× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নেই পর্যাপ্ত ‘ব্যাকআপ’, ঝুঁকিতে সরবরাহ

ডেস্ক রিপোর্ট।

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৪ এএম

ছবি: সংগৃহীত।

দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে একযোগে সংকট থাকায় বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে তা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কার্যকর ব্যাকআপ থাকছে না।

ফলে একটি বড় কেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটিও জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। এতে বাড়ছে লোডশেডিং।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই বহুমুখী সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আদানির একটি ইউনিটের আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেখিয়ে দিয়েছে, দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় স্থাপিত সক্ষমতা থাকলেও সংকটের সময় কাজে লাগানোর মতো কার্যকর অতিরিক্ত সক্ষমতা বা ‘ব্যাকআপ’ খুবই সীমিত। ফলে বড় কোনো কেন্দ্র কারিগরি ত্রুটি বা জ্বালানিসংকটে বন্ধ হলে তার চাপ সরাসরি জাতীয় গ্রিড ও গ্রাহকের ওপর পড়ছে।

ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় গত ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টায় আদানি পাওয়ারের দুটি ইউনিটের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির এই দুর্বলতা আরো স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বয়লারে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার দিকে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

ওই দিন রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি ইউনিট থেকে ঘণ্টায় ১৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এর পর রাত ১২টার দিকে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বয়লারে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার বিকেল ৪টায় আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট থেকে ৭৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছে মেরামত শেষ করে উৎপাদনে ফিরতে চার থেকে পাঁচ দিন লাগতে পারে। যদিও এরই মধ্যে দুই দিন চলে গেছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে ইউনিটটি আবার উৎপাদনে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।’

বিপিডিবি ও পিজিসিবি সূত্র জানায়, এর আগে কয়লা সরবরাহসংকটেও আদানির কেন্দ্রটির উৎপাদন কমে এসেছিল। ঝড়ের কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। পরে আগস্টের শেষ দিকে কয়লা সরবরাহ বাড়লে উৎপাদনও বাড়তে শুরু করে। দিনের বেলায় কেন্দ্রটি প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। উৎপাদন বাড়ার পরই একটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

আদানির ইউনিট বন্ধের সময় দেশের বিদ্যুত্ব্যবস্থাও ছিল চাপে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় প্রায় ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় তিন হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। ওই দিন গড়ে প্রতি ঘণ্টায় দুই হাজার ৬৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। তবে শুক্রবার দুপুরে ঘাটতি ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে নেমে আসে। গতকাল শনিবার বিকেল ৪টায় ১৪ হাজার ৬০৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৩১ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি ছিল ৫৭৭ মেগাওয়াট।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৮০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট রয়েছে। ২০১৭ সালে কেন্দ্রটির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি করে বিপিডিবি। চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রটি থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের রেকর্ড রয়েছে।

সক্ষমতা আছে, উৎপাদনের ব্যাকআপ নেই : দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। এর তুলনায় আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কমে যাওয়া ৬০০ থেকে ৭০০ মেগাওয়াট খুব বেশি নয়। স্বাভাবিক সময়ে অন্য কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়িয়ে এ ঘাটতি সহজেই পূরণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানি—তিন খাতেই নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে কোনো একটি কেন্দ্র বন্ধ হলে অন্য কেন্দ্রগুলো থেকে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্যাসের সংকটে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সীমিত। একই সঙ্গে কয়েকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র জ্বালানিসংকট ও কারিগরি সমস্যায় রয়েছে। অন্যদিকে পিক সময়ে এরই মধ্যে ফার্নেস অয়েল (এইচএফওভিত্তিক) কেন্দ্রগুলোকে বাড়তি উৎপাদন করতে হচ্ছে। ফলে বড় কোনো কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হলে তা সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, গতকাল দুপুর ১টায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয় পাঁচ হাজার ১৪৮ মেগাওয়াট, তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে হয় ২০০৮ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৫০১০ মেগাওয়াট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ৮২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। যদিও এসব খাতভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগে থেকেই একটি পরিকল্পনা থাকা দরকার। গ্যাসের সংকট কিংবা অন্য কোনো কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই বছরের শুরুতেই সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিভাবে চাহিদা ব্যবস্থাপনা করা হবে, কোন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিচালনা করা হবে এবং সংকটের সময় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। সংকট তৈরি হওয়ার পর দেখা যায়, অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল বা অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে। ফলে প্রয়োজনের সময় কেন্দ্রগুলো চালু করাও কঠিন হয়ে পড়ে।’

শফিকুল আলম আরো বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা বারবার আমাদের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দুর্বলতা বা ঝুঁকিপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরছে। তাই এখন নিজস্ব জ্বালানির উৎস বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়বে।’

চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের শুরু চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকেও বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহ দৈনিক গ্যাসের ঘাটতি থাকছে ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এতে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিকে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে।

সর্বশেষ উৎপাদন পরিস্থিতির তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক ৫৯টি কেন্দ্র বা ইউনিটের মধ্যে অন্তত ২৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের স্বল্প চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বড় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, আবার কিছু কেন্দ্র সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

গ্যাসসংকটের কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিকল্প জোগানের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সেখানেও প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে দেশে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট স্থাপিত সক্ষমতা আট হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট। কিন্তু গত শনিবার দুপুরে এসব কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে।

গ্যাসের সংকট সামাল দিতে সরকার ক্রমেই তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সেপ্টেম্বরে ৫৩টি সরকারি ও বেসরকারি কেন্দ্র থেকে গড়ে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদন গড়ে প্রায় দুই হাজার ২০০ মেগাওয়াটে রয়েছে।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.