× প্রচ্ছদ জাতীয় সারাদেশ রাজনীতি বিশ্ব খেলা আজকের বিশেষ বাণিজ্য বিনোদন ভিডিও সকল বিভাগ
ছবি ভিডিও লাইভ লেখক আর্কাইভ

বিএনপি রাজনৈতিক সংকটে নয়, অস্তিত্ব সংকটে আছে

আলী আদনান

১৪ মে ২০২২, ১৮:৪৬ পিএম । আপডেটঃ ১৪ মে ২০২২, ১৮:৫২ পিএম

প্রতীকী

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুটি দলের নাম নিতে বললে সকলে দুটো নাম নেয়। একটি আওয়ামী লীগ, অন্যটি বিএনপি। আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে এখানে অন্য কোনো দল প্রান্তিক পর্যায়ে নিজেদের সংগঠিত করতে কখনোই পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ক্ষমতার পালাবদলে এ দুটি দলকে দেখতেই অভ্যস্ত; কিন্তু বৃহৎ দল হিসেবে বারবার নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া বিএনপি যতই দিন যাচ্ছে ততই পথ হারাচ্ছে- এমনটিই মনে করছেন রাজনীতি সচেতন মানুষ। সময়ের ব্যবধানে যে কোনো রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক সংকটে পড়তেই পারে; কিন্তু বিএনপি এখন যে পরিস্থিতিতে আছে তা কি রাজনৈতিক সংকট নাকি অস্তিত্ব সংকট তা নিয়েই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। 

বিএনপি তাদের সংকট কাটিয়ে উঠতে আদৌ পারবে কি না বা এ সংকট কাটানোর জন্য জনগণের কাছে তাদের কী পরীক্ষা দিতে হবে- এটাই এখন দেখার বিষয়। 

রাজনৈতিক দল নিজস্ব মতাদর্শের লোকদের সংগঠিত করে দাবি আদায় করবে এবং ক্ষমতায় গিয়ে সরকার গঠন করতে পারলে মানুষের সেবা করবে- এটাই স্বাভাবিক। ভারত উপমহাদেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল এ উদ্দেশ্যেই গঠিত হয়েছিল। দলগুলো হলো যথাক্রমে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগ। 

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তিনটি দলের প্রতিষ্ঠা ছিল সময়ের দাবি। নানা চড়াই উৎড়াই এবং উত্থান পতনের ভেতর দিয়ে এ তিনটি দলকে যেতে হলেও বর্তমানে যথাক্রমে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এ তিনটি দলই সাংগঠনিক ভাবে নিজেদের শক্তিশালী রাখতে এবং জনগণের কাছাকাছি থাকতে পেরেছে- এতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও মুসলিম লীগ শুরু থেকেই একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে তথাপি এ তিনটি দলই নিজ নিজ মতাদর্শকে সামনে রেখে এগিয়েছে। মতাদর্শ ও সময়ের দাবি এ দুটো যখন এক কাতারে এসে দাঁড়াতে পারে জনগণ তখন সেই রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিতে কখনোই দ্বিধা করে না। আর তাই ভারতে কংগ্রেস প্রায় দেড়শ বছর, পাকিস্তানের মুসলিম লীগ প্রায় সোয়া একশ বছর, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ প্রায় পৌনে একশ বছর জনগণের সংগঠন হিসেবে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

এ ক্ষেত্রে চরম রকমের বিপরীত বিএনপি। বিএনপি কোন মতাদর্শকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে দলটির নেতাকর্মীদের কোন আদর্শ ও উদ্দেশ্য ছিল না। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সাহেব ছিলেন আপাদমস্তক সৈনিক। এমন একজন সৈনিক ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যার ছিল। রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা হওয়ার জন্য তিনি হাঁটেন ষড়যন্ত্রের পথে। অনেকগুলো সিঁড়ি পেরিয়ে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন। তার এই ক্ষমতাকে বৈধতার রূপ দিতেই তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তার ফলেই প্রথমে সৃষ্টি হয় জাগদল ও পরে বিএনপি। অর্থাৎ, দলটি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতাকে নিরাপদ রাখা। কোন অবস্থায় জনগণের দাবি আদায় বা জনগণকে সংগঠিত করার কোন ইস্যু নিয়ে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়নি।

