বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, গত ১৫ বছরে হাজারো মানুষের প্রাণ বিসর্জনের বিনিময়ে আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ একত্রিত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অধিকার, বাক্স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ রাজপথে নেমেছে বলেই আজ এই জনসমাগম সম্ভব হয়েছে।
সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনি সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, এই অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিএনপি ও দেশ অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। আমরা আমাদের মাঝ থেকে ইলিয়াস আলীকে হারিয়েছি, জুনায়েদকে হারিয়েছি, দিনারকে হারিয়েছি। তিনি বলেন, গত এক বছর আগে যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তারা তখন দেশের মানুষের টুঁটি চেপে ধরেছিল। তারা বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিল, ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, তারা শুধু ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেনি, সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকারও কেড়ে নিয়েছে। ইলিয়াস আলী, জুনায়েদ, দিদারের মতো শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ও লক্ষ লক্ষ বিএনপি নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জর্জরিত করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, গত ১৫ বছরে উন্নয়নের নামে দেশের মানুষের সম্পদ কীভাবে লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা সবাই দেখেছে।
তিনি সিলেট–ঢাকা মহাসড়কের উদাহরণ টেনে বলেন, ২০০৫ সালে সুনামগঞ্জে বন্যার সময় ঢাকা থেকে আসতে সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল, অথচ এখন সিলেট থেকে ঢাকায় যেতে ১০ ঘণ্টা লেগে যায়। তিনি বলেন, সিলেটের বহু মানুষ লন্ডনে যাতায়াত করেন-প্লেনে লন্ডন যেতে এত সময় লাগে না, অথচ দেশের ভেতরে এই অবস্থা। এটা ছিল তথাকথিত উন্নয়নের ফিরিস্তি।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, গত ১৫–১৬ বছরে একের পর এক নির্বাচনে ব্যালট বক্স ছিনতাই হয়েছে। আমরা দেখেছি আমির নির্বাচন, নিশিরাতের নির্বাচন। এসব তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আজকের এই সমাবেশ সেই মানুষগুলোর জীবনের বিনিময়ে সম্ভব হয়েছে, যারা রাজপথে নেমে এসেছিল। ২৪-এর গণ-আন্দোলনের সময় সিলেট শহরে ১৩ জন প্রাণ দিয়েছেন। এই আত্মত্যাগের মাধ্যমেই অধিকার আদায়ের পথে দেশ এগিয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, নির্যাতিত, নিরুপায় ও মধ্যবিত্ত–নিম্নবিত্ত পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে বিএনপি “ফ্যামিলি কার্ড” চালু করতে চায়। এই কার্ডের মাধ্যমে মা–বাবা, স্ত্রী ও বোনদের মাধ্যমে পরিবার সহযোগিতা পাবে।
তিনি বলেন, “এই ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করতে হলে কী করতে হবে?”— ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে মা–বোনদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই শিক্ষিত নারী সমাজকে বিএনপি সরকার অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, দেশের লক্ষ লক্ষ যুবক–যুবতী বেকার হয়ে বসে আছে। বিএনপি তাদের বেকার রাখতে চায় না। সিলেটের মানুষ দেশ–বিদেশে বিশেষ করে লন্ডন, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যান। এই মানুষদের প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে।
তিনি বলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা তখনই সম্ভব, যখন ধানের শীষ জয়যুক্ত হবে।
তারেক রহমান আরও বলেন, দেশের ভেতরে ও বাইরে আবারও ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো পোস্টাল ব্যালট কীভাবে ডাকাতি করা হয়েছে, তা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে। যারা আগে ভোট ডাকাতি করেছিল, তারাই আবার নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এখন আমি আপনাদের সামনে একটি প্রশ্ন করতে চাই, এখানে কারা (মাঠে উপস্থিত) ওমরা বা হজ করে এসেছেন, হাত তোলেন। এ সময় মাঠে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি হাত তোলেন। তাদের মধ্যে একজনকে মঞ্চে ডেকে আনেন তারেক রহমান এবং তাকে জিজ্ঞাসা করেন- আপনি কাবা শরীফে গেছেন? কাবা শরীফের মালিক কে? তখন ওই ব্যক্তি বলেন, আল্লাহ। তারেক রহমান বলেন, আমরা সবাই মুসলমান। এই দিন-দুনিয়ায় যা দেখি, এই পৃথিবীর মালিক কে? হজকারী ব্যক্তি বলেন আল্লাহ।
চেয়ারম্যান প্রশ্ন রাখেন এই সূর্য, নক্ষত্র যা দেখি তার মালিক কে? বেহেশতের মালিক কে? আপনারা সবাই সাক্ষী দিলেন- দোজখ, বেহেশতের মালিক আল্লাহ। এই পৃথিবী, কাবার মালিক আল্লাহ। আরে ভাই যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? রাখে না। তাহলে কী দাঁড়াল? নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দেবো, ওই দেবো বলছে, টিকিট দেবো, বলছে না? যেটার মালিক মানুষ না, সেটার কথা যদি সে বলে, তাহলে কি শিরক করা হচ্ছে না? যার মালিক আল্লাহ, যার অধিকার শুধু মাত্র আল্লাহর। কাজেই আগেই তো আপনাদের ঠকাচ্ছে। নির্বাচনের পরে কেমন ঠকাবে এবার বোঝেন। শুধু ঠকাচ্ছে না, যারা মুসলমান তাদের শিরক করাচ্ছে, নাউজুবিল্লাহ।
তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যারা কী ভূমিকা রেখেছিল, তা বাংলাদেশের মানুষ জানে। মিথ্যা ও কুফরির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছে, এখন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু ভোট আর কথা বলার অধিকার ন-মানুষকে স্বাবলম্বী করতে হবে, নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে। এটিই “টেক ব্যাক বাংলাদেশ”।
তিনি বলেন, দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়–সবার আগে বাংলাদেশ। দেশের মানুষই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে নারী, যুবক, কৃষকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে স্বাবলম্বী করা হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়ার সময় দেশে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছিল, কর্মসংস্থান হয়েছিল।
সমাবেশের শেষ দিকে তারেক রহমান আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চেয়ে বলেন, ইনশাআল্লাহ বিএনপি সরকার গঠন করলে নবী করীম (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করা হবে।
সমাবেশে মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর যৌথ সঞ্চালনায় সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।