর্ঘমেয়াদি এই চিকিৎসার এমন ব্যয় তার পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন ধারদেনা করে এবং মানুষের কাছে হাত পেতে মেয়ের চিকিৎসা চালিয়ে নিচ্ছেন। কতদিন পারবেন তা কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।

বাংলাদেশের প্রায় ৪২ শতাংশ মানুষ বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। থ্যালাসেমিয়া রোগীকে নিয়মিত রক্ত (মাসে ১ থেকে ৪ ব্যাগ) জোগাড় করার পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১০-২৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়, যা বেশির ভাগ পরিবারের সাধ্যের বাইরে। এ কারণে রোগীর পাশাপাশি পুরো পরিবার মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেড্রিয়াটিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. এটিএম আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ বাহকই জানে না যে তারা এ রোগের বাহক। এতে করে এ রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো খুব জরুরি। এটি যেহেতু বংশগত রোগ; তাই বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া অনেকখানি কমানো যেতে পারে। এই জিন বহনকারী দু’জনের মধ্যে যেন বিয়ে না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে পারলে থ্যালাসেমিয়া কমানো সম্ভব। এছাড়া আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে না করা। ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে বাচ্চা পেটে আসার পর চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ উপায়ে গর্ভস্থ শিশুর থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করতে হবে। রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যাবরশন করা যেতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন ইতালি, ইরান, সৌদি আরব, সাইপ্রাস, পাকিস্তানসহ বেশকিছু দেশে বিবাহের কাবিননামায় থ্যালাসেমিয়ার সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব উপায়ে তারা থ্যালাসেমিয়ার প্রকোপ ৪ থেকে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

ডা. এটিএম আতিকুর রহমান জানান, ওইসব দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে থ্যালাসেমিয়ার প্রভাব নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে বিবাহের কাবিননামায় থ্যালাসেমিয়ার সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা জরুরি। কারণ এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন থ্যালাসেমিয়ার জিন বহনকারী রোগী যদি আরেকজন একই জিন বহনকারীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাহলে তাদের সন্তানদের মধ্যে ৫০ ভাগই এ রোগ নিয়ে জন্ম নেবেন। ২৫ ভাগ শিশু হবে এ রোগের বাহক। আর বাকি ২৫ ভাগ সুস্থ শিশুর জন্ম হতে পারে। অথচ একজন থ্যালাসেমিয়ার জিন বহনকারী রোগীর যদি সুস্থ মানুষের সাথে বিয়ে হলে এ রোগে আক্রান্ত শিশুর জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে রোগের বাহক হতে পারে অল্প সংখ্যক শিশু।

১৪ বছর বয়সী জিম থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত। ছবি: সংবাদ সারাবেলা

থ্যালাসেমিয়াকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলেও মনে করেন ডা. আতিকুর। তিনি বলেন, সবচেয়ে আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে গুরুত্ব না দেয়া হলে আমাদের অজান্তে দিন দিন বাহক ও রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে, ফলে  রোগী ও পরিবারের দুর্ভোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যয়ও বেড়ে যাবে। তাই থ্যালাসেমিয়াকে দেশের নীতি পর্যায়ে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম থ্যালাসেমিয়াপ্রবণ দেশ। অথচ প্রতিরোধযোগ্য এই রোগটি নীরব মহামারির আকার ধারণ করলেও থ্যালাসেমিয়াকে এখনো জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। বিশ্বের কিছু দেশে (বাংলাদেশ এর অন্যতম) থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। আন্তর্জাতিক অভিবাসনের কারণে রোগটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। ২০০৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থ্যালাসেমিয়াকে বিশ্বের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে। প্রসঙ্গত, দক্ষিণ এশিয়ায় ২ লাখের বেশি থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে এবং প্রায় ৭ কোটি মানুষ এ রোগের বাহক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে প্রতিবছর যে ৬ হাজার শিশু জন্মগ্রহণ করছে তা নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে আগামী ৫০ বছরে তা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা করছে, আগামী ৫০ বছরে থ্যালাসেমিয়া পৃথিবীজুড়ে একটি বড় রকমের সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। তাই এটি রোধে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। সরকারি, ব্যক্তিগত, সামাজিক, গণমাধ্যম সব দিক থেকেই এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করার আহ্বান তাদের।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক: আবদুল মজিদ

প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । 01894-944220 । sangbadsarabela26@gmail.com

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2022 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.