× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

রিসালাতের চিরন্তন নূর ও রহমাতুল্লিল আলামিন (সা.)

সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান

২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৯ এএম । আপডেটঃ ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৪ এএম

হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র নবুওয়াত ও রিসালাত মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি এক মহান অনুগ্রহ ও রহমত। রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে নবীদের তাওহিদের দাওয়াত পূর্ণতা লাভ করেছে। সুস্পষ্ট হয়েছে হেদায়াতের পথ এবং মানুষ লাভ করেছে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের পরিপূর্ণ দিশা।

রাসুল (সা.)-এর  মর্যাদা কোনো পার্থিব ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তুলনার বিষয় নয়। তিনি সেই পবিত্র রাসুল, যাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন ব্যতীত মুমিন হওয়া সম্ভব নয়। যাঁর আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত।

যাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ও তাঁর ফেরেশতাগণ এবং মুমিনদেরও যাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে। তাঁর নাম উচ্চারিত হলে মুমিনের অন্তর ও জিহ্বা দরুদে সিক্ত হয়, তাঁর শানে আলোচনা হলে অন্তরে তাজিম জাগে, তাঁর জীবন স্মরণ হলে সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা নবায়িত হয়। কোরআনের ভাষায় তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন তথা সমগ্র জগতের জন্য রহমত। রাসুল (সা.)-এর রিসালাতের মাহাত্ম্য তাই কোনো একটি যুগ, ভূখণ্ড বা জাতির ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর আনীত হেদায়াত সমগ্র মানবতার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এক চিরন্তন অনুগ্রহ। 

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, “আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সুরা আল-আম্বিয়া:১০৭) আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিচয়ের মহান মাকাম ও মর্যাদার এক অনন্য দিক উন্মোচন করে দিয়েছেন। যার মধ্যে রাসুল (সা.) এর সমগ্র রিসালাতের তাৎপর্য বিদ্যমান। 

তিনি রহমত কারণ তাঁর মাধ্যমে মানুষ তাওহিদের পরিচয় পেয়েছে। তিনি রহমত কারণ তাঁর মাধ্যমে কোরআনের হেদায়াত মানুষের কাছে পৌঁছেছে। তিনি রহমত কারণ তাঁর সুন্নাহ মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার বাস্তব আদর্শ দিয়েছে। তিনি রহমত কারণ তাঁর শিক্ষা মানুষের হৃদয়, পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার নৈতিক ভিত্তিকে আল্লাহমুখী করেছে। রাসুল (সা.) আগমন মানুষের বাহ্যিক জীবনকে শুধু পরিবর্তন করেনি; মানুষের অন্তরের দিকনির্দেশও পরিবর্তন করেছে। অন্ধকারের ভেতর থেকে মানুষকে আলোয়, গোমরাহির ভেতর থেকে হেদায়াতে এবং সৃষ্টির মোহ থেকে স্রষ্টার পরিচয়ের দিকে ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁর রিসালাতের মহান তাৎপর্য।

রাসুল (সা.)-এর রিসালাতকে বুঝতে হলে কোরআনের সেই ভাষার দিকে তাকাতে হয়, যেখানে তাঁর আগমনকে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন।” (সুরা আল ইমরান: ১৬৪)। রাসুলের আগমন যে কত বড় নিয়ামত, এই আয়াত তারই সাক্ষ্য বহন করে। 

মানুষের কাছে জ্ঞান থাকতে পারে, সম্পদ ও প্রাচুর্য থাকতে পারে, পার্থিব উন্নতি থাকতে পারে; কিন্তু তার রবের পরিচয়, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং আখিরাতের পথ সম্পর্কে ওহির নূর ব্যতিত সেই জীবন পূর্ণতা পায় না। মহানবী (সা.) সেই ওহির নূর নিয়েই মানবতার দ্বারে আগমন করেছেন। উনার মাধ্যমে মানুষ পেয়েছে আল্লাহর কালাম পবিত্র আল কোরআন। পেয়েছে হালাল-হারামের সুস্পষ্ট বিধান, সত্য ও অসত্যের পার্থক্য এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের পথ। তাঁর জীবন হয়েছে কোরআনের বাস্তব শিক্ষা, আর তাঁর রিসালাতের মাধ্যমে মানুষ পেয়েছে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সুস্পষ্ট পথ।

