× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

রমজানের ইফতারে ছোলা-মুড়ির দেশীয় পরম্পরা

সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

০৫ মার্চ ২০২৬, ১৪:৩৭ পিএম

ছবি: সংগৃহীত।

রমজান, আল্লাহর রহমত ও বরকতের মাস, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তই ইবাদত, আত্মসংযম এবং পরিবারের সঙ্গে মেলবন্ধনের সময়। এই পবিত্র মাসে ইফতারের টেবিলে নানা ধরনের খাবার সাজানো হয়। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, রোজা খোলার সময় প্রথমে খেজুর ও পানি খাওয়াই সুন্নাহ। খেজুরের মধুর স্বাদ এবং পানির সতেজতা রোজাদারের শরীরকে প্রস্তুত করে ইফতার নেয়ার জন্য। খেঁজুর ও পানির পরেই সাধারণত ছোলা-মুড়ি রাখা হয়, যা দেশের প্রাচীন এবং সরল খাবার হিসেবে ইফতারের টেবিলে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।

ছোলা-মুড়ি শুধু স্বাদের খাবার নয়; এটি স্মৃতি, শিকড় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। আমাদের দেশে রমজান মাসে ইফতারের ঐতিহ্যগত খাবারের মধ্যে ছোলা-মুড়ির অবস্থান বিশেষ। এটি রোজাদারদের জন্য নীরব ভাষ্যের মতো সংযমের শিক্ষা, সাম্যের প্রতীক এবং সামাজিক মিলনের একটি নিখুঁত মাধ্যম। ছোলা-মুড়ি হাতে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যখন একে অপরের সঙ্গে গল্প এবং হাসি ভাগাভাগি করে, তখন এটি শৈশবের সুখস্মৃতি, মাদুরে বসার আনন্দ, এবং মিলনমেলার অনুভূতির সঙ্গে একত্রিত হয়ে যায়।

গ্রামের বাড়িতে মাদুর পেতে সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করার দৃশ্য চিরচেনা। বড়দের পাশে বসে ছোটরা অপেক্ষা করে আজানের ধ্বনির জন্য। সেই পরিবেশে ছোলা-মুড়ির থালা যেন ইফতারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। শহরেও একই আবহ দেখা যায় ব্যস্ততার মাঝেও পরিবারের সদস্যরা ইফতারের সময় একত্রিত হয়, আর টেবিলের এক পাশে থাকেই চেনা স্বাদের ছোলা-মুড়ি।

ছোলা-মুড়ি কেবল স্বাদ এবং ঐতিহ্যের জন্য নয়, স্বাস্থ্যকরও। ছোলা প্রোটিন, ফাইবার এবং আয়রনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা রোজাদারের শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। মুড়ি হালকা কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে, যা রোজার শেষ মুহূর্তে শরীরকে দ্রুত শক্তি দেয়। এছাড়া ছোলা-মুড়ি খাওয়ার ফলে হজম সহজ হয়, শরীর সতেজ থাকে এবং দীর্ঘ সময় ক্ষুধার অনুভূতি কম হয়। তাই এটি পুষ্টিকর, হালকা এবং স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।

বাংলাদেশের রমজানি বাজারগুলো এই ঐতিহ্যকে প্রাণবন্ত রাখে। দেশের বাজারে ইফতারের বিশেষ আয়োজনগুলোতে ক্রেতাদের চোখে ভেসে ওঠে জিলাপি, বুরিন্দা, বেগুনি, আলুর চপ, পেঁয়াজু, পাকোড়া এই সব খাবারের সঙ্গে ছোলা-মুড়ি যেন একটি অপরিহার্য সংযোজন।

রমজানে মুড়ি মাখানোর নিজস্ব একটি শিল্পও রয়েছে। ইফতারের এই সব সামগ্রীর সঙ্গে শসা, টমেটো, ধনেপাতা কুচি এবং সরিষার তেল মিশিয়ে মুড়ি মাখানো হয়, যা তৈরি করে এক চমৎকার স্বাদের সমাহার। এই মুহূর্তটাই রমজানের ইফতারের মুহুর্তকে বিশেষ করে তোলে। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় অম্ল-মধুর বিতর্ক: “আমার মুড়িতে জিলাপি কেন!”—এক ধরনের আর্তনাদ, যা প্রতিটি রমজানই নতুন করে ফিরে আসে। এই বিতর্ক, মজা, হাসি এবং কৌতূহল মিশিয়ে ইফতারের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে।

ছোলা-মুড়ি সাম্য ও সহজ জীবনধারার প্রতীকও। ধনী-গরীব নির্বিশেষে, সকলেই একই স্বাদের ছোলা-মুড়ি উপভোগ করে। এটি কেবল খাওয়া নয়, বরং সাম্যের শিক্ষা, সামাজিক মিলন এবং ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।

আধুনিক সময়ে দেশি, বিদেশি নানা বাহারি স্বাদের খাবারগুলো টেবিলে আসে, তবুও ছোলা-মুড়ি তার প্রাচীন স্বাদ এবং সামাজিক অর্থের কারণে আজও ইফতারের টেবিলে অদ্বিতীয়। খেজুর পানি খাওয়ার পর সরাসরি ছোলা-মুড়ির উপস্থিতি এই ইফতারের টেবিলকে আরও প্রথাগত ও প্রাণবন্ত করে তোলে।

ছোলা-মুড়ি আমাদের সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করে। এটি প্রতিটি প্রজন্মকে তার শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। রোজাদাররা যখন একে হাতে নিয়ে স্বাদ গ্রহণ করে, তখন তা শুধুমাত্র ক্ষুধা মেটাচ্ছে না, বরং এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগও স্থাপন করছে। সরল অথচ গভীর এই খাবার, সংযম, সাম্য, সামাজিক মিলন এবং স্বাস্থ্যকর খাওয়ার নিখুঁত প্রতীক হিসেবে রমজানের প্রতিটি ইফতারের মুহূর্তকে পূর্ণতা দেয়।

লেখক: সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.