× প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিশ্ব রাজনীতি খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফ স্টাইল ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

সরকারি চাকরি করেও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন মনিরা শারমিন

ডেস্ক রিপোর্ট।

০৫ মার্চ ২০২৬, ১১:৫৮ এএম

ছবি: সংগৃহীত।

সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রবিধানেও এ বিষয়ে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবুও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা পদে বহাল থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন দলটির প্রভাবশালী নারীনেত্রী মনিরা শারমিন। রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি প্রায় ১০ মাস সরকারি চাকরিতেও বহাল ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার সময়কাল ধরলে প্রায় দেড় বছর তিনি সরকারি চাকরির বিধিনিষেধ অমান্য করে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিষয়টি চাকরি প্রবিধান লঙ্ঘন, শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছে।

জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। আত্মপ্রকাশের পর তরুণদের এই রাজনৈতিক দলে প্রথমে ১৫১ সদস্যের এবং পরে ২১৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটিতে ২ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান মনিরা শারমিন। পরে তিনি দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বও লাভ করেন।

শুরু থেকেই জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই নেত্রী দলটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। দলীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত এনসিপির পক্ষে সংবাদ সম্মেলন, বিবৃতি, টকশো এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। সংগঠক ও নীতিনির্ধারক হিসেবে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবেও এনসিপির মনোনয়ন পান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে অফিসার জেনারেল পদে নিয়োগ পান মনিরা শারমিন। নিয়োগের পর তিনি প্রথমে ব্যাংকের কুষ্টিয়া শাখায় যোগ দেন। পরে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বদলি হয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজার করপোরেট কার্যালয়ে আসেন। সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে পড়েন।

অথচ সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯-এর ২৫ নম্বর বিধিতে বলা আছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না এবং কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বা সহায়তা করতে পারবেন না। এটি শৃঙ্খলাপরিপন্থি অপরাধ হিসেবে গণ্য। একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের নিজস্ব চাকরি প্রবিধানমালা ২০০৮-এ। প্রবিধানমালার ৩৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না, নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা প্রচারণায় যুক্ত হতে পারবেন না এবং ব্যাংক বা রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যক্রমে জড়াতে পারবেন না।

তথ্য অনুযায়ী, এসব বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও তিনি সরকারি চাকরিতে বহাল থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালের মার্চে তিনি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পরও প্রায় ১০ মাস তিনি সরকারি চাকরিতে বহাল ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার সময়কাল ধরলে প্রায় দেড় বছর তিনি সরকারি চাকরির বিধি ভেঙে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে তিনি নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন।

পরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-৫ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান মনিরা শারমিন। সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। যদিও পরবর্তী সময়ে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে আসন ভাগাভাগির কারণে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তবে তিনি দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিষয়টি ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা জানতেন। তবে এনসিপির প্রভাবশালী পদধারী নেত্রী হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাননি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত যুক্ত থাকার পরও তার অ্যাকাউন্টে নিয়মিত বেতন-ভাতা জমা হতো। এমনকি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ব্যাংকের এক্সগ্রেশিয়া বোনাসও পেয়েছেন তিনি।

ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মনিরা শারমিন প্রথমে কুষ্টিয়া শাখায় কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রভাব খাটিয়ে তিনি কারওয়ান বাজারের করপোরেট কার্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে তিনি নিয়মিত অফিস করতেন না। তবে দলীয় প্রভাব ও জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রশ্ন তুলতে সাহস পাননি।

এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, তিনি সরকারি চাকরির বিধান ভেঙে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। তার দাবি, এনসিপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার পরই তিনি চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন এবং বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানান। তবে হেড অফিস থেকে অনুমোদন পেতে সময় লাগে। তিনি আরও বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি ছাড়ার মতো আর্থিক সচ্ছলতা তার ছিল না। তবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাকরির কোনো সুবিধা নেননি।

তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার পর তিনি নিয়মিত অফিস করেননি। সরকারি চাকরির নিয়ম অনুযায়ী তাকে নোটিশ দিতে হয়েছে এবং তিনি প্রায় ছয় মাস আগে চাকরি ছাড়ার আবেদন করেন। এই সময়ের বেশিরভাগ সময় তিনি ছুটিতে ছিলেন বলে জানান। রাজনীতির জন্য সরকারি চাকরি ছেড়ে দেওয়াকে তিনি বড় ধরনের ‘স্যাক্রিফাইস’ বা ত্যাগ উল্লেখ করে বলেন, এটিকে নেতিবাচকভাবে দেখানো হলে তা দুঃখজনক।

চাকরি প্রবিধান লঙ্ঘন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি চাকরির বিধান সম্পর্কে অবগত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরিরত অবস্থায় সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া যাবে না। তিনি দাবি করেন, তিনি কখনো সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি সরকারের পক্ষেই কথা বলেছেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, চাকরিরত অবস্থায় সরকার পতনের আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন এবং তার রাজনৈতিক পরিচয় সহকর্মীরা জানতেন।

যদিও কারওয়ান বাজার শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তা তারা আগে জানতেন না। গত বুধবার কারওয়ান বাজার শাখায় গিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, অনেক পরে তারা জানতে পারেন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি অফিসও করতেন। তবে মনিরা শারমিন দাবি করেন, নিয়মিত অফিস করার প্রশ্নই আসে না। ওই অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলে তিনি ছুটি নিয়ে যেতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছুটি নিতেন। একজন কর্মকর্তা বলেন, তিনি এমপি হওয়ার জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, তবে তার আগ পর্যন্ত অফিস করেছেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কারওয়ান বাজার করপোরেট শাখার উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন বলেন, মনিরা শারমিন রাজনীতি করতেন, তা তিনি জানতেন না। এমপি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি প্রথম জানতে পারেন যে, তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। চাকরির পাশাপাশি রাজনীতি করা প্রবিধান লঙ্ঘন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাকরির পাশাপাশি রাজনীতি করার সুযোগ নেই। তবে তিনি কীভাবে করেছেন, তা তার জানা নেই এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।

প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে এ বিষয়ে দায় রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কারও ব্যক্তিগত তথ্য আগে জানা ছিল না এবং কেউ এ বিষয়ে কিছু বলেনি। চাকরি জীবনে এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা না থাকায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন।

এদিকে, প্রশাসন ও আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি সরকারি চাকরি বিধিমালা ও ব্যাংকের নিজস্ব প্রবিধান লঙ্ঘনের গুরুতর উদাহরণ হতে পারে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রবিধান ভঙ্গের দায়ে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এবং এই সময়ে নেওয়া বেতন-ভাতা ও বোনাস বৈধ ছিল কি না।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে বা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী যথাযথ অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো পেশা, ব্যবসা বা সরাসরি রাজনীতি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের পদে থাকা একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তার মতে, এ ধরনের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত কর্মচারীকে সতর্ক করা, বেতন কমিয়ে দেওয়া বা চাকরি থেকে বরখাস্ত করার মতো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দিলেও চাকরিকালীন তিনি সরকারের কাছ থেকে বেতন ও অন্যান্য সুবিধা নিয়েছেন। প্রয়োজনে সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে। কর্তৃপক্ষ চাইলে বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।


Sangbad Sarabela

সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.