সাইয়্যিদুল কাওনাইন হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর  রিসালাতের নূরকে কোরআন আরেক জায়গায় এমন এক ভাষায় তুলে ধরেছে, যা হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে এক নূর এবং এক সুস্পষ্ট কিতাব।”(সুরা আল-মায়িদা: ১৫)। ‘নূর’ শব্দের মধ্যে রয়েছে আলোর অর্থ। কোরআনের হেদায়াতের আলো এবং রাসুল (সা.) এর রিসালাতের আলো মিলেই মানুষের সামনে সত্যের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। সেই নূর কোনো প্রদীপের আলো নয়, কোনো সূর্যোদয়ের আলো নয়; এটি অন্তরের আলো, যে আলো মানুষকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখায়, নিজের স্রষ্টাকে চিনতে শেখায় এবং নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে শেখায়।

মানুষ যখন নিজের পরিচয় ভুলে যায়, তখন পৃথিবীর প্রাচুর্যও তার অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। যখন স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়, তখন বাহ্যিক সাফল্যের মধ্যেও এক ধরনের অস্থিরতা জন্ম নেয়। মহানবী (সা.)-এর রিসালাত সেই অন্তর্গত শূন্যতার জন্য হেদায়াতের বার্তা নিয়ে এসেছে। কোরআন ঘোষণা করেছে, “আলিফ-লাম-রা। এটি এমন এক কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিতের পথে বের করে আনতে পারেন।”(সুরা ইবরাহিম:১)। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনা এটাই ছিল নবীজির দাওয়াতের একটি মৌলিক পরিচয়। অজ্ঞতার অন্ধকার, শিরকের অন্ধকার, নৈতিক অবক্ষয়ের অন্ধকার, অহংকারের অন্ধকার এবং আল্লাহ বিমুখতার অন্ধকার থেকে মানুষকে হেদায়াতের আলোয় ফিরিয়ে আনা তাঁর রিসালাতের মহান দায়িত্ব।

মহানবী (সা.)-এর আগমন তাই মানবসভ্যতার নৈতিক ইতিহাসেও এক অনন্য অধ্যায়। তিনি এমন এক সমাজে তাওহিদের কালেমা উচ্চারণ করেছেন, যেখানে বহু উপাস্যের ধারণা মানুষের বিশ্বাসকে গ্রাস করেছিল। তিনি এমন সমাজে ন্যায় ও আমানতের শিক্ষা দিয়েছেন, যেখানে শক্তি অনেক সময় অধিকারের মাপকাঠি হয়ে উঠেছিল। তিনি মানুষের মর্যাদাকে বংশ, সম্পদ ও ক্ষমতার গণ্ডি থেকে তুলে ইমান ও তাকওয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।” (সুরা আল-হুজুরাত:১৩)। এই আয়াতের মাধ্যমে মানবমর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি সুস্পষ্ট হয়েছে আল্লাহর কাছে বান্দার মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার অন্তরের তাকওয়া ও রবের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে। মহানবী (সা.)-এর রিসালাত মানুষকে সেই তাকওয়া, পরিশুদ্ধি ও আল্লাহমুখী জীবনের পথেই আহ্বান করেছে।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতের মহিমা তাঁর মহান আখলাকে এমন পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে, যার সাক্ষ্য স্বয়ং পবিত্র কোরআন দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।”(সুরা আল-কলম:৪)। কোরআনের এই একটি আয়াত যেন তাঁর পবিত্র জীবনের বিস্তৃত অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারি, বিনয়, দয়া, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য সবকিছু তাঁর মহান চরিত্রের বিভিন্ন প্রকাশ। তিনি এমন এক চরিত্র রেখে গেছেন, যেখানে ইবাদতের সৌন্দর্য এবং মানুষের সঙ্গে আচরণের সৌন্দর্য একই সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে।

মহানবী (সা.)-এর চরিত্রকে আল্লাহ তাআলা শুধু প্রশংসিত করেননি; তাঁর জীবনকে মুমিনের জন্য অনুসরণীয় আদর্শও করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই, তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তার জন্য, যারা আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।”(সুরা আল-আহযাব:২১)। এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর জীবনের ব্যাপ্তিকে সামনে আনে। উনার জীবনের কোনো একটি অংশ নয়, বরং সমগ্র জীবনই মুমিনের জন্য আদর্শ। ইবাদতে উনার বিনয়, বিপদে  সবর, মানুষের সঙ্গে কোমলতা, দায়িত্ব পালনে দৃঢ়তা, পরিবারে সৌন্দর্য, সমাজে ন্যায় এবং আল্লাহর ওপর  তাওয়াক্কুল সবই মুমিন জীবনের জন্য শিক্ষা।

