খফ্ফিত কিছু দৃষ্টান্ত দিয়ে লেখাটি শুরু করছি। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সহিষুষ্ণ ঢাকার একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্র। তার স্কুলের মাসিক বেতন ২ হাজার ৬০০ টাকা। সহিষ্ণর মতো তার সহপাঠী অন্য বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মিথিলা সরকার কিংবা আইন মাহমুদের অধ্যয়ন চিত্রও একই রকম। অনেক অভিভাবকই মাসে এই পরিমাণ অঙ্কের টাকা বেতন দিয়ে সন্তানকে বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়াতে হিমশিম খাচ্ছেন। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হলেই ঢাকা মহানগরে মানসম্পন্ন বিদ্যালয়ে কিংবা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে সন্তানকে পড়ানো সম্ভব।
অনেক অভিভাবকই চান কষ্ট করে হলেও গুণগত মানসম্পন্ন একটি বিদ্যালয়ে তার সন্তান পড়াশুনা করুক। কিš‘ শিক্ষা যেন বিনিয়োগ নির্ভর বাণিজ্য হয়ে পড়েছে। শিক্ষা পণ্য নয়, তবু ব্যবস্থা তা-ই যেন করে রেখেছে। যাদের সেই রকম আর্থিক সামর্থ্য আছে তারাই শুধু সন্তানদের ভালো বিদ্যালয়ে পড়াতে পারছেন। অপরদিকে যাদের সমার্থ্য কম কিংবা যারা অসমর্থ, তারা তাদের সন্তানকে কম ব্যয়বহুল বিদ্যালয়ে পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা অবশ্যই অধিকার। এই অধিকার ভূমি-সমতল করা রাষ্ট্রের দায় ও অবশ্যই কর্তব্য বটে।
বাংলাদেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শ্রেণি-বৈষম্য তৈরি করে রেখেছে, যা সবার শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। এমনটি সংবিধানগৃহীত বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দরিদ্র কিংবা কম সামর্থ্যবান অভিভাবকের সন্তান ধনী পরিবারের সন্তানের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। ঢাকায় বেসরকারি সাধারণ বিদ্যালয়ে কিংবা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের তুলনায় সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক কম ব্যয়বহুল। কিন্তু প্রশুটা শিক্ষার মান নিয়ে। সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে বিনা বেতনে শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব। বেসরকারি মানসম্পন্ন বিদ্যালয়ের খরচের ভার বহন করা অনেক অভিভাবকের পক্ষেই খুব কঠিন। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গৃহশিক্ষক কিংবা কোচিং সেন্টারের খরচও জোগাতে হয়।
দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এতসব খরচের জোগান দিতে পুরোপুরি অসমর্থ। ঢাকা মহানগরে সরকারি বিদ্যালয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রয়েছে বেসরকারি কিংবা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়। এজন্য আর্থিকভাবে অস”ছল অভিভাবকদের সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে বেকায়দায় পড়তে হয়। ঢাকায় কোনো কোনো বেসরকারি বিদ্যালয়ের মাসিক বেতন ৫ হাজার টাকার বেশিও আছে। আর কোনো কোনো ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের মাসিক বেতন ১০ হাজার টাকার বেশি। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকার বৃহদাংশ মানুষই মধ্যবিত্ত, নিুমধ্যবিত্ত কিংবা নিুবিত্ত শ্রেণির। কিন্তু একটা বিষয় সত্য, নিুবিত্ত পরিবারের মা-বাবাও এখন সন্তানকে লেখাপড়ায় যুক্ত রাখতে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী। অধিকাংশ পরিবারের সন্তানই অর্থের অভাবে বেসরকারি মানসম্পন্ন বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করতে পারে না। করোনা-দুর্যোগ তা আরও কঠিন করে তুলেছে। আবার ঢাকার অধিকাংশ সরকারি বিদ্যালয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নেই, পাশাপাশি শিক্ষাদানের মানও প্রশুবিদ্ধ। শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচি এবং উপবৃত্তি কর্মসূচির মতো অনেক সহায়তামূলক সরকারি কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানকে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করাতে রাজি নন। এ সমস্যা ঢাকায় প্রকট হলেও অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতেও বিদ্যমান শিক্ষা-বৈষম্য চিত্রের সঙ্গে খুব একটা অমিল নেই।
যুগোপযোগী, বাস্লবমুখী ও সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে সুপারিশমালা তৈরির জন্য ইতোমধ্যে ছয়টি শিক্ষা কমিশন গঠিত হলেও কার্য ক্ষত্রে অগ্রগতি খুবই সামান্য। ফলে ঢাকায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে নাজুক। বিশেষভাবে বলতে হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (ঢাকায়) শিক্ষা বা শিক্ষাদানের পদ্ধতি অত্যন্ত নাজুক। শ্রেণিকক্ষে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা শিক্ষা সামগ্রীর ক্ষেত্রে অনেক অসামঞ্জস্য কিংবা ঘাটতি রয়েছে অনেক বিদ্যালয়েই। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে সরকারি। অধিকাংশ সরকারি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা সরকারি উপবৃত্তি পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূলে বই সরবরাহ করা হয়। কিন্তু শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে এটুকুই যথেষ্ট নয়। ঢাকায় অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। প্রতি ৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার নিয়ম বা বিধান থাকলেও ঢাকার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ নিয়মের প্রতিপালন লক্ষ্য করা যায় না। আবার কোথাও রয়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।