যেহেতু দলটির জন্ম সুবিধাজনক অবস্থানে এবং ক্ষমতাকে নিরাপদ রাখার জন্য সেহেতু দলটি সবসময়ই ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়েছে৷ জনগণ কী চায় বা কীভাবে চায় তা নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি। 

ফলে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়ে আওয়ামী যখন রাজনীতি দিয়ে রাজনীতিকে জয় করেছে, বিএনপি তখন বার বার বেছে নিয়েছে আত্মঘাতি পথ। অথচ বিরোধী দলে থাকার কারণে বিএনপির আরো বেশি সুযোগ ছিল জনগণের কাছে যাওয়ার। বিএনপি সেটা পারেনি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে শক্তিশালী প্রধান বিরোধী দল না থাকার জন্য হতাশা প্রকাশ করেছেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় বিএনপির ভুল রাজনীতি শুধু বিএনপির ক্ষতিই করেনি বরং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে সুস্থ সুন্দর ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশ তাও ব্যাহত হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অবস্থান থাকা আবশ্যক ছিল। 

বিএনপির রাজনীতিতে এই দৈন্যদশা একদিনে হয়নি। বরং গত দু'দশক ধরেই বিএনপি একের পর এক ভুল করেছে। প্রতিটা ভুল তাকে একদিকে জনগণ থেকে দূরে সরিয়েছে অন্যদিকে তার সাজানো প্ল্যাটফর্মটাকে ভেঙ্গে দিয়েছে। বিএনপির অন্যতম প্রধান ভুল ছিল ২০০১-০৬ সাল মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক জিয়াকে রাতারাতি দলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসা। একই সাথে সরকারের কেউ না হওয়া সত্ত্বেও তারেক জিয়াকে ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ করে দেওয়া। 

এই সময়টাতেই তারেক জিয়াকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়া হাওয়া ভবন হয়ে উঠেছিল অনেক অনিয়ম ও নৈরাজ্যের কেন্দ্র। সরকারের বাইরের লোক হয়েও সেখানে বসে বিকল্প সরকার চালাতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী পুত্র তারেক। সেই সূত্র ধরেই বিএনপির পুরো সময়কালটা ছিল শুধু ব্যর্থতায় ভরা। 

ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর নির্বিচারে হামলার ঘটনায় শুরুতেই বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। 

এ সময়কালে দেশ পরপর পাঁচ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, মোসাদ্দেক আলী ফালু, হারিস চৌধুরী, নাসিরউদ্দিন পিন্টু, বরকত উল্লাহ বুলুদের দাপটে নানা জায়গায় প্রকাশ্যে চলতে থাকে দুর্নীতি। অতিরিক্ত ক্ষমতা লিপ্সু মনোভাব ও লোভের কারণে এ সময় থেকে বিএনপির কাঠামোগত ক্ষতি হতে শুরু করে। একই সময়ে সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা, বাংলা ভাইদের উথান, দশট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যাকান্ড, শ্রমিক লীগ সভাপতি আহসান উল্লাহ মাষ্টার হত্যাকান্ড সহ নানা ঘটনা বিএনপিকে জনবিচ্ছিন্ন করতে থাকে। ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি তো কোন প্রতিকার নেয়নি বরং ঘটনা ধামাচাপা দিতে নানা ধরনের নাটক শুরু করে।  একই ভাবে সারাদেশে জঙ্গী উথানের ঘটনায় মানুষ যখন আতঙ্কিত তখন ‘জঙ্গি মিডিয়ার সৃষ্টি’ এমন সংলাপ ক্ষমতাসীন বিএনপিকে বিতর্কের মুখে ফেলে দেয়।

বিএনপির রাজনীতিতে সে সময় পরপর কয়েকটি আঘাত আসে। এসব আঘাতের জন্যও তারেক রহমানকে দায়ী করে রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মহল। এ সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কর্ণেল অলি আহমদ দল ত্যাগ করেন। এটা কোনভাবেই বিএনপির জন্য সুখকর ছিল না। ওয়ান ইলেভেনের সময় দলের মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার সাথে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াকে তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এমন প্রবীণ ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের হারানো কোন ভাবেই বিএনপির জন্য ভালো হয়নি। 

