× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

চীন–পাকিস্তান নতুন সীমান্ত চুক্তি: অস্বস্তিতে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:০০ পিএম

ছবি: সংগৃহীত।

পাকিস্তান ও চীন সম্প্রতি হিমালয় অঞ্চলের একটি অমিমাংশিত অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত অংশে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সীমান্ত নির্ধারণ করে। তাতে ভারত তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিষয়টি সামনে এসেছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত দশকের পর দশক ধরে হিমালয় অঞ্চলের একটি বিতর্কিত অংশকে পাকিস্তান-চীন সীমান্ত বলে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবি, ওই অঞ্চল ভারতের নিজস্ব ভূখণ্ড। কিন্তু গত সপ্তাহে পাকিস্তান ও চীন ওই পার্বত্য অঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত অংশে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সীমান্ত নির্ধারণ করে। নয়াদিল্লি এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।

দুই দেশ ‘পাকিস্তান-চীন বাউন্ডারি জয়েন্ট কমিশন’ গঠনসংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করে। পাকিস্তান এটিকে এক ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করে। দেশটি মনে করে, এই চুক্তি সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় ভারতের আঞ্চলিক দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর করবে।

তবে নয়াদিল্লি এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ভারতীয় ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করা কোনো এলাকায় পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে তারা স্বীকৃতি দেয় না।

ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। ভারত ও চীন কয়েক বছর ধরে হিমালয় সীমান্তে সামরিক উত্তেজনার পর নিজেদের সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই সীমান্তের বড় একটি অংশে দুই দেশের সেনাদের অবস্থানকে পৃথক করা বিতর্কিত রেখাটিকে বলা হয় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি)। একই সময়ে, বেইজিং ও ইসলামাবাদ সীমান্তের এমন একটি সংলগ্ন অংশে সহযোগিতা আরও গভীর করছে, যেটিকেও ভারত নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। তথাকথিত জয়েন্ট কমিশনকে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি, কারণ এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।’
এই কমিশন পাকিস্তান-চীন সীমান্তসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করবে। এর আওতায় রয়েছে শাকসগাম উপত্যকাও। প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটারের এই ভূখণ্ড ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চীনের কাছে হস্তান্তর করে। তবে ভারত এটিকে লাদাখের অংশ হিসেবে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।

ভারতের বক্তব্য, ওই ভূখণ্ডটি সাবেক দেশীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ ছিল। পাকিস্তান সেটি অবৈধভাবে দখলের পর চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত সরকার কখনোই ওই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং এটিকে অবৈধ ও অকার্যকর বলে মনে করে।

এই ইতিহাসই পাকিস্তান–চীনের ঘোষণাটিকে ভারতের কাছে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর করে তুলেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘অবৈধ ও জোরপূর্বক দখলে থাকা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার পাকিস্তানের নেই।’ তবে পাকিস্তানের বক্তব্য, জম্মু ও কাশ্মীর এখনো বিতর্কিত ভূখণ্ড। ফলে চীনের সঙ্গে ১৯৬৩ সালের সীমান্ত চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো অবস্থান ভারতের নেই। পাকিস্তান ওই চুক্তিকে বৈধ বলে মনে করে।

দিল্লির শিব নাদার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকব বলেন, নতুন এই পদক্ষেপ আসলে একেবারে নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং পুরোনো একটি ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এখানে একমাত্র বিষয় হলো, এটি কখন কার্যকর করা হলো।’

তার মতে, এই সময়ে কমিশনটি সক্রিয় করার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের বৃহত্তর পরিসরে নিজেদের সীমান্তগুলো চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা এবং এমন এক সময়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগ ও চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইচ্ছা, যখন পাকিস্তানের অন্যান্য সীমান্তে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। জ্যাকব বলেন, এই উন্নয়ন নিয়ে ভারতের ‘উদ্বিগ্ন’ হওয়া উচিত। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১৯৬৩ সালের চুক্তির একটি বিধানকে এই পদক্ষেপ উপেক্ষা করছে বলে মনে হচ্ছে।

জ্যাকবের ভাষ্য, ওই চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, কাশ্মীর বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়ার পর যে দেশ শেষ পর্যন্ত ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পাবে, তার সঙ্গে চুক্তিটি পুনরায় আলোচনা করতে হবে। ভারতের জন্য সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক তথ্যপরিবেশের কারণে, বলেন জ্যাকব।

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও তথ্যের পরিসরে চীনের তুলনামূলক আধিপত্য রয়েছে। সিজিটিএন, সিআরআই এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের উপস্থিতি রয়েছে। ভারতের তুলনায় এই আধিপত্যের কারণে চীন বিশ্বজুড়ে নিজেদের বয়ান ও মানচিত্র তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে ভারত এমন ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা বিশ্বের অন্যান্য রাজধানী সম্ভবত উপেক্ষা করবে।’