১৯৯১ সালে সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার আইন হলেও এর প্রতিফলন সন্তোষজনক নয়। মহানগর ঢাকাসহ দেশের অনেক নগর কিংবা বড় শহরেই সরকারি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন, প্রি-ক্যাডেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বই-বেতন ছাড়াও একজন শিক্ষার্থীকে আরও অনেক কিছুরই জোগান দিতে হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় এই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবে যারা অপেক্ষাকৃত বেশি সুযোগ-সুবিধা পায়, তাদের চেয়ে যেসব শিক্ষার্থী কম সুযোগ-সুবিধা পায়, তারা খারাপ রেজাল্ট করে। মহানগরের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান তুলনামূলক ভালো। কিন্তু শিক্ষার্থীর অনুপাতে ঢাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে সরকারি বিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা অনেক কম। ‘ভর্তিযুদ্ধে’ জিতে শিক্ষার্থীর এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনার ই”ছা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই আসনের অনুপাতে প্রতিযোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় তাদের সিংহভাগই কাক্সিক্ষত শিক্ষাঙ্গনে ভর্তি হতে পারে না।
নগর-মহানগর কিংবা বড় বড় শহরে বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি দিন দিন খরচের দিক দিয়ে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফলে ব্যর্থতার পেছনে আর্থিক সক্ষমতার অভাব একটি অন্যতম কারণ। যেসব শিক্ষার্থীর পারিবারিক আর্থিক অবস্থা ভালো, তারা নানা মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের জন্য সুযোগ পায়। যার জন্য উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো ফল করতে সক্ষম হচ্ছে। মহানগর-নগর কিংবা বড় বড় শহরে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান করোনা-দুর্যোগের কারণে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা বওট্ট। এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে একবারে নিুস্লর থেকে উচ্চস্বরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পর্যন্ত।
শিক্ষার ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক বিরুপ প্রভাবও বাড়ছে। শুধু বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, সার্বিকভাবে বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে যে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ঘটেছিল মহান একাত্তরে, সেই বাংলাদেশের বৈষম্য বিলীন তো হয়ইনি, উপরন্তু নানা ক্ষেত্রে তা আরও প্রকট হচ্ছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে শিক্ষা খাতে বিরাজমান বৈষম্য অন্যতম। শিক্ষা গবেষক কিংবা বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে বারবার নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রনিধানযোগ্য অনেক প্রস্তাবনা পেশ করে কিংবা পথ দেখিয়ে দিয়েও এর কোনো সুফল অদ্যাবধি প্রতিভাত হয়নি। সামগ্রিকভাবে আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থা বিরাজমান, তা প্রকৃতই মানবিক ও বৈষম্যহীন উন্নত সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় কিংবা প্রতিবওট্টক হয়ে আছে। জাতীয় বাজেটে গাণিতিক হিসাবে প্রতি বছর নানা খাতে বরাদ্দ বাড়া-কমার সমীকরণের বাইরে নয় শিক্ষা খাতও।
সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা বা বাস্লবায়নের ক্ষেত্রে এত প্রকট বৈষম্য জিইয়ে রেখে নীতিনির্ধারকদের অঙ্গীকার প্রতিশ্রুতির সুফল কতটা কি মিলছে, তাও প্রশেুর ঊর্ধ্বে নয়। এখানে মহানগর-নগর কিংবা বড় বড় শহরের বিদ্যমান শিক্ষা পদ্ধতির বা ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করা হলেও ব্যাপক-বিস্লৃতভাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পথ কতটা অমসৃণ, তা আর নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন রাখে না। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত রক্তাত এই বাংলাদেশে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর জনদাবি আজ পর্যন্তও বাস্লবায়ন সম্ভব হয়নি। এই ব্যর্থতা সামগ্রিকভাবে আমাদের শিক্ষার জন্য বড় বেশি বৈরী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রেখেছে। কারোনা-দুর্যোগের অভিঘাতে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এ থেকে উত্তরণের পথটাও সহজ নয়। এ অবস্থায় বিদ্যমান বৈষম্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে। সংকটের দাগও মোটা করছে। এই সংকটের ছায়া আরও কত প্রলম্বিত হয়, দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা এজন্যও ক্রমেই বাড়ছে। অমসৃণ পথে, প্রশুবিদ্ধ ব্যবস্থায় সংকটের ছায়া সরানো কিংবা বৈষম্যের মোটা দাগ কি মুছে ফেলা সম্ভব? এ এক অন্তহীন প্রশু।
লেখক : নিবওট্টকার।
[email protected]
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী আবু জাফর
যোগাযোগ: । [email protected] । বিজ্ঞাপন ও বার্তা সম্পাদক: 01894944220
ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।
© 2026 Sangbad Sarabela All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh