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলো। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে বিএনপি যে ভূমিকাটা রাখার দরকার ছিল সেক্ষত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। বরং দিনের পর দিন সংসদের বাইরে থাকা বিএনপিকে যেমন জনবিচ্ছিন্ন করেছে তেমনি একই দলেই দ্বিমুখী নেতৃত্ব নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত করেছে। দলের নেতা কী খালেদা জিয়া নাকি লন্ডনে নির্বাসিত হওয়া তারেক রহমান এসব নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে কোন সঠিক উত্তর ছিল না। আগে থেকেই দলের ভেতর সৃষ্টি হওয়া দুটো ধারা এসময় এসে পুরো দলটিকে বিভ্রান্তিতে ফেলে।

নতুন প্রজন্মের কাছে বিএনপি তার ইমেজ হারায় জামাতের সাথে জোট গঠন করার কারণে। ২০০১ সালের নির্বাচনে জামাতের সাথে জোট করে দলটি ক্ষমতায় যায় এবং সরকার গঠনের সময় জামাতের দু'জন নেতাকে মন্ত্রীত্বও দেয়। খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান এ সময় এক বক্তৃতায় ছাত্রদল- ছাত্রশিবিরকে একই মায়ের দু’সন্তান বলেও উল্লেখ করেন। এই জোট নিঃসন্দেহে জামাতকে লাভবান করলেও বিএনপি তার স্বাতন্ত্রিক অবস্থান হারায়। তার চূড়ান্ত আঘাতটা আসে ২০১৩ সালে। গণজাগরন মঞ্চে মানবতাবিরোধী অপরাধে দন্ডিত আসামীদের ফাঁসীর দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ সহ সারা দেশে আন্দোলন শুরু হলে অনেকে আশা করেছিল বিএনপি তরুণ প্রজন্মের এ আন্দোলনকে সমর্থন দিবে। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে না পারা এবং সবসময় জামাতের সাথে প্রীতির বন্ধন বিএনপিকে তরুণ প্রজন্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। 

২০১৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি তত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে জনগণ তাতে সাড়া দিতে শুরু করেছিল। কিন্তু শক্তিশালী ভাবে সংগঠিত হয়ে রাজপথে অবস্থান নেওয়া এবং আন্দোলন পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয় বিএনপি। দেশের সুশীল সমাজ ও রাজনীতি সচেতন মানুষ মনে করছেন বিএনপি এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা দরকার ছিল। বিএনপি যদি জাতীয় পার্টির সাথে জোট করে বা আলাদা ভাবে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো তাহলে রাজনীতির মূল স্রোতে থেকে যেত বিএনপি। এ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি হয়তো সরকার গঠন করতে পারতো না, কিন্তু সরাসরি বিএনপিকে বাদ দিয়ে সরকারও কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ পেত না। কিন্তু এ জায়গায় দাবার চালে বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসে। 

এই নির্বাচনের আগে বিএনপি আরেকটি ভুল করে। দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে এ ভুল নিয়ে খুব নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বিএনপি চেয়ারপার্সনের টেলিফোন সংলাপ। এই সংলাপে শেখ হাসিনার ধৈর্য্য অন্যদিকে খালেদা জিয়ার উগ্র ও অস্থির আচরণ বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের বিতৃষ্ণ মনোভাব এনে দেয়। এমনকি বিএনপির সাধারণ সমর্থকরাও খালেদা জিয়ার এমন ভূমিকার সমালোচনা করে। পক্ষান্তরে এই টেলিফোন সংলাপ প্রচার হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সমঝোতার সদিচ্ছার বিষয়টি সবার সামনে উঠে আসে। এতে রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হয় শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগ। 