রাসুল (সা.)-এর চরিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল দিক ছিল কোমলতা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।”(সুরা আল ইমরান:১৫৯)। এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর দাওয়াতের পদ্ধতি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের এক গভীর সত্য প্রকাশ করে। সত্যের ব্যাপারে উনি ছিলেন দৃঢ়, কিন্তু মানুষের সঙ্গে আচরণে ছিলেন কোমল। উনার দয়া দুর্বলতা ছিল না; উনার কোমলতা সত্যের প্রতি আপস ছিল না। বরং উনার রহমত ও প্রজ্ঞাই মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে দিয়েছিল।

উম্মতের প্রতি রাসুল (সা.) মমতার যে চিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, তা নবীপ্রেমের অন্তর্গত সৌন্দর্যকে আরও গভীর করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদের ক্ষতিকর বিষয় উনার কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।”(সুরা আত-তাওবা:১২৮)।

কোরআনের এই আয়াতে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে উম্মতের সম্পর্কের এক হৃদয়স্পর্শী পরিচয় ফুটে ওঠে। উম্মতের কষ্ট আল্লাহর হাবীবকে ব্যথিত করত, তাদের কল্যাণ ছিল উনার চিন্তার বিষয় এবং তাদের হেদায়াতের প্রতি রাসুল (সা.) ছিল গভীর আকাঙ্ক্ষা।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত ও রিসালাতের মধ্যে তাই আল্লাহর বিধান ও হেদায়াতের পাশাপাশি রহমতের বিস্তৃত ছায়াও ছিল।

এই রহমতই আল্লাহর হাবীব (সা.)-এর রিসালাতের অন্যতম স্বাতন্ত্র্য। তিনি মানুষকে তার রবের পরিচয় দিয়েছেন এবং তাওহিদের পথে আহ্বান করেছেন। তাঁর দাওয়াত মানুষকে শিখিয়েছে মানুষ কোনো সৃষ্টির দাস নয়, সে একমাত্র আল্লাহ তাআলার বান্দা। রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, শক্তিশালী-দুর্বল-সকলেই একই রবের বান্দা। তাওহিদের এই শিক্ষা মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও প্রকৃত মর্যাদাবোধ জাগ্রত করেছে।

মহানবী (সা.)-এর প্রতি মুমিনের মহব্বতও তাই তাওহিদের আলোতেই পূর্ণতা পায়। তাঁর প্রতি ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসার পথে নিয়ে যায়। কোরআন ঘোষণা করে, “বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করবেন।”(সুরা আল ইমরান:৩১)। এই আয়াত নবীপ্রেমকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। রাসুল  (সা.)-এর প্রতি মহব্বত শুধু হৃদয়ের অনুভূতি নয়; তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসা, তাঁর আদর্শকে সম্মান করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনার মধ্যেও সেই মহব্বতের প্রকাশ ঘটে।

কোরআন মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চতায় স্থাপন করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।”(সুরা আন-নিসা:৮০)। এই আয়াত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াত ও রিসালাতের কর্তৃত্ব ও মর্যাদার সুস্পষ্ট ঘোষণা। তিনি নিজের পক্ষ থেকে দ্বীনের কোনো ভিত্তি তৈরি করেননি; তিনি আল্লাহর ওহির বাহক। উনার আনুগত্য করার নির্দেশ স্বয়ং রাব্বুল আলামিন দিয়েছেন। তাঁর সুন্নাহর অনুসরন তাই মুমিন জীবনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ।

