ছবি: সংগৃহীত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত থেকে সদ্য প্রকাশিত নথিতে কুখ্যাত অর্থলগ্নিকারী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে জড়িত বিশ্বনেতা, রাজপরিবারের সদস্য, বিলিয়নেয়ার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ পেয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে এবং জবাবদিহির দাবি জোরালো হয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগ উচ্চপ্রোফাইল যৌন পাচার মামলায় ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করেছে। এসব নথিতে রাজনীতিক, রাজপরিবারের সদস্য, কূটনীতিক ও কর্পোরেট অভিজাতদের সঙ্গে দণ্ডিত অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের কথিত সংযোগের তথ্য উঠে এসেছে।
মার্কিন উপ-অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লঁশ জানান, এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের আওতায় প্রকাশিত নথিতে ২ হাজারের বেশি ভিডিও এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের (বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের) সুরক্ষার জন্য কিছু তথ্য গোপন রাখা হলেও ৪৩ জন ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২০ জনের বেশি ছিলেন নির্যাতনের সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক।
যুক্তরাষ্ট্র
নথিতে যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, টেসলার সিইও ইলন মাস্ক, এবং মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস।
এপস্টেইনের ইমেইলে দাবি রয়েছে যে গেটস এপস্টেইনের দ্বীপে যৌন সম্পর্কের পর একটি যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে গেটস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইমেইলে আরও দেখা যায়, এপস্টেইন ইলন মাস্ককে তার ব্যক্তিগত দ্বীপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের নাম এসেছে সামাজিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের সূত্রে।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, নথিগুলো তাকে সব ধরনের অনিয়ম থেকে মুক্ত প্রমাণ করেছে এবং বলেছেন, এগুলো ‘র্যাডিকাল লেফটের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক ২০১২ সালে পরিবারের সঙ্গে এপস্টেইনের দ্বীপে সফরের ব্যবস্থা করেছিলেন বলে নথিতে দেখা যায়, যদিও পরে তিনি দাবি করেন যে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। নথি অনুযায়ী, তাদের যোগাযোগ ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছিল।
মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা—যাদের মধ্যে রিপাবলিকান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ ও থমাস ম্যাসি রয়েছেন—নথি আংশিকভাবে প্রকাশের সমালোচনা করে আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সব ফাইল প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স
ছবি ও ইমেইলে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর (অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর) সঙ্গে এপস্টেইনের যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাকিংহাম প্যালেসে আমন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত নৈশভোজের উল্লেখ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, প্রিন্স অ্যান্ড্রুর উচিত কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন লেবার পার্টি থেকে পদত্যাগ করেছেন, কারণ নথিতে দেখা গেছে এপস্টেইন তার সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টে ২৫ হাজার ডলারের তিনটি পেমেন্ট করেছিলেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ–এর নামও ইমেইলে এসেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে তিনি শাসনসংক্রান্ত বিষয়ে এপস্টেইনের সহায়তা চেয়েছিলেন। নথিতে ম্যাক্রোঁর উদ্ধৃতি ও অর্থমন্ত্রী থাকার সময়কার বৈঠকের উল্লেখ রয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্সি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েল
নথিতে দেখা যায়, ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক একাধিকবার এপস্টেইনের নিউইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন।
আরও জানা যায়, ২০১৬ সালে বারাক ইসরায়েলি গণমাধ্যমের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকার আয়োজনের ক্ষেত্রে এপস্টেইনের সহায়তা চেয়েছিলেন।
বারাক যোগাযোগের কথা স্বীকার করলেও কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক
নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিত এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এটি ‘ভীষণ বিব্রতকর।’
তিনি এপস্টেইনের ফ্লোরিডার বাড়ি ও সেন্ট বার্থেলেমিতে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও ব্যক্তিগত দ্বীপে যাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
সুইডেনের প্রিন্সেস সোফিয়া এবং ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডরিকের নামও নথিতে এসেছে।
সোফিয়াকে নিউইয়র্কে ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, আর ফ্রেডরিকের নাম এসেছে ২০১২ সালের ইমেইলে, যেখানে এপস্টেইনের সহযোগীদের সঙ্গে নৈশভোজের উল্লেখ রয়েছে।
স্লোভাকিয়া, তুরস্ক
স্লোভাকিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো–র উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাইচাক নথিতে নাম আসার পর পদত্যাগ করেছেন। তিনি কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, রাজনৈতিক চাপ এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত।
তুরস্কের রবার্ট কলেজ–এর বোর্ড সদস্য ল্যান্ডন থমাস জুনিয়র ২০১৪ সালে এপস্টেইনকে ইমেইল করে তহবিল সংগ্রহের পরামর্শ ও সহায়তা চেয়েছিলেন। এই বিনিময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অলাভজনক খাতে এপস্টেইনের প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য
ইমেইলে দেখা যায়, এপস্টেইন ও আমিরাতি ব্যবসায়ী সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম লিবিয়ার গাদ্দাফি সরকারের পতনের পর জব্দকৃত সম্পদ উদ্ধার করতে সাবেক MI6 ও মোসাদ এজেন্ট ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
আরও কিছু চিঠিতে সোমালিল্যান্ডে প্রকল্প (যেমন চলচ্চিত্র স্টুডিও ও পানি রপ্তানি) নিয়ে আলোচনা উঠে এসেছে।
ইউক্রেন, রাশিয়া
একটি ইমেইলে দাবি করা হয়েছে, রুশ বিরোধী নেতা ইলিয়া পোনোমারেভ ভ্লাদিমির পুতিনের বিকল্প হতে পারেন এবং তাকে ‘বিদ্রোহের সংগঠক’ বলা হয়েছে।
আরেকটি বার্তায় বলা হয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ‘সহায়তা চাইছেন’ এবং এপস্টেইনের নোটে তাকে ‘ইসরায়েলিদের দ্বারা পরিচালিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এপস্টেইন ফাইলস অ্যাক্ট
মার্কিন বিচার বিভাগ শুক্রবার এপস্টেইন-সংক্রান্ত ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার নতুন নথি প্রকাশ করেছে।
জেফ্রি এপস্টেইন ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে যৌন পাচারের অভিযোগে বিচারাধীন অবস্থায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যান।
তিনি ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার একটি আদালতে অপ্রাপ্তবয়স্ককে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছিলেন এবং দণ্ডিত হন, যদিও সমালোচকরা ওই দণ্ডকে অত্যন্ত হালকা বলে আখ্যা দেন।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