একই ভাবে বিএনপির আরেকটি ভুল আওয়ামী লীগকে জনসমর্থন পেতে সুযোগ করে দেয়া। খালেদা জিয়ার পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়াকে। কিন্তু দেশবাসী অবাক বিস্ময়ে দেখল প্রধানমন্ত্রী অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও দেখা করার সুযোগ পাননি। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন একটি অসদাচরণ থাকতে পারে তা হয়তো এর একদিন আগেও দেশবাসী ভাবতে পারেনি। টেলিফোন সংলাপে খালেদা জিয়ার উগ্রতা এবং সন্তান মারা যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী দেখতে গেলে তার সাথে দেখা না করা- পরপর এ দুটি ঘটনা ছিল বিএনপির নিজের পায়ে কুড়াল মারার নামান্তর। বিএনপির অনেক ভোটাররাও এমন দুটি ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না।

আন্দোলনের নামে বিএনপি জ্বালাও পোড়াও এর যে তান্ডবলীলা দেশব্যাপী চালায় তা কখনোই কোন সুস্থ রাজনীতির অংশ হতে পারে না। ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যার করার ঘটনা সারাদেশের মানুষকে যখন আতঙ্কিত করে রেখেছিল তখনি বিএনপি রাজনীতির মূল স্রোত থেকে বিচ্যুত হতে থাকে। একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতার লোভে, ভুল সিদ্ধান্তে এবং দুষ্ট বুদ্ধিতে পরিচালিত হয়ে কীভাবে একটি সন্ত্রাশী সংগঠনের তকমা গায়ে লাগাতে পারে- উপমহাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি হয়ে উঠে তার বড় উদাহরণ। পেট্রোলবোমা দিয়ে নাশকতা চালানোর আগ পর্যন্ত অনেকে আশা করেছিল বিএনপি আবার রাজপথে কোন না কোন ভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। বৃহৎ দল হিসেবে জনসমর্থন আদায় করা ও কর্মীবাহিনী দিয়ে আন্দোলন পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে। কিন্তু পেট্রোলবোমা হামলা ও জ্বালাও পোড়াও করে সাধারণ মানুষ হত্যা করার পর তাদের আন্দোলনের কফিনে শেষ পেরেকটাও ঠুঁকে দেয় তারা নিজেরাই। 

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনদের সাথে জোট গঠন ছিল বিএনপির মতো একটি বড় দলের জন্য রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ। অনেকে মনে করছেন, বিএনপি এতোটাই আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগতে শুরু করে এ সময়, খালেদা জিয়ার মতো তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর ইমেজের উপর নির্ভর না করে ড. কামাল হোসেনকে তারা ভাড়া করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে। যে কামাল হোসেন কোন সংসদীয় আসনে নিজ ইমেজে এমপি হওয়ার সক্ষমতা রাখেন কিনা তা নিয়েও বিস্তর সন্দেহ আছে। এ নির্বাচনের পরই মূলত বিএনপিকে নিয়ে পক্ষে বিপক্ষের লোকেরা প্রক্যাশ্যে হাসাহাসি ও সমালোচনা করার সুযোগ পেয়ে যায়। একটি গণসংগঠন যখন হাসাহাসির পাত্র হয় তখন বুঝতে হয় আপাতদৃষ্টিতে দলটির আর কোন সম্ভাবনা নেই।

দলের প্রধান অনেকগুলো মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে কখনো দৃশ্যমান জেলখানায় আবার কখনো অদৃশ্য জেলখানায় বন্দী। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান লন্ডনে বসে মাঝে মাঝে কিছু ঘরোয়া মিটিংয়ে বক্তৃতা দেওয়া নয়তো স্কাইপে সমাবেশের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। দলের অধিকাংশ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে দীর্ঘদিন সম্মেলন নেই। আগের কমিটিগুলো বেশিরভাগই নিষ্ক্রিয়। তৃণমূল পর্যায়ে অনেক নেতাকর্মী জেলখানায়। আবার অনেকে সুযোগ বুঝে মিশে গেছে সরকারী দলে। এখন বিএনপি বলতে জনগণ বুঝে কখনো মির্জা ফখরুল আবার কখনো রুহুল কবির রিজভী। 

এ দু’জন প্রেসক্লাবে সমাবেশ করে, সাংবাদিকদের সামনে বিবৃতি দিয়ে, সরকারের বিরুদ্ধে গরম গরম কথা বলে এখনো বিএনপিকে গণমাধ্যমে শিরোনাম হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া যায় না- এ সত্যটি রাজনীতি থেকে অনেক দূরে থাকা লোকও বুঝে। এরপরও হয়তো বিএনপির কেউ কেউ স্বপ্ন দেখে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরবে। সরকার গঠন করবে। 