মহানবী (সা.)-এর প্রতি তাজিমের ভাষাও কোরআন মুমিনকে শিখিয়েছে। তাঁর সামনে কণ্ঠস্বর উঁচু না করার নির্দেশ, তাঁর প্রতি আদব বজায় রাখার শিক্ষা এবং তাঁর মর্যাদাকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করার আহ্বান সবই কোরআনের আয়াতে বিদ্যমান। ইসলামী সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে নবীজির প্রতি এই তাজিম শুধু একটি আবেগ নয়; এটি মুসলিম আখলাকের অংশ হয়ে উঠেছে। তাঁর নাম উচ্চারণের সঙ্গে দরুদ পড়া, তাঁর শানে আলোচনা হলে সম্মান বজায় রাখা এবং তাঁর সুন্নাহকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা সেই আদবেরই বহিঃপ্রকাশ।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম প্রেরণ করো।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৬) পবিত্র কোরআনের এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর মর্যাদার এক অনন্য প্রকাশ। আল্লাহ তাঁর হাবীবের প্রতি পাঠ করেন, ফেরেশতাগণ তাঁর প্রতি দরুদ পড়ে এবং মুমিনদেরও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দরুদ তাই মুসলিমের কাছে শুধু ভালোবাসার প্রকাশ নয়; এটি কোরআন নির্দেশিত পবিত্র আমল। তাঁর নামের সঙ্গে দরুদের যে সম্পর্ক মুমিনের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত, তা এই আয়াতের নূরেই আলোকিত।

মহানবী (সা.) ছিলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী এবং আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী। কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেছেন, “হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি; আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী এবং আলোকদীপ্ত প্রদীপ হিসেবে।”(সুরা আল-আহযাব:৪৫-৪৬)। ‘আলোকদীপ্ত প্রদীপ’ এই পরিচয়ের মধ্যে মহানবী (সা.)-এর রিসালাতের এক গভীর তাৎপর্য বিদ্যমান। তাঁর মাধ্যমে অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয় হেদায়াতের পথের সন্ধান পেয়েছে, সত্য ও অসত্যের পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়েছে এবং মানুষ তার রবের দিকে ফিরে যাওয়ার পথ চিনতে পেরেছে।

সাইয়্যিদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মদ (সা.) রিসালাতের ব্যাপ্তি ছিল সর্বজনীন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।”(সুরা সাবা:২৮)।  রাসুল (সা.)-এর দাওয়াত কোনো নির্দিষ্ট গোত্রের জন্য ছিল না, কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্য ছিল না। তাঁর বার্তা মানবতার জন্য। তাঁর ওপর নাজিল হওয়া কোরআন কিয়ামত পর্যন্ত হেদায়াতের কিতাব। তাঁর সুন্নাহ মুমিন জীবনের জন্য আদর্শ। তাঁর রিসালাতের সার্বজনীনতা তাঁকে মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আর তাঁর রিসালাতের পূর্ণতা এসেছে নবুয়তের সমাপ্তির মাধ্যমে। কোরআন স্পষ্ট ঘোষণা করেছে, “মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং সর্বশেষ নবী।”(সুরা আল-আহযাব:৪০)। ‘খাতামুন নাবিয়্যিন নবুয়তের সমাপ্তির এই ঘোষণা মহানবী (সা.)-এর রিসালাতের পূর্ণতা ও চূড়ান্ততার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। উনার পরে আর কোনো নবী নেই; কোনো নতুন রাসুলও প্রেরিত হবেন না। উনার ওপর নাজিল হওয়া কোরআন আল্লাহর হেফাজতে সংরক্ষিত কিতাব এবং উনার সুন্নাহ মুসলিম উম্মাহর জন্য হেদায়াতের আলোকবর্তিকা। 

নবুয়তের সমাপ্তির সঙ্গে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত যেমন পূর্ণতা লাভ করেছে, তেমনি উনার মাধ্যমে প্রেরিত ইসলাম পূর্ণাঙ্গ দ্বীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সুরা আল-মায়িদা: ৩)। এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর রিসালাতের পরিপূর্ণতা ও ইসলামের চূড়ান্ততার এক সুস্পষ্ট ঘোষণা। এই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের বাস্তব রূপ মহানবী (সা.)-এর জীবনেই প্রতিফলিত হয়েছে। কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর কোরআন, রাসুল (সা.) সুন্নাহ অনুসরণ করে মানুষ হেদায়েত প্রাপ্ত হবে। 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-এর প্রতি ঈমান, তাঁর সম্মান ও তাঁর আনুগত্যকে মুমিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে নবী করিম (সা.)-এর সত্যিকারের মহব্বতে পরিপূর্ণ করুন, তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার তাওফিক দান করুন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফায়াত নসিব করুন। 

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদ, ওয়া বারিক ওয়া সাল্লিম। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর প্রতি অগণিত দরুদ ও সালাম পেশ করার তাওফিক দান করুন এবং তাঁর পবিত্র সুন্নাহর ওপর অবিচল রেখে ঈমানের সঙ্গে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.