তবে এই উদ্বেগ সীমান্তের বাস্তব ব্যবস্থাপনার বিষয়টি থেকে আলাদা। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে এই অঞ্চলে ইতোমধ্যেই বিস্তৃত অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি এবং কারাকোরাম মহাসড়ক।

যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমি ও হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো হুসেইন হাক্কানি বলেন, নতুন কমিশনটি একই সঙ্গে বাস্তবিক ও রাজনৈতিক। হাক্কানি বলেন, ‘এটি দুটিরই সমন্বয়। এটি সীমান্ত ও সীমানা সহযোগিতা বাড়ানো, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং সিপিইসির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষার একটি ব্যবস্থা।’

তাঁর মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতকে একটি বার্তাও দেওয়া হয়েছে যে, কাশ্মীর প্রশ্নে বেইজিং এখনো পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গিকেই বিবেচনায় নেয়। হাক্কানি বলেন, ‘চীন কখনোই কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থান মেনে নেয়নি। আর চীন গিলগিট-বালতিস্তানকে ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, পাকিস্তানি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে।’ গিলগিট-বালতিস্তান পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সেই অঞ্চল, যার সঙ্গে চীনের সীমান্ত রয়েছে এবং যেটিকে ভারত নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে।

হাক্কানি বলেন, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিভিন্ন পরিবর্তনের পর পাকিস্তানের অবস্থানও বদলেছে। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান এখনো বলে আসছে যে জম্মু ও কাশ্মীরের চূড়ান্ত মর্যাদা এখনো নির্ধারিত হয়নি। কিন্তু ভারত যেহেতু তাদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অংশে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এনেছে, যেমন ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করেছে, তাই পাকিস্তান মনে করছে ১৯৬৩ সাল থেকে চীনের সঙ্গে যে বিষয়টি বাস্তবে কার্যকর রয়েছে, সেটিকে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ায় কোনো সমস্যা নেই।’

বেইজিংয়ের জন্যও এই ব্যবস্থা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে ভারতকে ঘিরে নিজেদের অবস্থান পরিচালনা ও সংকেত দেওয়ার বৃহত্তর ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হাক্কানি বলেন, কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করা চীনের জন্য কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই মূল্যবান। তিনি বলেন, ‘কৌশলগত দিক থেকে এটি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করে। আর ভূকৌশলগত দিক থেকে এটি ভারতের কাছে চীন ও পাকিস্তান, দুই দিক থেকে হুমকির আশঙ্কাকে আরও জোরালো করে। এতে পাকিস্তান সন্তুষ্ট হয় এবং চীনও লাভবান হয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘোষণাটির সময়ও গুরুত্বপূর্ণ।

হাক্কানি বলেন, ‘চীন সবসময় কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর আগেই নিজেদের সিদ্ধান্ত পরিকল্পনা করে। তাই যৌথ সীমান্ত কমিশনকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই বেশ কিছু সময় আগেই নেওয়া হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘তথ্য প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলন সফরের পর। এর মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদারিত্বে পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করার বার্তা এবং ভারতকে এই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততার অর্থ দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন নয়।’

তবে জ্যাকব সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই উন্নয়নের প্রতিটি দিককে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে এলএসি নিয়ে এর কোনো তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান প্রভাব নেই।’

এ থেকে বোঝা যায়, গত সপ্তাহের ঘোষণার গুরুত্ব হয়তো হিমালয়ের বিতর্কিত সীমান্তে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের মধ্যে নয়। বরং এর গুরুত্ব নিহিত থাকতে পারে এমন কিছু ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মধ্যে, যেগুলো ভারত ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।

ভারতের অবস্থান ‘স্পষ্ট ও ধারাবাহিক’—বলে অবস্থান ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। দিল্লি যে ভূখণ্ডকে পাকিস্তানের অবৈধ দখলে থাকা ভারতীয় ভূখণ্ড বলে মনে করে, সেটিকে বৈধতা দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা ভারতের কাছে অগ্রহণযোগ্য এবং এর মাধ্যমে ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না।

তবে হাক্কানির মতে, বিরোধটি সীমান্তের আইনি প্রশ্নের চেয়েও বড়। তিনি বলেন, ‘সীমান্ত ও সীমানা নিয়ে ভারত ও চীনের মধ্যে মূল মতপার্থক্যটি ভূকৌশলগত, মানচিত্রগত নয়। ফলে সীমান্ত নিয়ে আলোচনা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থাগুলো কতটা অর্জন করতে পারে, তারও একটি সীমা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান এখনো ‘ভারতের বিরুদ্ধে চীনের দ্বিতীয় সারির ডিটারেন্ট বা প্রতিরোধক’ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। আর বেইজিংয়ের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পৃক্ততা দিল্লিকে সেই বার্তাই দিয়ে যেতে থাকবে।
সূত্র: বিবিসি 

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.