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই এটা যেমন সত্য তেমনি রাজনীতির পথ কখনোই মসৃণ নয়- এটাও সত্য। আজকে বিএনপি হুংকার দিচ্ছে, তারা কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এমন সিদ্ধান্ত বড় ধরনের ভুল বলেই মনে করছেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। বিএনপি নির্বাচন করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় গিয়ে সরকার গঠন করবে- এমনটি খোদ দলীয় প্রধান বিশ্বাস করেন কিনা তা জানি না৷ তবে দেশের মানুষ বিশ্বাস করে না। ক্ষমতায় যাওয়া বা সরকার গঠন করা বিএনপির জন্য এখনো অনেক দূরের ব্যাপার। 

এখন বিএনপির প্রয়োজন রাজনীতির মেইন স্ট্রীমে ফিরে আসা। মেইন স্ট্রীমে ফিরে আসার জন্য যা যা করতে হয় তা করা। হতে পারে এবার তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে হয়তো এমন সংখ্যক আসন পাবে যা খুবই হতাশাজনক। এর পরের নির্বাচনে আরো ভালো করবে। পরের নির্বাচনে আরো ভালো। বিএনপি ধ্বংস হয়ে গেছে বা বিএনপি শীঘ্রই বিলুপ্ত হয়ে যাবে সেটা আমি বলছি না। একটি গণমুখী আদর্শকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন দলের ভেতরে ও বাইরে লড়াই চালিয়ে গেলে হয়তো রাজনীতির চোরাবালি থেকে বিএনপি উদ্ধার পেলেও পেতে পারে। তবে যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন তা হতে হবে গণমুখী। বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকরা যদি মনে করে থাকেন দেশের ভেতরে বা বাইরে কোন শক্তি তাদেরকে কোলে করে এনে ক্ষমতায় বসিয়ে দিবে তাহলে সেটা একটা কাল্পনিক ব্যাপার। 

১৯৭৫ সাল পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ তেইশ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। তেইশ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এখানে আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির একটি মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে। সেটি হলো আওয়ামী লীগ জনগণের ভেতর থেকে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দল। দীর্ঘদিন পর্যন্ত জনগণকে সাথে নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করতে করতে দলটি রাজপথের ভাষা যেমন বুঝতে শিখেছে তেমনি মানুষের চিন্তার সাথে পরিচিত হয়েছে। এখানেই বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের বড় পার্থক্য। সেনা ছাউনিতে জন্ম নেওয়া বিএনপি কোন রাজনৌতিক উদ্দেশ্য সাধনের কথা না ভেবে সব সময় ক্ষমতা দখলকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে এবং জনগণ কী চিন্তা করছে তা গুরুত্ব না দিয়ে সবকিছুতে অন্যের কাঁধে ভর দেওয়ার স্বপ্ন দেখে। 

বিএনপির মনে রাখা উচিত, এটা ১৯৭৮ সাল নয়। গত ৪৪ বছরে পৃথিবী অনেক পাল্টে গেছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি এখন গণতন্ত্র চায়। অস্বাভাবিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের কোনো সুযোগ এখন নেই। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমাদের দেশে অনেক বামপন্থি নেতা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি করত। এখন যদি তারেক রহমান সাহেব লন্ডনে বসে নানা ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে নিজেকে সে রকম আন্ডারগ্রাউন্ড নেতা ভেবে পুলকিত হয়ে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে তিনি তার দলীয় নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজের ফায়দা লুটতে চাচ্ছেন। এর বেশি কিছু নয়। 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

Sangbad Sarabela

সম্পাদক: আবদুল মজিদ

প্রকাশক: কাজী আবু জাফর

যোগাযোগ: । 01894-944220 । sangbadsarabela26@gmail.com

ঠিকানা: বার্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ : বাড়ি নম্বর-২৩৪, খাইরুন্নেসা ম্যানশন, কাঁটাবন, নিউ এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫।

আমাদের সঙ্গে থাকুন

© 2022 Sangbad Sarabela All Rights Reserved.