ছবি: সংগৃহীত।
দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ৬২ লাখ নারী-পুরুষকে বয়স্ক ভাতা দিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে চলতি বছর ভাতার পরিমাণও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ।
তবে বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য অনেক প্রবীণ এ কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো গেলে যোগ্য সব প্রবীণকে পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) নিজ দপ্তরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির আওতা প্রতি বছরই ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একসময় ৬০ লাখ প্রবীণকে এ ভাতা দেওয়া হতো। পরে উপকারভোগীর সংখ্যা ৬১ লাখে উন্নীত করা হয়। চলতি বছর আরও ১ লাখ প্রবীণকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে মোট ৬২ লাখ প্রবীণ এ সুবিধা পাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এখনো সব প্রবীণকে আমরা আওতার মধ্যে আনতে পারিনি। যাদের বয়স নারীদের ক্ষেত্রে ৬০ বছর বা তার বেশি এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বা তার বেশি, তারা বয়স্ক ভাতা পাওয়ার জন্য যোগ্য।’
সচিব বলেন, নির্ধারিত বয়সসীমা পূরণ করলেই সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বয়স্ক ভাতার সুবিধা পান না। এক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা ও যোগ্যতার বিষয় রয়েছে। আবেদনকারীদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে উপকারভোগী নির্বাচন করা হয়। ফলে, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মসূচির আওতায় নেওয়া সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, বর্তমানে বয়স্ক ভাতার জন্য কিছু আবেদন রয়েছে, যেগুলো বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে সরকার এ বিষয়ে সচেতন এবং ভবিষ্যতে বাজেটের সক্ষমতা বাড়লে পর্যায়ক্রমে সব যোগ্য ব্যক্তিকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনার চেষ্টা করা হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, প্রবীণ জনগোষ্ঠী দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ। তাদের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মূল্যবান সম্পদ। কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার অর্থ কোনোভাবেই সমাজে একজন মানুষের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি তাদের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বয়স্ক ভাতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় প্রবীণদের জন্য এই ভাতা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে কিছুটা সহায়তা করছে। পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পাশাপাশি প্রবীণদের আত্মমর্যাদা বজায় রাখতেও এ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ভূমিকা রাখছে।
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তার মতে, দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন প্রবীণ। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও বাড়বে। ফলে প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ চলাচল ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
প্রবীণদের চলাচলের সুবিধার বিষয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ। তিনি বলেন, দেশের রেল ও মেট্রোরেলসহ কিছু গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রবীণদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে।
গণপরিবহনে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ ভাড়ার ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। তিনি জানান, রেল ও মেট্রোরেলসহ পাবলিক ট্রান্সপোর্টে প্রবীণদের জন্য ২৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রবীণদের জন্য কেবল আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত, নিরাপদ আবাসন, বিনোদন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। প্রবীণবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে তারা পরিবার ও সমাজে আরো সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সচিব বলেন, প্রবীণদের কল্যাণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোতে প্রবীণদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের দেখাশোনার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এই মূল্যবোধ ধরে রাখার পাশাপাশি আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবীণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, অনেক প্রবীণ এখনো শারীরিকভাবে সক্ষম এবং তারা বিভিন্নভাবে সমাজে অবদান রাখতে পারেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে একদিকে যেমন প্রবীণদের সক্রিয় জীবন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নবীন প্রজন্মও তাদের কাছ থেকে উপকৃত হবে।
বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে— সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও লক্ষ্যভিত্তিক করা। প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে তাদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষ উপকৃত হবেন, অন্যদিকে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, বয়স্ক ভাতার আওতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উপকারভোগীদের ভাতার পরিমাণও পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও কিছুটা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আগের তুলনায় বেশি আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন।
ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি আরো বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বয়স্ক ভাতার আওতাও আরো সম্প্রসারিত হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বাজেট বৃদ্ধি পেলে বয়স্ক ভাতা পাওয়ার যোগ্য সকল ব্যক্তিকে পর্যায়ক্রমে এ ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
সরকারের এ উদ্যোগের ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষ আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, তবে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে শুধু ভাতা প্রদান নয়, স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহনে বিশেষ সুবিধা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগসহ সমন্বিত প্রবীণবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে সম্ভব হবে।
সূত্র: বাসস
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
